কখনও কখনও আমরা নিজেকেই ভালোবাসতে পারি না। তাহলে অন্য কেউ আমাদের কীভাবে ভালোবাসবে? অথচ নিজের সঙ্গেই সম্পর্কটা হওয়া প্রয়োজন সবচেয়ে গভীর।
আবার অনেকে নিজেকে ভালোবাসা মানে স্বার্থপরতা মনে করে বা আমাদের সমাজ সেটা বোঝায়। তবে স্বার্থপর না হয়েও, অন্যের প্রতি অন্যায় না করেও নিজেকে ভালোবাসা সম্ভব। আর সেটাই ‘হেলদি সেলফলাভ’। ‘নিজেকে ভালোবাসা’র এই বিষয়টি নিয়ে নিজের ও পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ব্লগ লিখেছেন ব্লায়ার নিকোলে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একজন সাবেক থেরাপিস্ট ও সেলফ কমপেশন রিসার্চার। তার লেখার ভাবানুবাদ করেছেন শাশ্বতী মাথিন। আজ লেখার প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো।
—–
নিজেকে ভালোবাসা সহজ নয়, বিশেষ করে ক্যাওস (বিশৃঙ্খলা), ট্রমা (গভীর ক্ষতিকর মানসিক আঘাত) অথবা সারাক্ষণ অন্যের যত্ন নেওয়ার বিষয়টির ভেতরে থাকলে। আমি জানি, বিষয়টা কত বেদনাদায়ক। আমার নাম ব্লায়ার নিকোলে। বহু বছর আমি নিজের সম্পর্কগুলোতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দিয়েছি। কারণ আমি বিশ্বাস করতাম, এভাবেই অন্যদের ভালোবাসা পাওয়া যায়। আমার ওপর আরোপিত প্রত্যেকের প্রত্যাশা পূরণ করেছি এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা করেছি। তবে এটা তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল না।
কথাগুলো কি আপনার জীবনের সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে?
আসলে আমাদের বেশির ভাগকেই শেখানো হয় না, কীভাবে নিজেকে ভালোবাসতে হয়। বরং আমাদের বলা হয়, অনেক কর্মক্ষম হও, দেখতে সুন্দর হও, আরও করো, সফলতা অর্জন করো, নিজেকে গড়ো— তাহলেই অন্যের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে এগুলো সব পশ্চাৎপদ ধারণা।
নিজেকে ভালোবাসা মানে কেবলই আত্মবিশ্বাস, সব সময় ইতিবাচক থাকা বা নিজেকে ঠিকঠাক রাখা নয়; এটা মূলত নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, বিশেষ করে কঠিন মুহূর্তগুলোতে।
এই লেখায় ‘নিজেকে ভালোবাসা’ আসলে কী, সেটার একটি গাইডলাইনই আমি দেবো। কেন নিজেকে ভালোবাসা অনেকের কাছে কঠিন, নিজেকে ভালোবাসার বাস্তবিক এবং টেকসই উপায় বাতলাব।
এই গাইডলাইন, বিশেষ করে তাদের জন্য, যারা নিজেকে ভালোবাসার চর্চার মধ্য দিয়ে গেছেন। তবে এরপরও মনে হয়েছে, কাজটি কঠিন। আসলে এটি কাজ না করার বড় কারণ হচ্ছে আপনি আপনার ভয়, লজ্জা ও নার্ভাস সিস্টেমকে (স্নায়ুবিক পদ্ধতিগুলো) চিহ্নিত করেননি। তবে সুখবর হলো, আপনি এখনই নিজেকে ভালোবাসার এই যাত্রা শুরু করতে পারেন এবং মানসিকভাবে কোনো অবস্থায় রয়েছেন, এখানে সেটা কোনো বিষয়ই নয়।
নিজেকে ভালোবাসা কী?
এটি কেবল একটি অনুভূতি নয়। এটি নিজের সঙ্গে তৈরি করা সম্পর্ক। আর অন্যান্য সম্পর্কের মতো এখানেও মনোযোগ, ধৈর্য ও পুনর্গঠনের প্রয়োজন পড়ে। এটি কেবল একমুহূর্তের কোনো কাজ নয়। এটি আসলে চর্চা, একটি দীর্ঘ মেয়াদের অভ্যাস। এটি ধারাবাহিকভাবে নিজেকে বেছে নেওয়া। এমনকি সব কঠিন হওয়ার সময়েও।
আবার নিজেকে ভালোবাসা মানে এই নয় যে সারাক্ষণ সুখী বোধ করা বা কখনও কখনও নিজেকে সন্দেহ না করা। প্রতিদিন আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে সব অবস্থায় সঠিক মনে করাও নিজেকে ভালোবাসা নয়। নিজেকে ভালোবাসার বিষয়টি আরও গভীর কিছু। এটি হলো কিছু ভালো না লাগার পরও নিজেকে গ্রহণ করা এবং গুরুত্ব দেওয়া।
এটি হলো নিজের ভয়-শঙ্কার ভেতর দাঁড়িয়ে থেকেও বলা—
‘এ মুহূর্তে যে অবস্থাই পার করো না কেন, তুমি যথেষ্ট, তুমি ভালোবাসা ও সম্মান পাওয়ার যোগ্য।’
বহু সময় এই কথাগুলো আমি বুঝতেই পারিনি। কখনও কখনও আত্মবিশ্বাস, যোগ্যতায় আমার নিজেকে উচ্চতার চূড়ায় মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, আমার জীবনে সব সঠিক হয়ে গেছে। তবে কিছুদিন পরেই কোনো ঘটনায় আমার খারাপ লেগেছে। আমি নিজেকে প্রশ্ন করা শুরু করেছি, নিজেকে সন্দেহ করেছি, নিজেকে সমালোচনা করেছি। আমার আত্মবিশ্বাস কমেছে। মনে হয়েছে, নিজেকে কি তবে এতদিন মিথ্যা বলেছি?
এখনো মাঝেমধ্যে এই অনুভূতি আমার ভেতরে কাজ করে। তখন আমি থামি এবং বলি, ‘ওহ্, এটা কেবল একটা অনুভূতি। ঠিক আছে। এভাবেও কখনও কখনও মনে হতে পারে। এই আবেগটা কঠিন। তবে এরপরও আমি আমাকে ভালোবাসি।’
এই ছোট মানসিক পরিবর্তন আমাকে অনেক কঠিন সময় পার করে দিতে সাহায্য করে। এই পরিবর্তন আমি কীভাবে করলাম? এর চারটি মূল স্তম্ভ রয়েছে।
১. নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া
এটি ভিত্তি। নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া মানে নিজেকে দয়া দেখানো, বিশেষ করে যখন আমরা বাজে সময়ের মধ্য দিয়ে যাই। এটি নিজেকে মনে করানো যে অপূর্ণতা বা সবকিছুতে সঠিক না হওয়াও মানবজীবনের অংশ। বন্ধুর কঠিন সময়ে আপনি যেভাবে সহানুভূতি দেখান, নিজের প্রতি ঠিক সেই কাজটিই করুন। নিজেকে বলুন, ‘এটা কঠিন ছিল। তবে আমি সর্বােচ্চ চেষ্টা করেছি এবং এটা যথেষ্ট।’
২. নিজেকে ক্ষমা করুন
আগের করা ভুল দিয়ে আমাদের বর্তমান মাপা যায় না। নিজেকে ক্ষমা করতে শিখুন। পাঁচ বছর আগে আপনি যেমন ছিলেন, আজ নিশ্চয়ই তেমন নন। এমনকি এর আগের সপ্তাহেও আপনার আচরণ যেমন ছিল, তার থেকে এখন কিছুটা নিশ্চয়ই পরিবর্তন হয়েছে। নিজেকে বারবার দোষী মনে করা এবং বিচার করতে থাকা আপনাকে কিন্তু মহৎ মানুষে পরিণত করবে না। এটা কেবল আপনাকে একই জায়গায় আটকে রাখবে।
৩. নিজেকে বিশ্বাস করা
বহু বছর আমি নিজের কাজকে বিশ্বাস করতে পারিনি। আমি অন্যের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা খুঁজতাম। অন্যে সঠিক বললেই নিজেকে ভালো মনে হতো। তবে নিজেকে ভালোবাসার বিষয়টি বিশ্বাস দাবি করে। এটি হলো, নিজের ভেতরের শব্দকে শোনা। নিজের প্রয়োজন, অনুভূতি ও সিদ্ধান্তগুলো বোঝা। এমনকি সব অনিশ্চিত হয়ে পড়লেও আমি সামলাতে পারব– এই বিশ্বাস রাখা।
৪. নিজের যত্ন
নিজের যত্ন মানে কেবল সাবানের ফেনার ভেতর গোসল করা বা ফেস মাস্ক পরে বসে থাকা নয়; এটি হচ্ছে প্রতিদিন নিজের প্রয়োজনগুলো মেটানো। পর্যাপ্ত ঘুমানো, অন্যের সঙ্গে নিজের সীমারেখা টানা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং নিজেকে বিশ্রাম নিতে অনুমতি দেওয়া। এটি হলো, নিজের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করা। নিজের অস্থিতিশীলতাকে মেনে নেওয়া। সারাক্ষণ সামনে কী কী কাজ করতে হবে, সে তালিকা বানানো নয়। নিজেকে বলা, ‘আমিও গুরুত্বপূর্ণ।’
চলবে…


