মুসলমানের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব সকলকে নিয়ে ঈদ আনন্দে মাতবে সবাই। এই দিনটি আসে আনন্দের সহযাত্রী হয়ে।
সবচেয়ে বড় উৎসব বলে কথা, তাই ঈদকে ঘিরে আগে থেকেই শুরু হয় পোশাক নিয়ে ভাবনা। শিশু থেকে শুরু করে সকল বয়সী ক্রেতা, শুভানুধ্যায়ীদের প্রত্যাশিত নতুন কিছু দেবার জন্য কে ক্র্যাফট ইতােমধ্যে ঈদ আয়োজনের পোশাক নিয়ে হাজির হয়েছে।
ঈদের সকাল, বিকেল ও সন্ধ্যার পোশাকে ক্যাজুয়াল কিংবা এক্সক্লুসিভ সবই মিলবে এবার। অবশ্যই হবে আবহাওয়া ও পরিবেশ উপযোগী ও স্বাচ্ছন্দময়।
বিভিন্ন মোটিফের বিচিত্র ব্যবহার তুলে ধরা হয়েছে পোশাকে। ফ্লোরাল, জিওমেট্রিক, মুঘল, কাশ্মীরি, ইউক্রেনিয়ান, বেলারুশ, ইজিপ্সিয়ান, রাগ’স-এর বিভিন্ন মোটিফ অনুপ্রেরণায় এবারের সিরিজ পোশাক। এ ছাড়া ট্র্যাডিশনাল, ট্রাইবাল, ফোক, জামদানি, ওরিয়েন্টাল, আলাম, মিক্সড সহ নানা মোটিফ ফুটিয়ে তুলতে হাতের কাজ, অ্যাময়ড্রারি, কারচুপি, স্ক্রিন ও ব্লক প্রিন্ট, সিকুইন ওয়ার্ক, ডিজিটাল প্রিন্ট ও টাই-ডাই মিডিয়ার ব্যবহার হয়েছে।
কাট, প্যাটার্ন ও নকশার সমন্বয়ে করা পোশাকের জন্য ফ্যাব্রিক নির্বাচন করা হয়েছে উৎসব মুখর পরিবেশ ও স্বস্তিতে থাকাকে প্রাধান্য দিয়ে। বৈচিত্র্যময় রঙ নির্বাচন করে থাকছে- কটন, জ্যাকার্ড কটন, জর্জেট, লিনেন, সিল্ক, হাফ সিল্ক, দুবাই সিল্ক, অরগানজা, ডুপিয়ন সিল্ক, মমো সিল্ক, সুইস কটন, ভিসকজ, নীব কটন, এলেক্স, টু-টোন, সাটিন ফ্যাব্রিক।
মেয়েদের জন্য ট্র্যাডিশনাল, ক্ল্যাসিক, এথনিক, রেট্রো, ফিউশন, ইয়ক বেইজ’ড, লং প্যাটার্ন সহ বিভিন্ন প্যাটার্নের পোশাক সারিতে থাকছে- সালোয়ার কামিজ, ডাবল লেয়ার্ড সালোয়ার কামিজ, লং-কুর্তি, রেগুলার কুর্তি, টপস্, ডাবল লেয়ার্ড কুর্তি, টিউনিক, কাফটান,প্যান্ট সহ টপস-স্কার্ট, টপস-পালাজো সেট ও বিভিন্ন প্যাটার্নের প্যান্ট।
ছবি : কে ক্র্যাফট
এ ছাড়া ঈদকে সামনে রেখে কটন, সিল্ক, হাফ সিল্ক, মসলিন, খাদি মসলিন শাড়ির বৈচিত্রপূর্ণ ডিজাইনের একটি বড় আয়োজন থাকছে। নিজস্ব ডিজাইনের শাড়িতে বিশেষভাবে ট্র্যাডিশনাল, মানডালা, মুঘল, ফ্লোরাল, জামদানি, ওরিয়েন্টাল, পেইস’লে, টামজারা ও মিক্সড মোটিফের ব্যবহার, কালার কম্বিনেশন ও ভ্যালু অ্যাডিশনে নানা মিডিয়ার ব্যবহার সকলের দৃষ্টি কাড়বে।
ছেলেদের জন্য রয়েছে পছন্দের ব্র্যান্ড কে ক্র্যাফটের রেগুলার ও ফিটেড পাঞ্জাবি। এ ছাড়াও রয়েছে কাট বেইজ’ড এক রঙা পাঞ্জাবিও। এ ছাড়াও পাওয়া যাবে রেগুলার ও স্লিম ফিট ক্যাজুয়াল শার্ট, এথনিক শার্ট, শেরওয়ানি, কটি, ফতুয়া, পলো শার্ট ও টি শার্ট।
মেয়ে শিশুদের জন্য উৎসব ভিত্তিক পোশাকে থাকছে- সালওয়ার কামিজ, ফ্রক, কুর্তি, টপস, কাফটান, লেহেঙ্গা সেট, টপস সেট, স্কার্ট, পার্টি ফ্রক, টপস-কটি সেট,পালাজো। ছোট ছেলেদের পোশাক আয়োজনে নানা রঙের পাঞ্জাবি, হাফহাতা কাট এর শার্ট ও ফতুয়া। শিশুদের পছন্দ হবে বা ভালো লাগবে তাই প্রাধান্য পাচ্ছে এবার। শিশুদের পোশাকে প্যাটার্ন, ফ্যাব্রিক এবং রঙের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্যাটার্নে ভিন্নতা ও রঙে উৎসবের আমেজ বহন করবে।
ছবি : কে ক্র্যাফট
এ ছাড়াও ছোট মেয়েরা বোন অথবা মায়ের সঙ্গে মিলিয়ে পরার জন্য সালওয়ার কামিজ, কুর্তি এবং বাবা ও ছেলের জন্য পাঞ্জাবি, শার্ট, ফতুয়া থাকবে বরাবরের মত। এবারে যুগলদের জন্য থাকবে বিশেষ আয়োজন।
কে ক্র্যাফটের ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, কুমিল্লার সকল শো-রুম ছাড়াও অনলাইন শপ kaykraft.com থেকে ঈদ আয়োজন-এর পোশাক কিনতে পারেন সাশ্রয়ী মূল্যে। এ ছাড়া ফেসবুক পেজ থেকেও অর্ডার করা যাবে।”
বছরের সবচেয়ে বড় উৎসব রমজানের ঈদ। ঈদের আনন্দকে আরও বেশি উৎসবমুখর ও রঙিন করে তুলতে দেশের শীর্ষসারির ফ্যাশন ব্র্যান্ড রঙ বাংলাদেশ প্রস্তুতি নিয়েছে ব্যাপক।
প্রতিবারের মতো এবারও থিমনির্ভর কালেকশন তৈরি করেছে রঙ বাংলাদেশ। এই বছরের মূল থিম ক্লাসিক্যাল ফোর এলিমেন্টস।
আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস- গ্রিক মিথোলজি মতে, এই চার উপাদানে গঠিত হয়েছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। প্রতিটি উপাদানের রয়েছে আলাদা প্রতীক ও সত্তা; রঙও রয়েছে আলাদা। মাটি, আগুন, পানি ও বাতাসের বিভিন্ন রূপ-বৈচিত্র্যের চমৎকার বিন্যাস ঘটানো হয়েছে এই আয়োজনের রঙ ও নকশায়। তাই প্রতিটি পোশাক হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয়, নান্দনিক ও উৎসবমুখী। এ ছাড়াও পাখির রঙ, আলপনা ও জিওমেট্রিক থিমে সামগ্রি তৈরি করা হয়েছে এবারের ঈদে।
পোশাক নকশায় গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আবহ। এর সঙ্গে সময়, প্রকৃতি, আবহাওয়া আর আন্তর্জাতিক ট্রেন্ডকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এবারের ঈদ কালেকশন তৈরি করা হয়েছে আরামদায়ক কাপড়ে। বিভিন্ন ধরনের কটন, স্লাব কটন, জ্যাকার্ড কটন, লিনেন, হাফসিল্ক, জর্জেট, ভিসকস, বারফি কাপড় দিয়ে পোশাকগুলো করা হয়েছে।
মূল রং হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছে মেরুন, নীল, ফিরোজা, আকাশি, ব্রাউন, লাল, লাইট অরেঞ্জ, কফি, ডিপ সবুজ। পোশাকের নকশাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানা ভ্যালু অ্যাডেড মিডিয়ার ব্যবহারে। বিভিন্ন আধুনিক ও ঐতিহ্যগত প্যাটার্নের কাট অ্যান্ড সুইং ছাড়াও রয়েছে স্ক্রিন প্রিন্ট, ব্লক প্রিন্ট, হাতের কাজ, এমব্রয়ডারি ও কারচুপি কাজের ব্যবহার।
ছবি : রঙ বাংলাদেশ
কেবল বড়দের নয়, ঈদে ছোটদের পোশাককে সমান গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বাচ্চাদের আকর্ষণীয় পোশাক। রয়েছে পরিবারের সবার জন্যে একই ধরনের ম্যাচিং পোশাক। এতে বাবা-মা, মা-মেয়ে, বাবা-ছেলে এমনকি পরিবারের সবাই একই ডিজাইন বা থিমের পোশাক পড়ে উদযাপন করতে পারবে এবারের ঈদ উৎসব।
এ ছাড়াও আমাদের সাব ব্র্যান্ড হিসাবে থাকছে- তরুণ প্রজন্মের পছন্দকে মাথায় রেখে তৈরি করা ওয়েস্ট রঙের পোশাক, বয়োজ্যেষ্ঠদের আপন ভুবন শ্রদ্ধাঞ্জলি আর শিশুতোষ ফ্যাশনের আনন্দময় জগত রঙ জুনিয়র- এর ঈদ আয়োজন।
সকল ক্রেতাসাধারণের কথা বিবেচনা করে পোশাকের মূল্যও রাখা হয়েছে ক্রয়সাধ্যের মধ্যে। এ ছাড়াও রয়েছে অনেক রকম অফার, আপনজনকে উপহার দিতে রয়েছে ঈদি গিফট ভাউচার। ঈদ আয়োজনকে ঘিরে যেকোনো অনুষ্ঠান বা আয়োজনের জন্য সবাই মিলে একই রকম পোশাক পরতে পাইকারি দামেও পাওয়া যাবে পোশাক। কর্পোরেট প্রোগ্রাম বা যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সব ধরনের আয়োজনেই রঙ বাংলাদেশ-এর পোশাক ক্রেতাকে আকর্ষণ করবে।
রঙ বাংলাদেশ- এর ঢাকা ও ঢাকার বাহিরের সকল আউটলেটেই পাওয়া যাবে এই ঈদ আয়োজনের সামগ্রী। এ ছাড়া ঈদ আয়োজনের সকল পণ্যই পাবেন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। ভিজিট করুন www.rang-bd.com অথবা রঙ বাংলাদেশের ফেসবুক পেজ www.facebook.com/rangbangladesh । আপনার অর্ডার করা পছন্দসই ‘রঙ বাংলাদেশ’- এর পণ্য সম্পূর্ণ সুরক্ষায় পৌঁছে যাবে আপনার ঘরে। যেকোনো প্রয়োজনে ফোন / হোয়াটসঅ্যাপে রয়েছে সাহায্যকারী 01777744344 এবং 01799998877 নম্বরে ।
যোগব্যায়াম শব্দটি শুনলে প্রথমেই কল্পনায় আসে ধ্যান বা সাধনারত কোনো শান্ত মুখ। সুস্থ থাকতে হলে যোগাভ্যাসের বিকল্প নেই। সংস্কৃত শব্দ ‘যুজ্’ থেকে এসেছে ‘যোগ’ শব্দটি। এর অর্থ ‘যোগদান করা বা একত্রিত হওয়া’। শরীর ও মনের মেলবন্ধন ঘটায় যোগচর্চা।
মনকে বাদ দিয়ে শরীর এবং শরীরকে বাদ দিয়ে মন কখনো ভালো থাকতে পারে না। তাই যোগই একমাত্র মাধ্যম, যার মধ্য দিয়ে দুটো একসঙ্গে হতে পারে।
যোগের ধরন
যোগব্যায়াম মূলত কী এবং মানবদেহের জন্য কতটা উপকারী, এ বিষয়ে যোগ প্রশিক্ষক জয়াসান ইয়োগা অ্যান্ড ওয়েলনেস সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রশিক্ষক কুশল রায় জয় বলেন, ‘যোগ হচ্ছে একটি সাধনা। যোগের রয়েছে চারটি অংশ। যথা : জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ, ভক্তিযোগ, রাজযোগ। সবগুলো অংশ মিলিয়ে যখন একজন মানুষ যোগচর্চা করবে তখন এর সম্পূর্ণ সুফল পাবে।’
জ্ঞানযোগ হচ্ছে অনেকটা যোগাযোগের মতো। বলা হয়, ‘জ্ঞানই শক্তি’। আর এই শক্তিকে মানুষ যখন অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেয় এবং অন্যদের কাছ থেকে শিখে বা আহরণ করে, তখন এটিকে আমরা জ্ঞানযোগ বলি।
ক্যাপশন : নিয়মিত যোগচর্চা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। ছবি : সংগৃহীত
সুনির্মল বসুর কবিতায় আমরা পড়েছিলাম, ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র’। জ্ঞানযোগের ক্ষেত্রে এই লাইগুলো বেশ সম্পর্কিত। জ্ঞান বা শিক্ষা মানুষকে বিনয়ী ও শান্ত করে তোলে। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে দৈনন্দিন জীবনে যোগচর্চাকে রুটিনে রাখাটা বেশ কার্যকর।
কর্মযোগ হলো, কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করা। আবার ভালো বা সুন্দর কিছুর চর্চা করাই হলো ভক্তিযোগ। সেটা হতে পারে বই পড়া, গান করা বা প্রার্থনা করা। অপরদিকে শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য শারীরিক ও মানসিক সাধনাগুলোই রাজযোগ বা হঠযোগ।
যোগবিদ পাতাঞ্জলি মহ আবার যোগাসনকে আটটি ভাগে ভাগ করেছেন। যথা : সংযম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়ম ও প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি। সাধারণত আসন, প্রাণায়ম ও ধ্যান নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করা হয়। আমরা মেডিটেশন নামে যে শব্দটির সঙ্গে পরিচিত, তা এসব যোগেরই অংশ।
যোগচর্চার উপকার
যোগচর্চা মানবদেহের জন্য ভীষণ উপকারী জানিয়ে কুশল রায় জয় বলেন, ‘যাদের অতিরিক্ত ওজনের কারণে শারীরিক কোনো ব্যায়াম করা সম্ভব হয় না, তারা প্রাণায়ম অর্থ্যাৎ নিঃশ্বাসের ব্যায়ামের মাধ্যমের ওজন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। যোগে এমন কিছু আসন রয়েছে, যেগুলো শুয়ে বা বসেও করা যায়। এসব আসন, ব্যায়ামে রূপান্তর করে চর্চা করা হয়। যেমন : সূর্য নমষ্কার। এটি খুব দ্রুত গতিতে করলে শরীরের নড়াচড়া হয়।’
ক্যাপশন : অনেক রোগ থেকেও মুক্তি দেয় যোগচর্চা। ছবি : সংগৃহীত
থাইরয়েড, হার্ট, চোখ, প্যানক্রিয়াস কিংবা সক্ত সঞ্চালন ইত্যাদির জন্য রয়েছে সমস্যা অনুযায়ী আলাদা আলাদা যোগাভ্যাস। যেগুলো ধারাবাহিকতা মেনে সঠিকভাবে চর্চা করলে মানুষ সুস্থ জীবন যাপন করতে পারে। যোগচর্চা মানুষের ভেতরের শুভ শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। নিয়মিত এই চর্চায় মানুষের মধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়ে। রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা, দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ কমে। নেতিবাচক যেকোনো কিছুকে ভিন্নভাবে ভাবর একটি আশ্চর্য ক্ষমতা বাড়ে। মন শান্ত থাকলে শরীরের রোগও অনেকটা কমে। পারিবারি, সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক সম্পর্ক বা বিষয়গুলো তখন সুন্দর হয়ে ওঠে। প্রশান্তি ফুটে ওঠে চেহারায়।
পারিবারিক, সামাজিক পেশাগত স্থানগুলোতে মানসিকভাবে চাপমুক্ত ও দায়িত্বশীল থাকতে তাই যোগচর্চার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
সারাদিন রোজা রাখার পর অনেকেই ইফতারে ভাজাপোড়া খায়। এসব ভাজাপোড়া খাবার যে দেহের বারোটা বাজায় তা তো সকলেরই জানা। তবে সুস্থভাবে রোজা পালন করতে কিন্তু এসবের পরিবর্তে খেতে হবে স্বাস্থ্যকর খাবার।
ইফতারে কিছু স্বাস্থ্যকর খাবারের কথা জানিয়েছেন পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ নিশাত শারমিন নিশি।
১. ইফতারের জন্য খুব উপযুক্ত খাবার হলো, দই-চিড়া-কলা। এটি যেমন খেতে সুস্বাদু, তেমনি হজম করতেও ভালো। ভাজাপোড়া খাবারের পরিবর্তে এই খাবারটি রাখতে পারেন খাদ্যতালিকায়।
২. ইফতারে খেতে পারেন চিড়া ও টক দইয়ের স্মুদি। এই স্মুদি তৈরির আগে প্রথমে চিড়াকে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে নরম করে নিতে হবে। এরপর টক দই, চিড়া, খেজুর, সামান্য লবণ ও মধু ব্ল্যান্ড করে নিন। এই স্মুদি দেহের শক্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
৩. ইফতারে ছোলা-মুড়ি খুবই প্রচলিত খাবার। ছোলা উপকারি হলেও, বেশি মশলা দিয়ে করলে এটি পুষ্টিগুণ হারায়। এর বদলে সিদ্ধ করে খাবারটি খেতে পারেন। ছোলা সিদ্ধ করে এতে শশা, টক দই, পুদিনা পাতা, লেবুর রস, ধনে পাতা, আদা কুচি দিয়ে মেখে মুড়ির সঙ্গে খাওয়া যেতে পারে।
৪. এই সময় তৈরি করে নিতে পারেন স্বাস্থ্যকর ঘরের তৈরি স্যুপ। মুরগি বা ডিমের সাদা অংশের সঙ্গে সবজি যোগ করে দিতে পারেন এতে। পাশাপাশি একটু ওটসও দেওয়া যেতে পারে। এতে স্যুপের ঘনত্ব বাড়বে। খেতেও ভালো লাগবে।
সেহরিতে এমন খাবার নির্বাচন করতে হবে, যেগুলো সহজপাচ্য। অর্থাৎ হজমে তেমন কোনো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে না, এমন খাবার থাকতে হবে সেহরিতে।
এই সময় হজমে সুবিধা হবে এবং সারাদিন কাজ করার শক্তি পাবেন, এমন কয়েকটি খাবারের কথা জানিয়েছেন পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ নিশাত শারমিন নিশি।
১. সেহরিতে খেতে পারেন লাউয়ের তরকারি। লাউয়ে প্রচুর পানি থাকে। সারাদিনের পানির চাহিদার অনেকটাই পূরণ করবে এই খাবারটি। পাশাপাশি হজমেও সুবিধা হবে।
২. সেহরিতে থাকতে পারে কম কাটাযুক্ত বড় মাছ। মাছ পাতলা ঝোল করে এই সময় খাওয়া যেতে পারে। ভারি খাবার না খেয়ে এটি খেলে প্রোটিনের ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হবে।
৩. কার্বহাইড্রেটের ক্ষেত্রে পাতলা খিচুড়ি বা ওটস দিয়ে তৈরি খিচুড়ি খাওয়া যেতে পারে। ওটসের খিচুড়িতে মুরগির মাংস বা ডিমের সাদা অংশ যোগ করতে পারেন। এতে প্রোটিন পাবেন।
৪. দুধ হজম হলে দুধ-ভাতও খেয়ে নিতে পারেন। দুধ যে সুষম খাবার, আর দেহের জন্য ভালো- এ তো আর অজানা নয়।
৫. ইফতারের মতো সেহরিতেও এক বা দুটো খেজুর রাখা যেতে পারে। খেজুরে রয়েছে আঁশ বা ফাইবার। এই খাবারটি সারাদিন শক্তি জোগাতে সাহায্য করবে।
সুস্থভাবে রোজা পালনের জন্য এই সময় দাঁত ও মুখের আলাদা যত্নের প্রয়োজন রয়েছে। না হলে, দুর্গন্ধ, অস্বস্তি ও দাঁতের শিরশির ভাব বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। রোজার সময় দাঁত ও মুখের যত্নে রইল কিছু জরুরি পরামর্শ।
১. মুখ ও দাঁতের যত্নটা রোজার আগে বা শুরুতে করলেই ভালো। রোজার সময় যে সমস্যাটিতে মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগে, সেটা হলো মুখের তীব্র দুর্গন্ধ। এই দুর্গন্ধের কারণে অনেক সময় অনেকের ইবাদত-বন্দেগি বা রোজার যে পরিবত্রতা সেটি রক্ষা করা কষ্টকর হয়ে যায়। সেই ক্ষেত্রে অবশ্যই মুখের ও দাঁতের সমস্যার সমাধান করে নিতে হবে। পাশাপাশি রোজা রাখা অবস্থায় মুখের ভেতরের পরিষ্কার- পরিচ্ছন্নতা মেনে চলতে হবে।
২. দাঁত দুইবেলা ব্রাশ করার প্রতিদিনকার যে নিয়মটি রয়েছে, রোজার সময় এর একটু ব্যতিক্রম ঘটে। রোজার সময় দাঁতের যত্ন কিন্তু অবশ্যই নিতে হবে, তবে একটু অন্যভাবে। সাধারণত দাঁত ব্রাশ করা হয়, রাতের বেলা, খাবার পরে এবং সকালে নাস্তার পরে। তবে রমজানে যেহেতু দাঁত ব্রাশের বিষয়টি সকালে সম্ভব নয়, তাই সময়টি বদলে নিতে হবে। এটি করতে হবে সন্ধ্যার ইফতারের পর এবং ভোরে সেহরির পরে। এই দুটো সময় সুন্দরমতো ব্রাশ করলে দৈনন্দিন নিয়মটা ঠিক থাকে। পাশাপাশি ইফতার থেকে সেহরির সময়টা কুলি করতে পারেন। এ ছাড়া ফ্লস ও মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা যেতে পারে।
৩. দাঁত ও মুখ সবসময় সুস্থ রাখতে অন্তত ছয় মাস পর পর চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চেকআপ করিয়ে নেওয়া ভালো। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্কেলিং, পলিশিং করলে দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্য সুস্থ থাকে। অনেকে মনে করেন, মুখের ভেতরের পাথর দূর করার যে পদ্ধতি রয়েছে (স্কেলিং), সেটি হয়তো রোজা রাখা অবস্থায় করা যাবে না। তবে রোজা রাখা অবস্থায় মুখ ও দাঁতের যেকোনো চিকিৎসা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে মুখের ভেতরের কোনো ওষুধ, পানি বা রক্ত যেন গিলে না ফেলেন বা পেটের ভেতর চলে না যায়। তবে এর পরও যারা দ্বিধায় ভুগেন তারা স্কেলিংটা রোজার আগেই করে নিতে পারেন।
রোজা ধর্মপ্রাণ মুসলমানের জন্য একটি অনন্য সময়। এই সময়টায় সবাই চায় সুস্থভাবে রোজা রাখতে। তবে সুস্থভাবে এটি পালন করতে কিন্তু কিছু বিষয় আগে থেকেই মেনে চলা জরুরি।
তাই সাতকাহনের পাঠকদের জন্য রইল রোজার আগে কিছু জরুরি স্বাস্থ্য পরামর্শ। পরামর্শ দিয়েছেন পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ নিশাত শারমিন নিশি।
১. রোজার আগ থেকে খাবার একটু পরিমিত পরিমাণে খান। বাড়তি খাওয়ার অভ্যাস কমান। অনেকেই দেখা যায়, একটু পর পর কিছু না কিছু খেতে থাকে। এই অভ্যাসটি রোজার আগে থেকেই পরিবর্তন করুন।
২. পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে হবে। অনেকে কম পানি পান করে। এতে মূত্রতন্ত্রে সংক্রমণ হয়। তাই পানি পানের অভ্যাস কম থাকলে রোজার আগে থেকেই ত্যাগ করুন। না হলে রোজার সময় কষ্ট হবে।
৩. যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা, অ্যাজমা ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদে অসুখ রয়েছে, তারা রোজার আগে থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং ওষুধগুলো আগে থেকেই সমন্বয় করুন। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী চললে কোনো জটিলতা ছাড়া রোজা সুস্থভাবে কাটানো সম্ভব।
৪. যারা ওজন নিয়ে অনেক চিন্তিত, তারা রোজার আগেই একটি নিয়মানুবর্তী জীবনে চলে আসুন। যারা ওজন কমাতে খাবারের বিষয়টি নিয়ে দ্বিধায় পড়েন, তারা রাতের খাবারে কার্বহাইট্রেড ( ভাত, রুটি) কমিয়ে বা বন্ধ করে দিতে পারেন। আবার সারাদিনে সম্পূর্ণ কার্বহাইড্রেট বন্ধ না করে একবেলায় একটু কম খেতে পারেন বা বন্ধ করতে পারেন। এতে ওজন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
৫. প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষাগুলোও রোজার আগেই করিয়ে নিন। এতে শারীরিক অবস্থাটাও বোঝা যাবে। পাশাপাশি সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে রোজা রাখলে স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটবে না।
নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে অনেক সংগ্রামের কথা উল্লেখ রয়েছে ইতিহাসে। সেইসব প্রেক্ষাপটের কথা মাথায় রেখে বর্তমানের দিকে তাকালে, এই সময়ে এসে নারী কতটা বৈষম্যহীন কর্মক্ষেত্র পাচ্ছে? চলার পথ তাদের কতটা বন্ধুর বা মসৃণ? এসব ভাবনাই আমরা তুলে ধরছি সাতকাহনের পাতায়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীর ভাবনা নিয়ে দুই পর্বের এই লেখায় আজ শেষ পর্ব।
আফরোজা পারভীন
৬. আফরোজা পারভীন
বিউটি এক্সপার্ট, স্বত্বাধাকারী রেড, সহ প্রতিষ্ঠাতা উজ্জ্বলা
মেয়েদের পায়ের নিচের মাটি শক্ত থাকা উচিত। মেয়েদের শক্তিশালী হওয়া জরুরি। যতই মেয়েদের পায়ের নিচের মাটি শক্ত থাকবে, তাকে বড় ধরনের ঝড়ও উপড়ে ফেলতে পারবে না, তখন মেয়েটি দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে। পায়ের নিচের মাটি শক্ত থাকলে, সে যা চায়, তার সংসার, পরিবার, জীবন- সব গোছাতে পারবে। এর জন্য দরকার শিক্ষা ও কাজ। শিক্ষাতো সরকার দিয়েই যাচ্ছে। সেই সুযোগটা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি অবশ্যই কাজ করা উচিত। কাজ করলে ভিত শক্ত হবে। তাহলে যতই ঝড় আসুক মেয়েটি দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে।
সন্তানও এক সময় আমাকে দূরে ঠেলে দিতে পারে। আমার হয়তো মনে হতে পারে, আমি উঠে দাঁড়াতে না পারলে সন্তান তো রয়েছে। তবে এমন তো হতেই পারে, আমার সন্তানের মানসিকতা বদলে গেলো। সে হয়তো আমাকে দেখতেই চাইলো না বা সে হয়তো পারছে না। চাইছে কিন্তু পারছে না। তখন কি আমি আমার বাচ্চার ওপর বোঝা হয়ে যাবো ? সেটা হওয়া উচিত নয়।
একটা ছেলে যদি জন্মের পর থেকে ভেবে বড় হয়, আমাকে কাজ করতে হবে; আমাকে ‘শো রান’ করতে হবে, তাহলে একজন মেয়ে কেন জন্মের পর থেকে ভাবতে পারে না, আমাকে ‘শো রান’ করতে হবে ? মেয়েরা ভাবে না। কারণ, মেয়েদের বড় হওয়ার সময়টাতে পরিবার তার মাথায় ভুল ধারণা দিতে থাকে। বলতে থাকে, তুমি তো শ্বশুড় বাড়ি যাবে, তুমি তো বিয়ে করবে। একটা ভালো রেজাল্ট করো, ভালো বিয়ের জন্য। বুলশিট কথাবার্তা এগুলো। ভালো ফলাফল করতে হবে, কারণ তোমাকে একটি সম্মানজনক পজিশনে কাজ করতে হবে। সেটার জন্য। বিয়ের জন্য নয়। একটি ছেলেও তো কাজ করছে, সে বিয়ে করছে না ? তাহলে একটি মেয়েকে কেন শুধুমাত্র বিয়ে করার জন্যই পড়াশোনা করতে হবে? এটা হওয়া উচিত নয়। এ কারণে, আমার মনে হয় শিক্ষা ও কাজ-দুটো করতে হবে। আর আমার মনের শক্তি তখনই থাকবে, যখন আমার কাছে এ দুটো থাকবে।
সৈয়দা সানজিদা মহসিন
৭. সৈয়দা সানজিদা মহসিন
উপ-মহিলা বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ
নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য বেশি। নারী সাংসারিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক কিছুতে পিছিয়ে পড়ে। বিশেষ করে যাদের ছোট সন্তান, তাদের বাইরের কাজ রেখে সন্তান-সংসার দেখতে হয়। এ ছাড়া ইদানিং দায়িত্বশীল গৃহকর্মী না পাওয়ায় অনেকেই চাকরি ছেড়ে দেয়। অনেকে পরিবারের মানুষের সহযোগিতা পায় না।
নারীর এগিয়ে যেতে হলে সবার আগে নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে। নিজের পছন্দমতো জায়গা খুঁজে সেখানে ক্যারিয়ার বানানোর জন্য পরিবার থেকে সাহায্য করতে হবে।পড়াশুনা চলমান থাকাকালীন নিজে যে সেক্টরে কাজ করবে সে বিষয়ে আইডিয়া নিয়ে এগুনো জরুরি।
পরিবর্তনশীল পৃথিবীটাতে টিকে থাকলে হলে নারীর পুরুষকে বুঝতে হবে, পুরুষেরও নারীকে বুঝতে হবে। এরা একে অপরের পরিপূরক। কেউ কাউকে ছেড়ে নয়। দায়িত্বগুলো নারী-পুরুষ মিলে করলেই পরিবার শান্তিপূর্ণ থাকবে।
আঁখি ভদ্র
৮. আঁখি ভদ্র
স্বত্ত্বাধিকারী, ট্রিভো ফ্যাশন হাউজ।
নারীর আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। অতি আত্মবিশ্বাসের কথা বলছি না। তবে নিজের ওপর আস্থাটা থাকতে হবে। আমার সেই আত্মবিশ্বাসকে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারলেই নতুন কিছু পাবো।
আমি দীর্ঘ ১২ বছর একটা জায়গায় চাকরি করেছি। আমি তখন মনে করেছি এটাই আমার জায়গা। খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করেছি। এরপর মনে হয়েছে ব্যবসা করব। এখন আমি ব্যবসা শুরু করেছি। শ্রাবণী জলি ও আমি দুজন মিলে উদ্যোগটা নিয়েছিলাম দুই বছর আগে। আমাদের যে অনেক টাকা ছিল, স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্ব ছিল, সেটা নয়। আমাদের অনেক মানুষ চিনতোও না। আমাদের যা ছিল সেটা, আত্মবিশ্বাস। এই আত্মবিশ্বাসের কারণেই বোধহয় অনেকের কাছেই এখন পৌঁছাতে পেরেছি।
আমি যদি মনে করি ‘আমি পারবো না বা আমাকে করতে দেবে না, সহযোগিতা নাই কীভাবে করব?’ এমন ভেবে বসে থাকলে হবে না। আসলে কেউ কিছু করতে দেয় না বা দেবে না, করে ফেলতে হয়। নিজেকেই করতে হবে। আত্মবিশ্বাসটাই মূলকথা এবং আত্মবিশ্বাসই শেষ কথা।
এখন দেখা যায়, অনেক নারী উদ্যোক্তা হতে নিজের উদ্যোগ নিয়ে নেমে পড়ে। তারা অনেক বাধার সম্মুখীন হয়। তবে সেসব গল্প অন্যের কাছে করতে যাবেন না। ভাঙা বাড়ির শেষের ইটগুলোও মানুষ খুলে নিয়ে যায়। নিজের ভেঙে যাওয়র গল্প কাউকে না বলাই ভালো। আমি পারছি না- এটা না ভেবে শুধুমাত্র নিজেকে বিশ্বাস করে লেগে থাকুন। অন্য কাউকে বিশ্বাস বা ভরসা করার দরকার নেই। শক্ত হয়ে লেগে থাকতে থাকতে একটা সময় হয়ে যায়। কখনোই গিভ আপ করা যাবে না। লেগে থাকতে থাকতে একদিন দেখবেন অনেক বড় কিছু দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন।
নিশাত শারমিন নিশি
৯. নিশাত শারমিন নিশি
পুষ্টিবিদ ও বিভাগীয় প্রধান
পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর ওপর পুরুষের প্রভুত্ব করার বিষয়টি এখনও দেখা যায়। নারীর অধিকার ও সমতা নিয়ে অনেক কথা বলা হলেও বা আলোচনা চললেও বাস্তবিকতা কিন্তু ভিন্ন। নারী দিবসকে ঘিরে একটি নির্দিষ্ট গাইডলাইন করা হলে বোধহয় অনেকেই উপকৃত হতো। আমাদের একজন বেগম রোকেয়া ছিলেন, যিনি নারী মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। তবে এখন এসে কিন্তু নারীমুক্তির ক্ষেত্রে তেমন করে আমরা কোনো গাইডলাইন পাই না। এখন ২০২৪, এই সময়ে এসে আমাদের স্ট্রাগল করার কথা না। কিন্তু কোয়ালিফাইড হওয়ার পরে সমতা পাবার জন্য আমাদের স্ট্রাগল করতে হচ্ছে। একটা ছেলের ক্ষেত্রে কিন্তু এই বৈষম্যগুলো নেই। নারীদের জন্য কেউ কিছু করতে চাইলে সমতা বিধানের জায়গাটা নিশ্চিত করবে, এমন একটা প্ল্যাটফর্ম থাকাটা জরুরি।
প্রচলিত একটা ধারণা রয়েছে, একজন নারী, আরেকজন নারীর ভালো চায় না। আমি বলব যে কাজের জায়গায় বা পরিবারে আমরা যেনো পুরুষদের দিয়ে নিজেদের ডমিনেট করার সুযোগ করে না দিই। একে অন্যের পাশে দাঁড়াই। নারীর জন্য সম্মানের জায়গাটা রক্ষা করার জন্য ঐক্যটা থাকা জরুরি।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের গোড়াপত্তনের যে প্রেক্ষাপট সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন যদি শ্রমজীবী নারী পথে না নামতো, তাহলে হয়তো আজ আমি গর্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে সম্মান নিয়ে কাজ করতে পারতাম না। হয়ত আমাকেও ঘরেই বসে থাকতে হতো।
আমি যেখানে কাজ করি সে জায়গাটা পুরোপুরি কর্মবান্ধব। নারী বা পুরুষ হিসে আলাদা করে ট্রিট করা হয় না। যে যে যার যার যোগ্যতায় কাজ করে। কিন্তু তারপরেও যেনো নিরাপত্তাহীনতা কোথাও একটা কাজ করেই। অনেক সময় যখন কাজ করতে করতে রাত হয়ে যায়, তখন আমাদের পুরুষ সহকর্মীরা আমাদের আগেই বাসায় ফেরার জন্য তাড়া দেন। কারণ, আমরা নারীরা রাস্তায় কিংবা যানবাহনে এখনো নিরাপদ নই। তারা আমাদের নিরাপদে ঘরে ফেরা নিশ্চিত করতে দ্রুত ঘরে ফিরে যাওয়ার তাড়া দেন। এই ব্যপারটা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে ওই যে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট কিংবা ঘরে ফেরার পথ নারীদের জন্য এখনো নিরাপদ না এটা ভীষণ মন খারাপের একটা ব্যপার।
আমরা ভায়োলেন্স এগেইনেস্ট উইমেন এর ওপর বিভিন্ন ক্যাম্পেইন চালাই। সেখানকার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটোরই ডাটা সংগ্রহ করা থাকে। আমরা যখন পর্যালোচনা করি, তখন দেখা যায়, কী পরিমাণ সহিংসতা মূলক মন্তব্য মানুষ করে। এই মানুষের মধ্যে নারী ও পুরুষ উভয়েই রয়েছে। আমি বলবো, এই ক্যাম্পেইনগুলোর মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতার পরিমাণ হয়ত একেবারে কমিয়ে আনা যাবে না। তবে কিছু মানুষের চিন্তাতে অন্তত নাড়া দেওয়া যাবে। আর নেতিবাচক মনোভাব যাদের রয়েছে তাদের চিন্তা বদলানোর জন্যে হয়তো একটা স্টেপ আবার নেওয়া যাবে। একদিনে হয়ত হবে না। তবে এক সময় হয়ে যাবে।
পরিবারের সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। যে নারী যেকোনো ধরনের নিপীড়নের শিকার হয় হতে পারে, সেটা বিয়ের পর স্বামীর ঘরে কিংবা রাস্তায় বা যেকোনো কোথাও সে কিন্তু সবচেয়ে আগে পরিবারে বা তার মাকে এসে বলে। তখন মায়েরা আমাদের চুপ থাকতে বলে লোকে জানলে খারাপ বলবে। কিন্তু লোকে খারাপ বলবে ভেবে একজন ভিক্টিমকে যদি চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, তাতে করে এইসমস্ত লোকগুলো আরো বেশি আস্কারা পেয়ে যায়। এগুলো বাড়তেই থাকে।
লোকে কী ভাববে এটা ভাবনা থেকে বেরোতে হবে। নয়ত চুপ থাকতে থাকতে একদিন সংক্রামক হয়ে ছড়িয়ে যাবে এসব। তাই কথা বলতে হবে প্রতিবাদ করতে হবে।
আর এই প্রতিবাদটা আপনার সন্তান, মেয়ে, বোন বা স্ত্রীকে ঘর থেকেই শেখানো শুরু করুন। ওই প্রথম দিন থেকেই মায়েরা যদি চুপ করিয়ে না দিয়ে মেয়েটার পাশে দাঁড়িয়ে সাহস যোগান তাহলে একদিন কমে যাবে এইসব অনিরাপত্তার শঙ্কা।
নারী ও পুরুষের একে অপরের প্রতি সহযোগিতা, সহমর্মিতা পৃথিবীকে করে তুলতে পারে সুন্দর আবাসস্থল। এমন কথাতো হরহামেশাই বলা হয়। তবে এই ধারণা পোষণ বা প্রকাশ করলেও এর বাস্তবিক প্রয়োগ কতটুকু দেখা যায় ?
নারী আজকে যে জায়গায় পৌঁছেছে এর জন্য তাকে করতে হয়েছে অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগ। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের রয়েছে তেমনই একটি প্রেক্ষাপট। ১৮৫৭ সালে শ্রমজীবী নারী ন্যায্য মজুরি, দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মদিবস ও লিঙ্গ সমতার দাবিতে নিউইয়র্কের পথে নামে। তারপর থেকেই ধারাবাহিকতা শুরু। নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে অনেক সংগ্রামে উল্লেখ রয়েছে ইতিহাসে।
সেইসব প্রেক্ষাপটের কথা মাথায় রেখে বর্তমানের দিকে তাকালে, এখন এই সময়ে এসে নারী কর্মক্ষেত্রে কতটা বৈষম্যহীন কর্মক্ষেত্র পাচ্ছে, এগিয়ে চলার পথ তাদের কতটা বন্ধুর বা মসৃণ- এই নিয়ে আমরা তুলে ধরছি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীর ভাবনা। দুই পর্বের এই লেখায় এটি প্রথম পর্ব। এখানে থাকছে পাঁচ নারীর বক্তব্য।
মোহসেনা শাওন
১. মোহসেনা শাওন সিনিয়র নিউজ প্রেজেন্টার এনটিভি
নারী আসলে এখন অনেক এগিয়েছে বলা যায়। তবে কিছু জায়গায় তারা এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে এটাই বলবো। যেমন : গ্রামাঞ্চলে নারী পিছিয়ে রয়েছে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতে। স্বাস্থ্যগত বিষয়টি গ্রামাঞ্চল খুবই নাজুক। শহরেও দেখা যায় নিম্নবিত্ত নারীরা অবহেলিত স্বাস্থ্যজনিত ব্যাপারে। তারা রুটিনমাফিক ডাক্তারের কাছে যায় না। নারীশরীরবৃত্তিয় যেসব অসুখ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে তারা উদাসীন। যেমন : জরায়ুমুখের ক্যানসার, স্তন ক্যানসার, ঋতুস্রাব জনিত জটিলতা, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভাবস্থা ইত্যাদি। অবহেলা ও সচেতনার অভাবে এসব রোগ থেকে মৃত্যুও আমরা দেখি। সেই দিক থেকে নারী পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে, একটু উচ্চ বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ মেয়েদের যেভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়, নিম্নবিত্তরা কিন্তু সেভাবে আগায় না। একটা পরিবারে চারজন সন্তান থাকলে, সেখানে দুইজন মেয়ে ও দুইজন ছেলে থাকলে, তারা হয়তো চিন্তা করে ছেলেকে লেখাপড়া শেখাবে। তাদের পড়ালেখা শেখালে সংসারের হাল ধরবে। মেয়েদের ব্যপারে চিন্তা করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে দিয়ে বিদায় করে দেবে। মেয়েরা লেখাপড়া শিখে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতে পারবে না।
গ্রামাঞ্চলে নিম্নবিত্ত যারা রয়েছে একেবারেই খেটে খাওয়া মানুষ, তারা মেয়েদের দিয়ে বাইরে কাজ করাতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সেখানে মেয়েদের লেখাপড়ার বিষয়টা অনেক সময় ধার্তব্যের মধ্যেই আসে না।
সাইবার সিকিউরিটির দিক থেকে চিন্তা করলে মেয়েরা অনেক বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। আবার এখনো এই সময়ে এসে মেয়েরা ইভটিজিংয়ের শিকার হয়, যার কারণে অনেক ক্ষেত্রে তাদের পিছিয়ে পড়তে হয়; ঘর থেকে বের হতে পারে না। এইরকম কিছু ব্যাপার রয়েছে যেগুলোর জন্য মেয়েরা নিরাপদ নয়।
কর্মক্ষেত্রের কথা বললে সেখানেও নারীরা সেক্সচুয়াল হ্যারেজমেন্টের শিকার হচ্ছে, যে কারণে মেয়েদের দেখা যায় সেই চাকরিটা ছেড়ে দিচ্ছে। অন্য জায়গায় শিফট হচ্ছে বা কাজের ধরন পরিবর্তন করে ফেলছে। সেখানে তখন তো একটা নারী পিছিয়েই যায়।
নারীর এগিয়ে যেতে হলে যে জিনিসগুলো সবচেয়ে বেশি দরকার সেগুলো হলো- শিক্ষা, নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও চিকিৎসা। আমার যেটা মনে হয়, একটা মেয়ে শিক্ষিত হতে পারলে অনেক দূর এগিয়ে যায়। যখন একটা মেয়ে শিক্ষিত হতে পারে তখন তার পরিবারের হালটাও সমানভাবে ধরতে পারে, একটা ছেলের পাশাপাশি। পরিবারের স্বামী-স্ত্রী দুজনেই শিক্ষিত হলে এবং কর্মক্ষম হলে সংসারটা ভালো করে চালাতে পারে। এখন কিন্তু এই জিনিসটা অনেক বেড়েছে। প্রায় প্রতিটা ঘরে ঘরে দেখা যায় নারীরা কর্মক্ষম হচ্ছে। বাইরে কাজ করছে। শিক্ষিত নারী যারা রয়েছে, তারা সমাজে প্রভাব ফেলতে পারছে। একইভাবে রাজনীতি ও কর্মক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছেন।
তবে আমি মনে করি নারীকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে নারী ও পুরুষ উভয়কেই সমানভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে একজন নারীর যেমন ভূমিকা থাকে, তেমনি একজন পুরুষের ভূমিকা কোন অংশে কম নয়। একটি পরিবারে মেয়ে সন্তানকে এগিয়ে নিতে হলে তার বাবার ভূমিকা থাকতে হবে, ভাইয়ের ভূমিকা থাকতে হবে।
একজন বাবা বা ভাই তার কন্যা সন্তান বা বোনকে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে শিক্ষিত করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সাহায্য, সহযোগিতা ও স্বাধীনতা দিলে কাজটি সুন্দরভাবে মেয়েটি সম্পন্ন করতে পারে। সাহায্যটা কিন্তু প্রথমে পরিবার থেকেই হয়।
একই সঙ্গে একজন নারী কাজে গেলে পুরুষ সহকর্মীটিকেও তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে হবে। কাজের স্বাধীনতা দিতে হবে এবং কাজের মূল্যায়ন করতে হবে। অনেক পুরুষ সহকর্মী ভাবেন, নারীটি বোধহয় কাজটি নারী হওয়ার কারণে অন্যভাবেই বাগিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু সে যে যোগ্যতা দিয়েও কাজ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এটি তারা মানতে চায় না। যেই নারী যোগ্য, তার কাজে বাধার সৃষ্টি না করে তাদের সহযোগিতা করুন এবং তাদের প্রসংশা করুন।
একই সঙ্গে একজন নারীরও উচিত অন্য নারীর প্রতি সহমর্মী হওয়া। নারী যেন নারীর পাশে দাঁড়ায়। আমার কাছে মনে হয়, সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রাখতে নারী-পুুরুষ উভয়েরই একে অন্যকে সহযোগিতা করতে হবে। তাহলেই পরিবর্তন হবে গোটা সমাজের।
শিরিন আকতার
২. শিরিন আকতার নাট্য ও সংস্কৃতি কর্মী; সহ সাধারণ সম্পাদক উদীচি, গাইবান্ধা
আমি নারী ও পুরুষ উভয়কেই বলব জীবন যুদ্ধে বাঁচার লড়াইয়ে লড়াকু সকল নারীর প্রতি একটু শ্রদ্ধা আর সন্মান করতে শিখুন। তাদের প্রতি সহিংসতা থেকে বিরত থাকুন।
নারীর প্রাপ্য সন্মানটুকু দিতে সকলের মনটা প্রসারিত করুন। কারও ব্যক্তিগত জীবনকে আক্রমণ করে অসম্মান ও অবহেলার প্রবণতা থেকে সরে আসুন।
এখনো প্রান্তিক অঞ্চলে নারী ও শিশু ধর্ষিত হয়। এমনকি বৃদ্ধারাও বাদ যায় না। গণমাধ্যেম আমাদের যা দেখায় আমরা সেটুকুই দেখি। কিন্তু সবটা দেখতে পাই না। সবখানে পৌঁছাতে পারে না গণমাধ্যম। তাই আমি বলব, মেয়েদের শরীরকে মাংসপিণ্ড না ভেবে মানুষ ভাবুন সবাই। সেই বোধটা জাগ্রত হোক সকলের মধ্যে। নারী কারও সম্পত্তি না। সহজ সরল বোনেরা মায়েরা সচেতন নারী হয়ে উঠুন।
স্যালুট জানাই সেইসব অবহেলিত লাঞ্চিত মা বোনদের প্রতি যারা ঘুরে দাড়িয়ে বাঁচতে শিখেছে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে মেয়েরা ঘুরে দাঁড়াবেই। এমন দৃষ্টান্ত অনেক এ দেশে অনেক রয়েছে। তাই নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করুন।
একটা কথা সব নারীকে বারবার করে বলবো, ‘জাগো জাগো জাগো জাগো, কন্যা- মাতা- ভগ্নী।’ নিজের অধিকার বুঝে নিতে সচেতন হওয়া এবং লেখাপড়ার বিকল্প নেই। নিজের জন্য নিজেকে শক্তভাবে তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া নারীমুক্তির আর কোনো বিকল্প নেই।
ডা তাওহীদা রহমান ইরিন
৩. ডা. তাওহীদা রহমান ইরিন ডার্মটোলজিস্ট, রিজুভা ওয়েলনেস
অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেন নারীদের অর্জন তো প্রতিদিনই, তাহলে বিশেষ একটি দিন কেনো? আমি বলে রাখছি যে আমরা যারা নারী, আমাদের অগ্রগতি, সমাজে অবদান এবং সেটি পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে, কর্মক্ষেত্রে ও বৈশ্বিকভাবে- যাইহোক না কেনো এটার প্রশংসা আমরা রোজই করব। সেটা ঘর থেকেও হতে পারে, আমি যেখানে কাজ করছি সেখান থেকেও হতে পারে অথবা আমি যেখানে পড়ালেখা করছি সেখান থেকেও হতে পারে।
কিন্তু সেলিব্রেশন বা উদযাপনের জন্য একটা বিশেষ দিন বেছে নেওয়া হয় সেটা মার্চের মাসের আট তারিখ। একেকটা প্রতিষ্ঠান একেকভাবে সেলিব্রেট করে। প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য থাকে। যেমন, ইন্সপায়ারিং চেইঞ্জেস, মেক ইট হ্যাপেন, বি বোল্ড ফল চেইঞ্জেস, প্রেস ফর প্রোগ্রেস। থিম যাইহোক না কেনো নারীর জন্য একটি সুন্দর সুস্থ পৃথিবী প্রয়োজন, যেখানে নারী তাঁর সম্মান নিয়ে বাঁচবে, তাঁর অধিকার নিয়ে বাঁচবে; কথা সে বলতে পারবে স্বাধীনভাবে।
এই যে নারীকে সম্মান দেওয়া বা স্পেশাল অ্যাপ্রিসিয়েশনের জন্য প্রতিবছর এই দিনটা পালন করা হয়, এটার দরকার রয়েছে। শুধু নারীরাই নয় পুরুষরাও তাদের সমানভাবে সম্মান করে সাহায্য করে। নারী ও পুরুষ যৌথভাবে দলগত হয়ে কাজ করলেই সুন্দর একটা পৃথিবী তৈরি হবে।
শ্রাবণী জলি
৪. শ্রাবণী জলি উদ্যেক্তা, ট্রিভো
একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমি চাই আরো বেশি বেশি নারী এই কাজে এগিয়ে আসুক। নারীরা তো সংগ্রাম করছেই। এর মধ্যেই ছোটখাটো যে কাজটা সে পারে, যে গুণটা তাঁর রয়েছে সেটার মাধ্যমেই নিজেকে জানান দিক। নিজেকে মেলে ধরুক। বাইরে অন্তত পা রাখুক।
পুরুষ অনেক সময় ব্যাঙ্গ করে বলেন, ‘নারী দিবস! এই একটা দিনই তো তোমাদের, সেলিব্রেট করে নাও আমাদের কোনো দিবস লাগে না।’ আসলে একটা দিন আমাদের নয়। আমরা যেমন জন্মদিন উৎযাপন করি, সামনের দিনগুলো ভালো কাটে যেমন তেমন প্রত্যাশায় চলার পাথেয় সঞ্চার করে নারী দিবস। আমরা নিজেদের সংগ্রাম স্বপ্ন এগুলোকে আবার রিনিউ করতে পারে এমন একটা দিবস আমাদের সেই শক্তি সঞ্চার করে কোনো না কোনোভাবে অনুপ্রেরণা দেয়।
ডা. সানজিদা হোসাইন পাপিয়া
৫. ডা. সানজিদা হোসাইন পাপিয়া ডেনটিস্ট ও প্রোগরাম প্রেজেন্টার
বাংলাদেশের নারীরা এখনো শিক্ষার জায়গায় পিছিয়ে রয়েছে। এখনও অনেক নারী স্বশিক্ষায় বা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারছে না। আমার মনে হয় সে জায়গাটাতে একটু নজর দিতে হবে। আরেকটা জায়গায় নারীরা পিছিয়ে রয়েছে। সেটি হচ্ছে বোধের জায়গা। বোধ বলছি এ কারণে, অনেক শিক্ষিত নারী রয়েছে যারা এখনও তাদের অধিকার আদায়ের যে বিষয়টা কিংবা তাদের আত্মসম্মান রক্ষার যে বিষয়টা সেই জায়গাটা বুঝতে পারে না। এখনও অনেক শিক্ষিত নারীকে আমরা দেখি অসম্মানিত হচ্ছে তাঁর পরিবারে ভায়োলেন্সের শিকার হচ্ছে। তারপরও কিছু বলছে না, মুখ বুজে সহ্য করছে। আমি বলবো, এই জায়গাটিতে তারা পিছিয়ে রয়েছে। তারা নিজেদের অসহায় ভাবছে। তারা বুঝতে পারছে না যে কোথায় আসলে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এসব বিষয়ে আরো ভাবতে হবে বলে আমি মনে করি।
নারীকে শিক্ষিত হতে হবে। পাশাপাশি বোধের জায়গাটিও শাণিত করবে সে। তাহলে মানুষ হিসেবে নিজেকে আরো উন্নত করতে পারবে। আসলে নারীর ভেতরের আত্মবিশ্বাসকে সম্মান দিতে হবে। নারী নিজেকে সম্মান দিলে অন্যরা সম্মান দেবে। এইটুকুই মাথায় রাখা চাই।
নারী-পুরুষ সবার জন্যই একটা ছোট্ট বার্তা- নারী নিজের উন্নতির জন্য চেষ্টা করুন। আর পুরুষরা অবশ্যই তাদের পাশে থাকুন ৷ তাদের সহযোগিতা করতে না পারলেও, অন্তত বাধা দেবেন না। তারা যখন ভালো কাজ করবে, নিজেদের একটা ভালাে জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে, তখন আপনার পরিবার, আপনার সন্তান এবং আপনি নিজেও সবদিক থেকে সমৃদ্ধ হবেন।
অর্থনৈতিক বিষয়ে অন্যের ওপর নির্ভর করাতে সবসময় একটি আপত্তি ছিল পাপিয়া সুলতানা ঝিলিকের। চুয়াডাঙার এই মেয়ে চাইতেন নিজের পায়ের মাটি শক্ত করতে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে। আর তাঁর এই ইচ্ছায় সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে মা ও স্বামী। পাশাপাশি ছিল বিউটিফিকেশন প্রশিক্ষণকেন্দ্র উজ্জ্বলা।
২০২৩ সালের ২৭ মে থেকে ৬ জুন চুয়াডাঙায় বিউটিফিকেশন ও বিউটিপার্লার বিষয়ক ১০দিনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন হয় জয়িতা ফাউন্ডেশন ও উজ্জ্বলার যৌথ উদ্যোগে। এই কোর্সে অংশ নেন ঝিলিক। কোর্স শেষে বর্তমানে নিজেই একটি ছোট স্যালন দিয়েছেন; হয়ে উঠেছেন স্বাবলম্বী।
‘ছোট থেকে অন্যদের সাজাতে পছন্দ করতাম। ছোট-খাটো বিষয় নিয়ে অনেকেই আমার কাছে আসতো। তো এগুলো ছোটবেলা থেকে টুকটাক পারতাম। তখন আমার মা আমাকে তাঁর একজন পরিচিত মানুষের কাছে বিউটিফিকেশনের কাজ শিখতে দেন। শেখান থেকে কিছুটা ধারণা পাই। এরপর যখন জানতে পারলাম উজ্জ্বলা চুয়াডাঙায় কোর্স নিয়ে আসছে, তখন এক পায়ে রাজি হয়ে গেলাম,’ বলছিলেন ঝিলিক।
উজ্জ্বলার সহ প্রতিষ্ঠাতা আফরোজা পারভীনের সঙ্গে পাপিয়া সুলতানা ঝিলিক। ছবি : সংগৃহীত
উজ্জ্বলার সহ প্রতিষ্ঠাতা আফরোজা পারভীন ম্যাডামকে অনেক আগে থেকে ফলো করতাম। যেহেতু বিউটিফিকেশনের বিষয়ে আমার কোনো সার্টিফিকেট ছিল না। আর আফরোজা ম্যামকেও খুব ভালো লাগতো, তাই কোর্সটি দেখে খুব আগ্রহী হই, জানান ঝিলিক।
জয়িতা ও উজ্জ্বলা ফাউন্ডেশনের করা ১০ দিনব্যাপি এই বিউটিফিকেশনে ছিল মেকআপ, স্কিন কেয়ার, হেয়ার কেয়ার, হেয়ার কাট ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ। ঝিলিক বলেন, ‘আগে আমি স্কিন কেয়ার ও হেয়ার কেয়ারের বিষয়ে অত ভালোভাবে জানতাম না। তবে এই কোর্স করে বেশি ভালোভাবে বিষয়গুলো বুঝতে পারি। এখন আমি আমার ক্লাইন্টদের ওপর এগুলো প্রয়োগ করি। ক্লাইন্টরাও সন্তুষ্ট হয়।’
উজ্জ্বলার কোর্সে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন পাপিয়া সুলতানা ঝিলিক। ছবি : সংগৃহীত
বর্তমানের স্যালনটিকে ভবিষতে আরো বড় করতে চাই এবং আরো প্রশিক্ষণ নিতে চাই জানিয়ে ঝিলিক মন্তব্য করেন, ‘বিনামূল্যে হওয়া এই ধরনের প্রশিক্ষণগুলো নারীদের জন্য খুব উপকারী। এ ধরনের কোর্স প্রতিটি জেলায় জেলায় হয় বলে, তৃণমূল নারীর কাছেও পৌঁছে যায়। এই ধরনের কোর্সগুলো বেসিকে না থেকে অ্যাডভান্স পর্যায়ে হলে মেয়েরা আরো উপকৃত হবে।
আসলে প্রতিটি নারীর অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়াটা খুব জরুরি, যতই তার স্বামী বা বাবা স্বচ্ছল হােক না কেন- জানিয়ে ঝিলিক বলেন, ‘তা হলে যেকোনো কঠিন অবস্থায় মেয়েটি দাঁড় হয়ে থাকতে পারবে। আমি যেমন আজ একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হয়েছি, তেমনি ভবিষ্যতে আরো মেয়ে এই পেশায় আসুক এটাই এখন চাওয়া।’
বি : দ্র : বাংলাদেশের বিউটি অ্যান্ড গ্রুমিং ইন্ডাস্ট্রিতে উদ্যোক্তা তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে উজ্জ্বলা লিমিটেড। উজ্জ্বলায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং সংগ্রাম করে সাফল্য অর্জন করেছেন, এমন কয়েকজন নারী ও পুরুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে সাতকাহনের ধারাবাহিক পর্ব চলছে। এই পর্বটি ছিল ৯৪তম। উজ্জ্বলা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন :