রোজা ধর্মপ্রাণ মুসলমানের জন্য একটি অনন্য সময়। এই সময়টায় সবাই চায় সুস্থভাবে রোজা রাখতে। তবে সুস্থভাবে এটি পালন করতে কিন্তু কিছু বিষয় আগে থেকেই মেনে চলা জরুরি।
তাই সাতকাহনের পাঠকদের জন্য রইল রোজার আগে কিছু জরুরি স্বাস্থ্য পরামর্শ। পরামর্শ দিয়েছেন পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ নিশাত শারমিন নিশি।
১. রোজার আগ থেকে খাবার একটু পরিমিত পরিমাণে খান। বাড়তি খাওয়ার অভ্যাস কমান। অনেকেই দেখা যায়, একটু পর পর কিছু না কিছু খেতে থাকে। এই অভ্যাসটি রোজার আগে থেকেই পরিবর্তন করুন।
২. পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে হবে। অনেকে কম পানি পান করে। এতে মূত্রতন্ত্রে সংক্রমণ হয়। তাই পানি পানের অভ্যাস কম থাকলে রোজার আগে থেকেই ত্যাগ করুন। না হলে রোজার সময় কষ্ট হবে।
৩. যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা, অ্যাজমা ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদে অসুখ রয়েছে, তারা রোজার আগে থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং ওষুধগুলো আগে থেকেই সমন্বয় করুন। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী চললে কোনো জটিলতা ছাড়া রোজা সুস্থভাবে কাটানো সম্ভব।
৪. যারা ওজন নিয়ে অনেক চিন্তিত, তারা রোজার আগেই একটি নিয়মানুবর্তী জীবনে চলে আসুন। যারা ওজন কমাতে খাবারের বিষয়টি নিয়ে দ্বিধায় পড়েন, তারা রাতের খাবারে কার্বহাইট্রেড ( ভাত, রুটি) কমিয়ে বা বন্ধ করে দিতে পারেন। আবার সারাদিনে সম্পূর্ণ কার্বহাইড্রেট বন্ধ না করে একবেলায় একটু কম খেতে পারেন বা বন্ধ করতে পারেন। এতে ওজন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
৫. প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষাগুলোও রোজার আগেই করিয়ে নিন। এতে শারীরিক অবস্থাটাও বোঝা যাবে। পাশাপাশি সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে রোজা রাখলে স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটবে না।
নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে অনেক সংগ্রামের কথা উল্লেখ রয়েছে ইতিহাসে। সেইসব প্রেক্ষাপটের কথা মাথায় রেখে বর্তমানের দিকে তাকালে, এই সময়ে এসে নারী কতটা বৈষম্যহীন কর্মক্ষেত্র পাচ্ছে? চলার পথ তাদের কতটা বন্ধুর বা মসৃণ? এসব ভাবনাই আমরা তুলে ধরছি সাতকাহনের পাতায়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীর ভাবনা নিয়ে দুই পর্বের এই লেখায় আজ শেষ পর্ব।
আফরোজা পারভীন
৬. আফরোজা পারভীন
বিউটি এক্সপার্ট, স্বত্বাধাকারী রেড, সহ প্রতিষ্ঠাতা উজ্জ্বলা
মেয়েদের পায়ের নিচের মাটি শক্ত থাকা উচিত। মেয়েদের শক্তিশালী হওয়া জরুরি। যতই মেয়েদের পায়ের নিচের মাটি শক্ত থাকবে, তাকে বড় ধরনের ঝড়ও উপড়ে ফেলতে পারবে না, তখন মেয়েটি দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে। পায়ের নিচের মাটি শক্ত থাকলে, সে যা চায়, তার সংসার, পরিবার, জীবন- সব গোছাতে পারবে। এর জন্য দরকার শিক্ষা ও কাজ। শিক্ষাতো সরকার দিয়েই যাচ্ছে। সেই সুযোগটা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি অবশ্যই কাজ করা উচিত। কাজ করলে ভিত শক্ত হবে। তাহলে যতই ঝড় আসুক মেয়েটি দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে।
সন্তানও এক সময় আমাকে দূরে ঠেলে দিতে পারে। আমার হয়তো মনে হতে পারে, আমি উঠে দাঁড়াতে না পারলে সন্তান তো রয়েছে। তবে এমন তো হতেই পারে, আমার সন্তানের মানসিকতা বদলে গেলো। সে হয়তো আমাকে দেখতেই চাইলো না বা সে হয়তো পারছে না। চাইছে কিন্তু পারছে না। তখন কি আমি আমার বাচ্চার ওপর বোঝা হয়ে যাবো ? সেটা হওয়া উচিত নয়।
একটা ছেলে যদি জন্মের পর থেকে ভেবে বড় হয়, আমাকে কাজ করতে হবে; আমাকে ‘শো রান’ করতে হবে, তাহলে একজন মেয়ে কেন জন্মের পর থেকে ভাবতে পারে না, আমাকে ‘শো রান’ করতে হবে ? মেয়েরা ভাবে না। কারণ, মেয়েদের বড় হওয়ার সময়টাতে পরিবার তার মাথায় ভুল ধারণা দিতে থাকে। বলতে থাকে, তুমি তো শ্বশুড় বাড়ি যাবে, তুমি তো বিয়ে করবে। একটা ভালো রেজাল্ট করো, ভালো বিয়ের জন্য। বুলশিট কথাবার্তা এগুলো। ভালো ফলাফল করতে হবে, কারণ তোমাকে একটি সম্মানজনক পজিশনে কাজ করতে হবে। সেটার জন্য। বিয়ের জন্য নয়। একটি ছেলেও তো কাজ করছে, সে বিয়ে করছে না ? তাহলে একটি মেয়েকে কেন শুধুমাত্র বিয়ে করার জন্যই পড়াশোনা করতে হবে? এটা হওয়া উচিত নয়। এ কারণে, আমার মনে হয় শিক্ষা ও কাজ-দুটো করতে হবে। আর আমার মনের শক্তি তখনই থাকবে, যখন আমার কাছে এ দুটো থাকবে।
সৈয়দা সানজিদা মহসিন
৭. সৈয়দা সানজিদা মহসিন
উপ-মহিলা বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ
নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য বেশি। নারী সাংসারিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক কিছুতে পিছিয়ে পড়ে। বিশেষ করে যাদের ছোট সন্তান, তাদের বাইরের কাজ রেখে সন্তান-সংসার দেখতে হয়। এ ছাড়া ইদানিং দায়িত্বশীল গৃহকর্মী না পাওয়ায় অনেকেই চাকরি ছেড়ে দেয়। অনেকে পরিবারের মানুষের সহযোগিতা পায় না।
নারীর এগিয়ে যেতে হলে সবার আগে নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে। নিজের পছন্দমতো জায়গা খুঁজে সেখানে ক্যারিয়ার বানানোর জন্য পরিবার থেকে সাহায্য করতে হবে।পড়াশুনা চলমান থাকাকালীন নিজে যে সেক্টরে কাজ করবে সে বিষয়ে আইডিয়া নিয়ে এগুনো জরুরি।
পরিবর্তনশীল পৃথিবীটাতে টিকে থাকলে হলে নারীর পুরুষকে বুঝতে হবে, পুরুষেরও নারীকে বুঝতে হবে। এরা একে অপরের পরিপূরক। কেউ কাউকে ছেড়ে নয়। দায়িত্বগুলো নারী-পুরুষ মিলে করলেই পরিবার শান্তিপূর্ণ থাকবে।
আঁখি ভদ্র
৮. আঁখি ভদ্র
স্বত্ত্বাধিকারী, ট্রিভো ফ্যাশন হাউজ।
নারীর আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। অতি আত্মবিশ্বাসের কথা বলছি না। তবে নিজের ওপর আস্থাটা থাকতে হবে। আমার সেই আত্মবিশ্বাসকে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারলেই নতুন কিছু পাবো।
আমি দীর্ঘ ১২ বছর একটা জায়গায় চাকরি করেছি। আমি তখন মনে করেছি এটাই আমার জায়গা। খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করেছি। এরপর মনে হয়েছে ব্যবসা করব। এখন আমি ব্যবসা শুরু করেছি। শ্রাবণী জলি ও আমি দুজন মিলে উদ্যোগটা নিয়েছিলাম দুই বছর আগে। আমাদের যে অনেক টাকা ছিল, স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্ব ছিল, সেটা নয়। আমাদের অনেক মানুষ চিনতোও না। আমাদের যা ছিল সেটা, আত্মবিশ্বাস। এই আত্মবিশ্বাসের কারণেই বোধহয় অনেকের কাছেই এখন পৌঁছাতে পেরেছি।
আমি যদি মনে করি ‘আমি পারবো না বা আমাকে করতে দেবে না, সহযোগিতা নাই কীভাবে করব?’ এমন ভেবে বসে থাকলে হবে না। আসলে কেউ কিছু করতে দেয় না বা দেবে না, করে ফেলতে হয়। নিজেকেই করতে হবে। আত্মবিশ্বাসটাই মূলকথা এবং আত্মবিশ্বাসই শেষ কথা।
এখন দেখা যায়, অনেক নারী উদ্যোক্তা হতে নিজের উদ্যোগ নিয়ে নেমে পড়ে। তারা অনেক বাধার সম্মুখীন হয়। তবে সেসব গল্প অন্যের কাছে করতে যাবেন না। ভাঙা বাড়ির শেষের ইটগুলোও মানুষ খুলে নিয়ে যায়। নিজের ভেঙে যাওয়র গল্প কাউকে না বলাই ভালো। আমি পারছি না- এটা না ভেবে শুধুমাত্র নিজেকে বিশ্বাস করে লেগে থাকুন। অন্য কাউকে বিশ্বাস বা ভরসা করার দরকার নেই। শক্ত হয়ে লেগে থাকতে থাকতে একটা সময় হয়ে যায়। কখনোই গিভ আপ করা যাবে না। লেগে থাকতে থাকতে একদিন দেখবেন অনেক বড় কিছু দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন।
নিশাত শারমিন নিশি
৯. নিশাত শারমিন নিশি
পুষ্টিবিদ ও বিভাগীয় প্রধান
পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর ওপর পুরুষের প্রভুত্ব করার বিষয়টি এখনও দেখা যায়। নারীর অধিকার ও সমতা নিয়ে অনেক কথা বলা হলেও বা আলোচনা চললেও বাস্তবিকতা কিন্তু ভিন্ন। নারী দিবসকে ঘিরে একটি নির্দিষ্ট গাইডলাইন করা হলে বোধহয় অনেকেই উপকৃত হতো। আমাদের একজন বেগম রোকেয়া ছিলেন, যিনি নারী মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। তবে এখন এসে কিন্তু নারীমুক্তির ক্ষেত্রে তেমন করে আমরা কোনো গাইডলাইন পাই না। এখন ২০২৪, এই সময়ে এসে আমাদের স্ট্রাগল করার কথা না। কিন্তু কোয়ালিফাইড হওয়ার পরে সমতা পাবার জন্য আমাদের স্ট্রাগল করতে হচ্ছে। একটা ছেলের ক্ষেত্রে কিন্তু এই বৈষম্যগুলো নেই। নারীদের জন্য কেউ কিছু করতে চাইলে সমতা বিধানের জায়গাটা নিশ্চিত করবে, এমন একটা প্ল্যাটফর্ম থাকাটা জরুরি।
প্রচলিত একটা ধারণা রয়েছে, একজন নারী, আরেকজন নারীর ভালো চায় না। আমি বলব যে কাজের জায়গায় বা পরিবারে আমরা যেনো পুরুষদের দিয়ে নিজেদের ডমিনেট করার সুযোগ করে না দিই। একে অন্যের পাশে দাঁড়াই। নারীর জন্য সম্মানের জায়গাটা রক্ষা করার জন্য ঐক্যটা থাকা জরুরি।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের গোড়াপত্তনের যে প্রেক্ষাপট সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন যদি শ্রমজীবী নারী পথে না নামতো, তাহলে হয়তো আজ আমি গর্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে সম্মান নিয়ে কাজ করতে পারতাম না। হয়ত আমাকেও ঘরেই বসে থাকতে হতো।
আমি যেখানে কাজ করি সে জায়গাটা পুরোপুরি কর্মবান্ধব। নারী বা পুরুষ হিসে আলাদা করে ট্রিট করা হয় না। যে যে যার যার যোগ্যতায় কাজ করে। কিন্তু তারপরেও যেনো নিরাপত্তাহীনতা কোথাও একটা কাজ করেই। অনেক সময় যখন কাজ করতে করতে রাত হয়ে যায়, তখন আমাদের পুরুষ সহকর্মীরা আমাদের আগেই বাসায় ফেরার জন্য তাড়া দেন। কারণ, আমরা নারীরা রাস্তায় কিংবা যানবাহনে এখনো নিরাপদ নই। তারা আমাদের নিরাপদে ঘরে ফেরা নিশ্চিত করতে দ্রুত ঘরে ফিরে যাওয়ার তাড়া দেন। এই ব্যপারটা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে ওই যে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট কিংবা ঘরে ফেরার পথ নারীদের জন্য এখনো নিরাপদ না এটা ভীষণ মন খারাপের একটা ব্যপার।
আমরা ভায়োলেন্স এগেইনেস্ট উইমেন এর ওপর বিভিন্ন ক্যাম্পেইন চালাই। সেখানকার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটোরই ডাটা সংগ্রহ করা থাকে। আমরা যখন পর্যালোচনা করি, তখন দেখা যায়, কী পরিমাণ সহিংসতা মূলক মন্তব্য মানুষ করে। এই মানুষের মধ্যে নারী ও পুরুষ উভয়েই রয়েছে। আমি বলবো, এই ক্যাম্পেইনগুলোর মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতার পরিমাণ হয়ত একেবারে কমিয়ে আনা যাবে না। তবে কিছু মানুষের চিন্তাতে অন্তত নাড়া দেওয়া যাবে। আর নেতিবাচক মনোভাব যাদের রয়েছে তাদের চিন্তা বদলানোর জন্যে হয়তো একটা স্টেপ আবার নেওয়া যাবে। একদিনে হয়ত হবে না। তবে এক সময় হয়ে যাবে।
পরিবারের সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। যে নারী যেকোনো ধরনের নিপীড়নের শিকার হয় হতে পারে, সেটা বিয়ের পর স্বামীর ঘরে কিংবা রাস্তায় বা যেকোনো কোথাও সে কিন্তু সবচেয়ে আগে পরিবারে বা তার মাকে এসে বলে। তখন মায়েরা আমাদের চুপ থাকতে বলে লোকে জানলে খারাপ বলবে। কিন্তু লোকে খারাপ বলবে ভেবে একজন ভিক্টিমকে যদি চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, তাতে করে এইসমস্ত লোকগুলো আরো বেশি আস্কারা পেয়ে যায়। এগুলো বাড়তেই থাকে।
লোকে কী ভাববে এটা ভাবনা থেকে বেরোতে হবে। নয়ত চুপ থাকতে থাকতে একদিন সংক্রামক হয়ে ছড়িয়ে যাবে এসব। তাই কথা বলতে হবে প্রতিবাদ করতে হবে।
আর এই প্রতিবাদটা আপনার সন্তান, মেয়ে, বোন বা স্ত্রীকে ঘর থেকেই শেখানো শুরু করুন। ওই প্রথম দিন থেকেই মায়েরা যদি চুপ করিয়ে না দিয়ে মেয়েটার পাশে দাঁড়িয়ে সাহস যোগান তাহলে একদিন কমে যাবে এইসব অনিরাপত্তার শঙ্কা।
নারী ও পুরুষের একে অপরের প্রতি সহযোগিতা, সহমর্মিতা পৃথিবীকে করে তুলতে পারে সুন্দর আবাসস্থল। এমন কথাতো হরহামেশাই বলা হয়। তবে এই ধারণা পোষণ বা প্রকাশ করলেও এর বাস্তবিক প্রয়োগ কতটুকু দেখা যায় ?
নারী আজকে যে জায়গায় পৌঁছেছে এর জন্য তাকে করতে হয়েছে অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগ। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের রয়েছে তেমনই একটি প্রেক্ষাপট। ১৮৫৭ সালে শ্রমজীবী নারী ন্যায্য মজুরি, দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মদিবস ও লিঙ্গ সমতার দাবিতে নিউইয়র্কের পথে নামে। তারপর থেকেই ধারাবাহিকতা শুরু। নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে অনেক সংগ্রামে উল্লেখ রয়েছে ইতিহাসে।
সেইসব প্রেক্ষাপটের কথা মাথায় রেখে বর্তমানের দিকে তাকালে, এখন এই সময়ে এসে নারী কর্মক্ষেত্রে কতটা বৈষম্যহীন কর্মক্ষেত্র পাচ্ছে, এগিয়ে চলার পথ তাদের কতটা বন্ধুর বা মসৃণ- এই নিয়ে আমরা তুলে ধরছি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীর ভাবনা। দুই পর্বের এই লেখায় এটি প্রথম পর্ব। এখানে থাকছে পাঁচ নারীর বক্তব্য।
মোহসেনা শাওন
১. মোহসেনা শাওন সিনিয়র নিউজ প্রেজেন্টার এনটিভি
নারী আসলে এখন অনেক এগিয়েছে বলা যায়। তবে কিছু জায়গায় তারা এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে এটাই বলবো। যেমন : গ্রামাঞ্চলে নারী পিছিয়ে রয়েছে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতে। স্বাস্থ্যগত বিষয়টি গ্রামাঞ্চল খুবই নাজুক। শহরেও দেখা যায় নিম্নবিত্ত নারীরা অবহেলিত স্বাস্থ্যজনিত ব্যাপারে। তারা রুটিনমাফিক ডাক্তারের কাছে যায় না। নারীশরীরবৃত্তিয় যেসব অসুখ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে তারা উদাসীন। যেমন : জরায়ুমুখের ক্যানসার, স্তন ক্যানসার, ঋতুস্রাব জনিত জটিলতা, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভাবস্থা ইত্যাদি। অবহেলা ও সচেতনার অভাবে এসব রোগ থেকে মৃত্যুও আমরা দেখি। সেই দিক থেকে নারী পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে, একটু উচ্চ বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ মেয়েদের যেভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়, নিম্নবিত্তরা কিন্তু সেভাবে আগায় না। একটা পরিবারে চারজন সন্তান থাকলে, সেখানে দুইজন মেয়ে ও দুইজন ছেলে থাকলে, তারা হয়তো চিন্তা করে ছেলেকে লেখাপড়া শেখাবে। তাদের পড়ালেখা শেখালে সংসারের হাল ধরবে। মেয়েদের ব্যপারে চিন্তা করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে দিয়ে বিদায় করে দেবে। মেয়েরা লেখাপড়া শিখে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতে পারবে না।
গ্রামাঞ্চলে নিম্নবিত্ত যারা রয়েছে একেবারেই খেটে খাওয়া মানুষ, তারা মেয়েদের দিয়ে বাইরে কাজ করাতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সেখানে মেয়েদের লেখাপড়ার বিষয়টা অনেক সময় ধার্তব্যের মধ্যেই আসে না।
সাইবার সিকিউরিটির দিক থেকে চিন্তা করলে মেয়েরা অনেক বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। আবার এখনো এই সময়ে এসে মেয়েরা ইভটিজিংয়ের শিকার হয়, যার কারণে অনেক ক্ষেত্রে তাদের পিছিয়ে পড়তে হয়; ঘর থেকে বের হতে পারে না। এইরকম কিছু ব্যাপার রয়েছে যেগুলোর জন্য মেয়েরা নিরাপদ নয়।
কর্মক্ষেত্রের কথা বললে সেখানেও নারীরা সেক্সচুয়াল হ্যারেজমেন্টের শিকার হচ্ছে, যে কারণে মেয়েদের দেখা যায় সেই চাকরিটা ছেড়ে দিচ্ছে। অন্য জায়গায় শিফট হচ্ছে বা কাজের ধরন পরিবর্তন করে ফেলছে। সেখানে তখন তো একটা নারী পিছিয়েই যায়।
নারীর এগিয়ে যেতে হলে যে জিনিসগুলো সবচেয়ে বেশি দরকার সেগুলো হলো- শিক্ষা, নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও চিকিৎসা। আমার যেটা মনে হয়, একটা মেয়ে শিক্ষিত হতে পারলে অনেক দূর এগিয়ে যায়। যখন একটা মেয়ে শিক্ষিত হতে পারে তখন তার পরিবারের হালটাও সমানভাবে ধরতে পারে, একটা ছেলের পাশাপাশি। পরিবারের স্বামী-স্ত্রী দুজনেই শিক্ষিত হলে এবং কর্মক্ষম হলে সংসারটা ভালো করে চালাতে পারে। এখন কিন্তু এই জিনিসটা অনেক বেড়েছে। প্রায় প্রতিটা ঘরে ঘরে দেখা যায় নারীরা কর্মক্ষম হচ্ছে। বাইরে কাজ করছে। শিক্ষিত নারী যারা রয়েছে, তারা সমাজে প্রভাব ফেলতে পারছে। একইভাবে রাজনীতি ও কর্মক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছেন।
তবে আমি মনে করি নারীকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে নারী ও পুরুষ উভয়কেই সমানভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে একজন নারীর যেমন ভূমিকা থাকে, তেমনি একজন পুরুষের ভূমিকা কোন অংশে কম নয়। একটি পরিবারে মেয়ে সন্তানকে এগিয়ে নিতে হলে তার বাবার ভূমিকা থাকতে হবে, ভাইয়ের ভূমিকা থাকতে হবে।
একজন বাবা বা ভাই তার কন্যা সন্তান বা বোনকে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে শিক্ষিত করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সাহায্য, সহযোগিতা ও স্বাধীনতা দিলে কাজটি সুন্দরভাবে মেয়েটি সম্পন্ন করতে পারে। সাহায্যটা কিন্তু প্রথমে পরিবার থেকেই হয়।
একই সঙ্গে একজন নারী কাজে গেলে পুরুষ সহকর্মীটিকেও তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে হবে। কাজের স্বাধীনতা দিতে হবে এবং কাজের মূল্যায়ন করতে হবে। অনেক পুরুষ সহকর্মী ভাবেন, নারীটি বোধহয় কাজটি নারী হওয়ার কারণে অন্যভাবেই বাগিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু সে যে যোগ্যতা দিয়েও কাজ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এটি তারা মানতে চায় না। যেই নারী যোগ্য, তার কাজে বাধার সৃষ্টি না করে তাদের সহযোগিতা করুন এবং তাদের প্রসংশা করুন।
একই সঙ্গে একজন নারীরও উচিত অন্য নারীর প্রতি সহমর্মী হওয়া। নারী যেন নারীর পাশে দাঁড়ায়। আমার কাছে মনে হয়, সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রাখতে নারী-পুুরুষ উভয়েরই একে অন্যকে সহযোগিতা করতে হবে। তাহলেই পরিবর্তন হবে গোটা সমাজের।
শিরিন আকতার
২. শিরিন আকতার নাট্য ও সংস্কৃতি কর্মী; সহ সাধারণ সম্পাদক উদীচি, গাইবান্ধা
আমি নারী ও পুরুষ উভয়কেই বলব জীবন যুদ্ধে বাঁচার লড়াইয়ে লড়াকু সকল নারীর প্রতি একটু শ্রদ্ধা আর সন্মান করতে শিখুন। তাদের প্রতি সহিংসতা থেকে বিরত থাকুন।
নারীর প্রাপ্য সন্মানটুকু দিতে সকলের মনটা প্রসারিত করুন। কারও ব্যক্তিগত জীবনকে আক্রমণ করে অসম্মান ও অবহেলার প্রবণতা থেকে সরে আসুন।
এখনো প্রান্তিক অঞ্চলে নারী ও শিশু ধর্ষিত হয়। এমনকি বৃদ্ধারাও বাদ যায় না। গণমাধ্যেম আমাদের যা দেখায় আমরা সেটুকুই দেখি। কিন্তু সবটা দেখতে পাই না। সবখানে পৌঁছাতে পারে না গণমাধ্যম। তাই আমি বলব, মেয়েদের শরীরকে মাংসপিণ্ড না ভেবে মানুষ ভাবুন সবাই। সেই বোধটা জাগ্রত হোক সকলের মধ্যে। নারী কারও সম্পত্তি না। সহজ সরল বোনেরা মায়েরা সচেতন নারী হয়ে উঠুন।
স্যালুট জানাই সেইসব অবহেলিত লাঞ্চিত মা বোনদের প্রতি যারা ঘুরে দাড়িয়ে বাঁচতে শিখেছে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে মেয়েরা ঘুরে দাঁড়াবেই। এমন দৃষ্টান্ত অনেক এ দেশে অনেক রয়েছে। তাই নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করুন।
একটা কথা সব নারীকে বারবার করে বলবো, ‘জাগো জাগো জাগো জাগো, কন্যা- মাতা- ভগ্নী।’ নিজের অধিকার বুঝে নিতে সচেতন হওয়া এবং লেখাপড়ার বিকল্প নেই। নিজের জন্য নিজেকে শক্তভাবে তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া নারীমুক্তির আর কোনো বিকল্প নেই।
ডা তাওহীদা রহমান ইরিন
৩. ডা. তাওহীদা রহমান ইরিন ডার্মটোলজিস্ট, রিজুভা ওয়েলনেস
অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেন নারীদের অর্জন তো প্রতিদিনই, তাহলে বিশেষ একটি দিন কেনো? আমি বলে রাখছি যে আমরা যারা নারী, আমাদের অগ্রগতি, সমাজে অবদান এবং সেটি পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে, কর্মক্ষেত্রে ও বৈশ্বিকভাবে- যাইহোক না কেনো এটার প্রশংসা আমরা রোজই করব। সেটা ঘর থেকেও হতে পারে, আমি যেখানে কাজ করছি সেখান থেকেও হতে পারে অথবা আমি যেখানে পড়ালেখা করছি সেখান থেকেও হতে পারে।
কিন্তু সেলিব্রেশন বা উদযাপনের জন্য একটা বিশেষ দিন বেছে নেওয়া হয় সেটা মার্চের মাসের আট তারিখ। একেকটা প্রতিষ্ঠান একেকভাবে সেলিব্রেট করে। প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য থাকে। যেমন, ইন্সপায়ারিং চেইঞ্জেস, মেক ইট হ্যাপেন, বি বোল্ড ফল চেইঞ্জেস, প্রেস ফর প্রোগ্রেস। থিম যাইহোক না কেনো নারীর জন্য একটি সুন্দর সুস্থ পৃথিবী প্রয়োজন, যেখানে নারী তাঁর সম্মান নিয়ে বাঁচবে, তাঁর অধিকার নিয়ে বাঁচবে; কথা সে বলতে পারবে স্বাধীনভাবে।
এই যে নারীকে সম্মান দেওয়া বা স্পেশাল অ্যাপ্রিসিয়েশনের জন্য প্রতিবছর এই দিনটা পালন করা হয়, এটার দরকার রয়েছে। শুধু নারীরাই নয় পুরুষরাও তাদের সমানভাবে সম্মান করে সাহায্য করে। নারী ও পুরুষ যৌথভাবে দলগত হয়ে কাজ করলেই সুন্দর একটা পৃথিবী তৈরি হবে।
শ্রাবণী জলি
৪. শ্রাবণী জলি উদ্যেক্তা, ট্রিভো
একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমি চাই আরো বেশি বেশি নারী এই কাজে এগিয়ে আসুক। নারীরা তো সংগ্রাম করছেই। এর মধ্যেই ছোটখাটো যে কাজটা সে পারে, যে গুণটা তাঁর রয়েছে সেটার মাধ্যমেই নিজেকে জানান দিক। নিজেকে মেলে ধরুক। বাইরে অন্তত পা রাখুক।
পুরুষ অনেক সময় ব্যাঙ্গ করে বলেন, ‘নারী দিবস! এই একটা দিনই তো তোমাদের, সেলিব্রেট করে নাও আমাদের কোনো দিবস লাগে না।’ আসলে একটা দিন আমাদের নয়। আমরা যেমন জন্মদিন উৎযাপন করি, সামনের দিনগুলো ভালো কাটে যেমন তেমন প্রত্যাশায় চলার পাথেয় সঞ্চার করে নারী দিবস। আমরা নিজেদের সংগ্রাম স্বপ্ন এগুলোকে আবার রিনিউ করতে পারে এমন একটা দিবস আমাদের সেই শক্তি সঞ্চার করে কোনো না কোনোভাবে অনুপ্রেরণা দেয়।
ডা. সানজিদা হোসাইন পাপিয়া
৫. ডা. সানজিদা হোসাইন পাপিয়া ডেনটিস্ট ও প্রোগরাম প্রেজেন্টার
বাংলাদেশের নারীরা এখনো শিক্ষার জায়গায় পিছিয়ে রয়েছে। এখনও অনেক নারী স্বশিক্ষায় বা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারছে না। আমার মনে হয় সে জায়গাটাতে একটু নজর দিতে হবে। আরেকটা জায়গায় নারীরা পিছিয়ে রয়েছে। সেটি হচ্ছে বোধের জায়গা। বোধ বলছি এ কারণে, অনেক শিক্ষিত নারী রয়েছে যারা এখনও তাদের অধিকার আদায়ের যে বিষয়টা কিংবা তাদের আত্মসম্মান রক্ষার যে বিষয়টা সেই জায়গাটা বুঝতে পারে না। এখনও অনেক শিক্ষিত নারীকে আমরা দেখি অসম্মানিত হচ্ছে তাঁর পরিবারে ভায়োলেন্সের শিকার হচ্ছে। তারপরও কিছু বলছে না, মুখ বুজে সহ্য করছে। আমি বলবো, এই জায়গাটিতে তারা পিছিয়ে রয়েছে। তারা নিজেদের অসহায় ভাবছে। তারা বুঝতে পারছে না যে কোথায় আসলে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এসব বিষয়ে আরো ভাবতে হবে বলে আমি মনে করি।
নারীকে শিক্ষিত হতে হবে। পাশাপাশি বোধের জায়গাটিও শাণিত করবে সে। তাহলে মানুষ হিসেবে নিজেকে আরো উন্নত করতে পারবে। আসলে নারীর ভেতরের আত্মবিশ্বাসকে সম্মান দিতে হবে। নারী নিজেকে সম্মান দিলে অন্যরা সম্মান দেবে। এইটুকুই মাথায় রাখা চাই।
নারী-পুরুষ সবার জন্যই একটা ছোট্ট বার্তা- নারী নিজের উন্নতির জন্য চেষ্টা করুন। আর পুরুষরা অবশ্যই তাদের পাশে থাকুন ৷ তাদের সহযোগিতা করতে না পারলেও, অন্তত বাধা দেবেন না। তারা যখন ভালো কাজ করবে, নিজেদের একটা ভালাে জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে, তখন আপনার পরিবার, আপনার সন্তান এবং আপনি নিজেও সবদিক থেকে সমৃদ্ধ হবেন।
অর্থনৈতিক বিষয়ে অন্যের ওপর নির্ভর করাতে সবসময় একটি আপত্তি ছিল পাপিয়া সুলতানা ঝিলিকের। চুয়াডাঙার এই মেয়ে চাইতেন নিজের পায়ের মাটি শক্ত করতে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে। আর তাঁর এই ইচ্ছায় সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে মা ও স্বামী। পাশাপাশি ছিল বিউটিফিকেশন প্রশিক্ষণকেন্দ্র উজ্জ্বলা।
২০২৩ সালের ২৭ মে থেকে ৬ জুন চুয়াডাঙায় বিউটিফিকেশন ও বিউটিপার্লার বিষয়ক ১০দিনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন হয় জয়িতা ফাউন্ডেশন ও উজ্জ্বলার যৌথ উদ্যোগে। এই কোর্সে অংশ নেন ঝিলিক। কোর্স শেষে বর্তমানে নিজেই একটি ছোট স্যালন দিয়েছেন; হয়ে উঠেছেন স্বাবলম্বী।
‘ছোট থেকে অন্যদের সাজাতে পছন্দ করতাম। ছোট-খাটো বিষয় নিয়ে অনেকেই আমার কাছে আসতো। তো এগুলো ছোটবেলা থেকে টুকটাক পারতাম। তখন আমার মা আমাকে তাঁর একজন পরিচিত মানুষের কাছে বিউটিফিকেশনের কাজ শিখতে দেন। শেখান থেকে কিছুটা ধারণা পাই। এরপর যখন জানতে পারলাম উজ্জ্বলা চুয়াডাঙায় কোর্স নিয়ে আসছে, তখন এক পায়ে রাজি হয়ে গেলাম,’ বলছিলেন ঝিলিক।
উজ্জ্বলার সহ প্রতিষ্ঠাতা আফরোজা পারভীনের সঙ্গে পাপিয়া সুলতানা ঝিলিক। ছবি : সংগৃহীত
উজ্জ্বলার সহ প্রতিষ্ঠাতা আফরোজা পারভীন ম্যাডামকে অনেক আগে থেকে ফলো করতাম। যেহেতু বিউটিফিকেশনের বিষয়ে আমার কোনো সার্টিফিকেট ছিল না। আর আফরোজা ম্যামকেও খুব ভালো লাগতো, তাই কোর্সটি দেখে খুব আগ্রহী হই, জানান ঝিলিক।
জয়িতা ও উজ্জ্বলা ফাউন্ডেশনের করা ১০ দিনব্যাপি এই বিউটিফিকেশনে ছিল মেকআপ, স্কিন কেয়ার, হেয়ার কেয়ার, হেয়ার কাট ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ। ঝিলিক বলেন, ‘আগে আমি স্কিন কেয়ার ও হেয়ার কেয়ারের বিষয়ে অত ভালোভাবে জানতাম না। তবে এই কোর্স করে বেশি ভালোভাবে বিষয়গুলো বুঝতে পারি। এখন আমি আমার ক্লাইন্টদের ওপর এগুলো প্রয়োগ করি। ক্লাইন্টরাও সন্তুষ্ট হয়।’
উজ্জ্বলার কোর্সে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন পাপিয়া সুলতানা ঝিলিক। ছবি : সংগৃহীত
বর্তমানের স্যালনটিকে ভবিষতে আরো বড় করতে চাই এবং আরো প্রশিক্ষণ নিতে চাই জানিয়ে ঝিলিক মন্তব্য করেন, ‘বিনামূল্যে হওয়া এই ধরনের প্রশিক্ষণগুলো নারীদের জন্য খুব উপকারী। এ ধরনের কোর্স প্রতিটি জেলায় জেলায় হয় বলে, তৃণমূল নারীর কাছেও পৌঁছে যায়। এই ধরনের কোর্সগুলো বেসিকে না থেকে অ্যাডভান্স পর্যায়ে হলে মেয়েরা আরো উপকৃত হবে।
আসলে প্রতিটি নারীর অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়াটা খুব জরুরি, যতই তার স্বামী বা বাবা স্বচ্ছল হােক না কেন- জানিয়ে ঝিলিক বলেন, ‘তা হলে যেকোনো কঠিন অবস্থায় মেয়েটি দাঁড় হয়ে থাকতে পারবে। আমি যেমন আজ একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হয়েছি, তেমনি ভবিষ্যতে আরো মেয়ে এই পেশায় আসুক এটাই এখন চাওয়া।’
বি : দ্র : বাংলাদেশের বিউটি অ্যান্ড গ্রুমিং ইন্ডাস্ট্রিতে উদ্যোক্তা তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে উজ্জ্বলা লিমিটেড। উজ্জ্বলায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং সংগ্রাম করে সাফল্য অর্জন করেছেন, এমন কয়েকজন নারী ও পুরুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে সাতকাহনের ধারাবাহিক পর্ব চলছে। এই পর্বটি ছিল ৯৪তম। উজ্জ্বলা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন :
নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে প্রতিবছর ৮ মার্চ পালন করা হয় নারী দিবস। এই দিবসকে কেন্দ্র করে নারীর এগিয়ে চলা, গ্রহণযোগ্যতা, সংগ্রাম ও সম্মানের স্বীকৃতির অনেক গল্প আমরা শুনি। মূল ধারার গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উঠে আসে তাদের নানা অবদানের কথা।
তবে কীভাবে এল নারী দিবস, কীভাবে উৎপত্তি হলো এই দিনের? এই দিনের প্রেক্ষাপট, গোড়াপত্তন কীসে? সেই ইতিহাস অনেকেরই অজানা। সেই গল্পটা জানতে হলে তাকাতে হবে শতাব্দিরও পেছনে।
দিনটা ছিল ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ। এই দিনে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের একটি পোশাক কারখানায় নারী শ্রমিকেরা ন্যায্য পারিশ্রমিক ও কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার দাবিতে বিক্ষোভ করেন। ন্যায্য দাবি নিয়ে হাজার হাজার নারী শ্রমিক সেদিন নেমে আসে রাস্তায়। দৈনিক আটঘণ্টা শ্রমের দাবি ও পুরুষের সমান সমান মজুরি ছিল এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। এই আন্দোলনে পুলিশ চালায় দমন, নিপীড়ন ও নির্যাতন ; অনেক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনা পুরো পশ্চিম বিশ্বে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। মূলত, এই আন্দোলনই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারী দিবস প্রতিষ্ঠার গোড়াপত্তন করে।
এরপর কেটে যায় অনেকটা সময়। ১৯০৮ সালে একই দিনে অসংখ্য শ্রমজীবী নারীরা নিজেদের অধিকারের দাবিতে সমতা বিধানের লক্ষ্যে আবারো বিক্ষোভে নামে। এভাবেই শুরু হয় অধিকারের লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা।
এর এক বছর পর ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে কোপেনহেগেনে আয়োজন করা হয় কর্মজীবী নারীদের এক আন্তর্জাতিক সমাবেশ। এই সমাবেশের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ক্লারা জেটকিন নামের একজন জার্মানি।
ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ। তিনি জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এই সমাবেশে বিশ্বের ১৭টি দেশ থেকে ১শ জন নারী প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন। এই সম্মেলনে ক্লারা ভোটাধিকারসহ নারী দিবসকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সম্মেলনে উপস্থিত ১শ জন নারী প্রতিনিধিদের সকলেই এই প্রস্তাবে সম্মতি দেয়।
পরের বছর ১৯১১ সালে অস্ট্রিয়া, জার্মানি, ডেনমার্ক ও সুইজারল্যান্ডে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রথম পালন করা হয়।
জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে নারী দিবসকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
১৯৯৬ সালে প্রথম নারী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। দিবসটির প্রথম প্রতিপাদ্য ছিলো ‘অতীতকে উৎযাপন এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা’ এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রয়োজনীয়তা অনুসারে প্রতিপাদ্য গৃহীত হয়ে আসছে।
৮ মার্চই কেনো আন্তর্জাতিক নারী দিবস ?
বিবিসির এক তথ্যমতে যখন ক্লারা জেটকিন আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ধারণাটি উত্থাপন করেন, তখন তিনি নির্দিষ্ট কোনো তারিখ উল্লেখ করেননি।
১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের আগ পর্যন্ত দিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট করা যায়নি বলেই উল্লেখ রয়েছে। একই বছর রাশিয়ার নারীরা ‘রুটি ও শান্তি’ র দাবিতে তৎকালীন রাশিয়ান সম্রাটের বিরুদ্ধে ধর্মঘট শুরু করে। রাশিয়ান সম্রাটকে বলা হয় জার। আন্দোলনের চার দিনের মাথায় ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল জার এবং তাঁর পরিবর্তে অস্থায়ী সরকার নারীদের আনুষ্ঠানিক ভোটাধিকার দিয়েছিলেন।
এ সময়ে রাশিয়ায় প্রচলিত জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, নারীদের ধর্মঘট শুরু হয়েছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি, রোববার। আর গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে এই দিনটি ছিল ৮ মার্চ। পরে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৮ মার্চকেই আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেভাব পালন করা হয় অন্তর্জাতিক নারী দিবস
রাশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশেই আন্তর্জাতিক নারী দিবস সরকারি ছুটির দিন। নারী দিবসকে কেন্দ্র করে তিন থেকে চারদিন দিন এসব দেশে ফুলের বিক্রি বেড়ে হয় প্রায় দ্বিগুণ।
ইতালিতে এই দিনে নারীদের শুভেচ্ছা জানানো হয় মিমোসা নামের ফুল দিয়ে। ফুলের শুভেচ্ছা জানানোর এ ঐতিহ্যের উৎপত্তি অস্পষ্ট। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এটি রোমে শুরু হয়েছিল বলে মনে করা হয়। এই দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ‘লা ফেস্তা দিল্লা দিয়ান্না’ নামে পরিচিত।
চিনের অনেক স্টেটে কাউন্সিলের বিবেচনায় ৮ মার্চ নারীদের অর্ধেক দিনের সরকারি ছুটি দেওয়া হয়। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানই এটি মানে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মার্চ মাসকে নারীর ইতিহাসের মাস বলে মনে করা হয়। প্রতিবছর আমেরিকান নারীর সম্মান ও কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি ঘোষণাপত্র জারি করেন এই দিনে।
নারী দিবসের রং কেন বেগুনি ?
বেগুনিকেই কেনো এই দিবসের রং হিসেবে নির্ধারণ করা হলো, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা রয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট আইডব্লিডি ডটকমের কাছে।
আইডব্লিউডি’র ব্যাখ্যা অনুসারে বেগুনি, সবুজ ও সাদা হল আন্তর্জাতিক নারী দিবসের রঙ। সাদা ও সবুজের সংমিশ্রণে তৈরী হয় বেগুনি। এটি ন্যায়বিচার ও সম্মানের প্রতীক। সবুজ আশার প্রতিনিধিত্ব করে আর বিশুদ্ধতার প্রতিনিধিত্ব করে সাদা।
ওয়েবসাইট অনুসারে, ১৯০৮ সালে যুক্তরাজ্যের ‘উইমেন্স সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইউনিয়ন (ডব্লিউএসপিইউ) এই রঙগুলোকেই নির্দিষ্ট করেছিলো। যদিও এই ধারণা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
২০১৮ সালে নারী দিবসের থিম কালার হিসেবে স্থান করে নেয় বেগুনি। আন্তার্জাতিক প্রতিষ্ঠান প্যান্টন বেগুনিকে নারী দিবসের রঙ হিসেবে ঘোষণা দেয়। বেগুনি রং দিয়ে বোঝানো হয় সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিকে। আর নারীরা হবে ইতিবাচক অর্থে ঠিক অতিবেগুনি রশ্মির মতোই শক্তিশালী, অপ্রতিরোধ্য।
শেষকথা, নারী দিবসের রং, দিন তারিখ নিয়ে নানা মতভেদ থাকলেও বিশ্ব জুড়ে উৎযাপিত হোক এই দিনটি। নারী অধিকারের গোড়াপত্তনের ইতিহাস হোক আফগানিস্তান, ইরান, ইউক্রেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক দেশের নারীদের সংগ্রামের পাথেয়। এসব দেশের নারীরা তাদের নিজ নিজ দেশে যুদ্ধ, সহিংসতা ও সরকারি নীতি পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করে গেছেন এবং এখনও করছেন।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, অপুষ্টি, দারিদ্র্য ও লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার সৃষ্টি হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলো নারী। এইসব ভুক্তভোগী নারীর অধিকার আদায়ে শক্তি হোক এই দিবস।
বাংলাদেশের বাল্যবিয়ে, নারী নির্যাতনসহ মানসিক শারীরিক যেকোনো নিপীড়নের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার সাহস হোক নারী দিবসের প্রেক্ষাপট।
তেহরানের ২২ বছরের তরুণী মাহসা আমিনিরা পোশাকের স্বাধীনতা পাক, বাকস্বাধীনতা হোক নারীর স্বতন্ত্র অধিকার। মৃত্যুর প্রতিবাদে একজন নারী আরেকজন নারীর পাশে দাঁড়াক। বিক্ষোভে মিছিলে পুরুষও পাশে দাঁড়াক- নারীর অধিকারের দাবি তুলুক। সুন্দর একটা পৃথিবী তখনই তৈরি হবে, যখন নিশ্চিত হবে সমতা বিধান। এই লক্ষ্যে এগিয়ে যাক নারী। সফল হোক পৃথিবী প্রতিটা জায়গার নারীর সংগ্রাম।
নারী-পুরুষের সমতা, নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে প্রতিবছর ৮ মার্চ পালন করা হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ২০১৮ সাল থেকে নারী দিবসের থিম রং হিসেবে স্থান নেয় বেগুনি। লিঙ্গসমতা অর্জনের ক্ষেত্রে এটি ঐতিহাসিকভাবেই কাজ করে আসছে।
এই রঙকে কেন্দ্র করে ৮ ই মার্চ বা পুরো মার্চ মাস জুড়ে নারীর পোশাকে বেগুনি রঙের প্রাধান্য দেখা যায়। বেগুনিই যেন নারীর চিন্তাশক্তির বার্তা হয়ে ধ্বণিত হয়। দিবসটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজগুলোতেও দেখা মেলে পোশাকের বৈচিত্র্য।
এবারও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ৮ মার্চকে কেন্দ্র করে দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলোও সেজে উঠেছে বিশেষ আয়োজনে। এসব ব্র্যান্ডগুলো নিজস্ব ডিজাইনে আলাদা আলাদা থিমে তৈরি করেছে বিশেষ বার্তাবাহক পোশাক।
দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড রঙ বালাদেশের মিডিয়া এক্সিকিউটিভ নজরে হোসাইন দিপ্ত জানান, নারী দিবসকে কেন্দ্র করে রঙ বাংলাদেশ- এর আয়োজনে থাকছে বৈচিত্র্যময় সব পোশাক। শাড়ি, কুর্তি, টপস, ব্লাউস ও মাস্ক যেগুলোতে রয়েছে বেগুনি রঙের আধিক্য। এই রঙের সঙ্গে সাদা ও নীলের মিশ্রণে থাকছে বিভিন্ন নকশা করা পোশাক।
ছবি : রঙ বাংলাদেশ
আমরা সবসময়ই পোশাকের দাম ক্রেতার ক্রয়সাধ্যের মধ্যে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু বর্তমান সময়ের ওপর নির্ভর করে এবারে পোশাকের দাম ১ হাজার ৫শ থেকে শুরু হচ্ছে জানিয়ে হোসাইন দিপ্ত বলেন, আমরা সবসময়ই বিশ্বাস করি সমাজের এগিয়ে যাওয়ায় পেছনে নারীর ভূমিকা অনেক। বর্তমানে নানা ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীও সমানতালে এগিয়ে চলছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা পুরুষকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এটি আনন্দের ও গর্বের।’
দেশীয় ফ্যাশন হাউজ ট্রিভো’র স্বত্ত্বাধিকার আঁখি ভদ্র বলেন, ‘এ বছর প্রায় ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে চলছে নারী দিবসের প্রস্তুতি। ট্রিভো’র ক্রেতারা আগে থেকেই নারী দিবসের জন্য বিশেষ শাড়ির জন্য আগ্রহ দেখিয়েছেন। সে আগ্রহ থেকেই শুরু করা হয় বেগুনি রঙের শাড়ি তৈরির কাজ। নিজস্ব ডিজাইনে সিল্ক, হাফসিল্ক ও সুতি কাপড়ের ওপর নকশা ছাড়াও মোমবাটিকের কাজ করা হয়েছে। সুতি শাড়িগুলোর দাম ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫শ টাকার মধ্যে। সিল্ক বাটিকগুলো ২ হাজার ২শ থেকে ৩ হাজারের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো পাওয়া যাবে ট্রিভোর শোরুমে। অনলাইন থেকেও চাইলে অর্ডার করা যাবে।’
পোশাকের রঙ-কে আদর্শ ধারণ করে এগিয়ে যাক নারী। একদিনের সাজ-পোশাক, উৎসব কিংবা দিবস উৎযাপন হয়ে উঠুক সারা বছরের চলার অনুপ্রেরণা।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ নারী গর্ভধারণ করে। সংখ্যাটা অনেক। তবে এই গর্ভটা কাঙ্ক্ষিত না কি অনাকাঙ্ক্ষিত- এমন প্রশ্ন করা হলে, প্রায় ৪৮ শতাংশ নারী বা ৩০ লাখের মধ্যে অর্ধেক নারীই বলবে, এটি সে চায় না।
এর অনেক কারণ হতে পারে। যেমন : কোলের সন্তান খুব ছোট, এর মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান নিতে অনাগ্রহী; মায়ের বয়স কম, তাই সন্তান নিতে চাইছে না; বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকার কারণে সন্তান নিতে অনাগ্রহী; অথবা একজন মায়ের হয়তো ৩৫ বছর হয়ে গিয়েছে, তাঁর পরের গর্ভটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তাই সন্তান চান না। এসব বিভিন্ন কারণে একজন মায়ের কাছে তাঁর গর্ভটা আকাঙ্ক্ষিত হতে পারে। তাই সংখ্যাটা খুবই বিপদজনক।
অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভাবস্থা কেন ঝুঁকিপূর্ণ?
আমি একটি জিনিসকে না চাইলে বা আমার পেটে যে গর্ভটি রয়েছে, সেটি না চাইলে, এর জটিলতা বা ঝুঁকিগুলো কী হতে পারে?
আমি এই গর্ভ চাইবো না, তাই গর্ভপাতের জন্য এগিয়ে যাবো। এমন একজন সেবাদানকারীকে চাইবো, যিনি গর্ভপাত করে দেবেন। আবার সবার হাতে এতো টাকা থাকে না যে চিকিৎসক বা নার্সের কাছে যাবেন। অথবা প্রশিক্ষিত কোনো মানুষের কাছে যাবেন। আরেকটি বিষয় হতে পারে, ব্যক্তিটি জানেই না, কার কাছে, কোথায় ও কখন যেতে হবে। এই জ্ঞানের অভাবের জন্য বিরাট জটিলতার সম্মুখিন হয়। তখন হয়তো সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়, এমন কারো কাছে যায়। অনেকে তো গাছ, পাতা, শিকড় ইত্যাদি দিয়ে অ্যাবোরশন বা গর্ভপাত করায়।
এতে কী হয়? গাছের ডগা জরায়ুতে ঢুকিয়ে দেওয়া হলে, দেখা যাচ্ছে, জায়গাটি ফুটো হয়ে যাচ্ছে। এতে ভীষণ ব্যথা হবে। এরপর ইনফেকশন ও সেপটিক হয়ে যাবে। এতে নারী মৃত্যু হয়ে যেতে পারে। বিষয়গুলো নিয়ে এ দেশে অনেক গবেষণা রয়েছে। এগুলো এখন অনেকটা কমে এলেও মাতৃমৃত্যুর গবেষণার সংখ্যা দেখলে, দেখা যাবে, সাত শতাংশ মৃত্যু এখনও গর্ভপাতের জটিলতার জন্য হয়।
প্রতিরোধ ও প্রতিকার
তবে বিষয়গুলোতে একটু সচেতন হলেই প্রতিরোধ করা যায়।
যেমন –
এসব বিষয়ে সচেতন হতে হবে এবং সঠিক তথ্য জানতে হবে।
জটিলতাগুলো বুঝতে হবে।
মাসিক নিয়ন্ত্রণ ওষুধ গ্রহণ করা যেতে পারে।
সঠিক সময়ে, সঠিক ব্যবস্থা নেওয়ার জ্ঞান থাকতে হবে। কী ধরনের সেবাদানকারীর কাছে গেলে সে সঠিক ব্যবস্থাপনা পাবে এবং সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পারবে সেটা জানা জরুরি।
১৯৬৫ সাল থেকে বাংলাদেশে পরিবার-পরিকল্পনা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে সাতটির বেশি এই পদ্ধতি চালু রয়েছে। আপনি পরিবার- পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য ক্লিনিক যেতে পারেন। কমিউনিটি লেভেল থেকে শুরু করে, থানা ও জেলা পর্যায় যেখানেই যান না কেন, সরকারি পর্যায়ে পরিবার -পরিকল্পনা ক্লিনিক পাবেন। এনজিওরা এই পদ্ধতি দিচ্ছে। সোস্যাল মার্কেটিং কোম্পানির মাধ্যমে যেকোনো ফার্মেসিতে বা দোকানেও এই পদ্ধতি পেতে পারেন।
খাওয়ার বড়ি ব্যবহার করতে পারেন। প্যাকেটের গায়ের মধ্যেই লেখা থাকে ব্যবহারবিধি।
সুতরাং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পরিবার- পরিকল্পনা পদ্ধতি জীবন বাঁচানো প্রযুক্তি। এটা ব্যবহার না করলে এই ধরনের গর্ভ হবে। এটি থেকে মুক্তি পেতে ভুল ব্যবস্থাপনার কাছে চলে যাবেন। এতে শারীরিক ক্ষতি, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই নারীস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিষয়টিতে সচেতন হওয়া খুবই জরুরি।
লেখক : রোকেয়া পদকে ভূষিত বিশিষ্ট নারী ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
করোনার সময়টা খুব কঠিন ছিল সাবিহা আফরিনের। সবিহার স্বামী গ্রাফিক্স ডিজাইনার। দুজনেই ঢাকায় থাকতেন। তবে সে সময় অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, স্বামীর কাজ কমে যায়। অর্থনৈতিক অবস্থাটা এতোই সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে যে চুয়াডাঙায় চলে যেতে হয়।
তখন থেকেই ভাবছিলেন, অর্থনৈতিক স্বচ্ছ্বলতা কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায় ? এই সময় অনলাইন ও অফলাইনের মাধ্যমে পোশাকের ব্যবসা শুরু করেন সাবিহা। বর্তমানে তার শো রুম জান্নাত-ই কালেকশন থেকে প্রায় ৫০ হাজার টাকার মতো আয় হয়। পাশাপাশি ২০২৩ সালে জয়িতা ফাউন্ডেশন ও উজ্জ্বলার যৌথ উদ্যোগে করা ১০দিনব্যাপী একটি বিউটিফিকেশন কোর্স অংশ নেন তিনি। শো রুমের পাশাপাশি স্কিন কেয়ার সেকশনও চালাচ্ছেন। এখান থেকেও ভালোই আয় হচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে এখন পরিবারকে সহযোগিতা তো করছেনই, হয়ে উঠেছেন সফল ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা।
“পোশাকের ব্যবসা শুরু করার সময় খুব কাছের আত্মীয়দের কাছ থেকে অনেক তীক্ত কথা শুনেছি। একজন আত্মীয় বলেছিলেন, ‘বাসায় বাসায় এখন কাপড় বেঁচতে আসছো?’ তখন আমি উত্তরে বলেছিলাম, ‘আমি একদিন শো রুম করবো এবং একদিন আপনি সেখানে আসবেন। তখন আমি আপনাকে সবচেয়ে সেরা পন্যটি দেবো।’ এখন তা-ই হয়েছে। তবে সে সময় বিষয়গুলো খুব আহত করেছিল। তখন আমার স্বামী মানসিকভাবে সহযোগিতা করে,” বলছিলেন সাবিহা আফরিন।
উজ্জ্বলা ও জয়িতা ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে করা এই কোর্সটির কথা আমি জেনেছিলাম ফেসবুকের মাধ্যমে। ২০২৩ সালে মে মাসের ২৭ তারিখ থেকে জুন মাসের ৬ তারিখ পর্যন্ত এই কোর্সটি হয়। বহুদিন ধরে ভাবছিলাম, একটি ব্যবসা তো রয়েছে, তবে এর পাশাপাশি কী করা যায়, যার স্থায়িত্ব থাকবে। এই ভাবনা থেকেই উজ্জ্বলার কোর্সটি করা। এটি করে অনেক উপকৃত হয়েছি।
“কোর্সটি শুরু করার সময় খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম, পারবো কি না, বা কতটুকু পারবো। সবকিছু আমার জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে কোর্স শেষে মনে হয়েছে নিজেকে নতুন করে জানতে পেরেছি। কোর্সের সময় উজ্জ্বলার সহ প্রতিষ্ঠাতা আফরোজা পারভীন ম্যামের কথাগুলো খুব ভালো লাগে। তিনি বলেছিলেন, ‘নিজেকে পরিবর্তন করতে পারলে, আশপাশের বদলও আশা করতে পারবে। প্রথমে তোমার নিজেকে বদলাতে হবে।’ তখন আমার মনে হয়েছিল আমি পারবো। কথাগুলো আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করেছিল”, বলেন সাবিহা।
ক্যাপশন : উজ্জ্বলার সহ প্রতিষ্ঠাতা আফরোজা পারভীনের সঙ্গে সাবিহা আফরিন। ছবি : সংগৃহীত
উজ্জ্বলা থেকে কোর্স করে বর্তমানে ত্বক পরিচর্যার ওপর কাজ করছেন সাবিহা। ‘এই ধরনের কোর্স করলে নারীরা ঘরে থেকে অনেক কাজ করতে পারে। সংসারের হাল ধরার পাশাপাশি আয় উপার্জনও হয়’, মন্তব্য করেন সাবিহা।
ভবিষ্যতে ইচ্ছে রয়েছে চুয়াডাঙায় আলাদা করে একটি স্কিন কেয়ার সেন্টার দেওয়ার জানিয়ে সাবিহা বলেন, ‘ আমি নারীদের জন্য কাজ করতে চাই। এ বিষয়ে আরো অভিজ্ঞ হয়ে অন্যান্য নারীদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে। আমরা অনেক সময় অন্যের কথা শুনে থেমে যাই। এটা করা যাবে না। নারীকে এগিয়ে যেতে হবে।’
বি : দ্র :বাংলাদেশের বিউটি অ্যান্ড গ্রুমিং ইন্ডাস্ট্রিতে উদ্যোক্তা তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে উজ্জ্বলা লিমিটেড। উজ্জ্বলায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং সংগ্রাম করে সাফল্য অর্জন করেছেন, এমন কয়েকজন নারী ও পুরুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে সাতকাহনের ধারাবাহিক পর্ব চলছে। এই পর্বটি ছিল ৯৩তম। উজ্জ্বলা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন :