শিশুকে এই পাঁচ কথা বলবেন না
সাতকাহন২৪.কম ডেস্ক
শিশুরা দয়া, সহানুভূতিশীলতা, ভালো ব্যবহার ইত্যাদি বড়দের কাছ থেকে শেখে। অপরদিকে অন্যের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার বিষয়ও বড়দের কাছ থেকেই পায়।
আপনি শিশুর সঙ্গে সদয় হলে, তার যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়বে, তেমনি মানুষ হিসেবে সে-ও অন্যের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করবে। তাই শিশুকে আত্মবিশ্বাসী ও সহানুভূতিশীল হিসেবে গড়ে তুলতে কিছু কথা না বলাই ভালো।
- শিশুকে কখনো বলতে যাবেন না, ‘তুমি এটা পারবে না।’ এর বদলে বলুন, ‘চেষ্টা করো, আমার বিশ্বাস তুমি পারবে’।
- ‘তাড়াতাড়ি কর, তুমি খুব অলস’- এই ধরনের কথা শিশুকে বলতে যাবেন না। এর বদলে বলুন, ‘ তুমি তোমার সময় নও। আমরা কাজটি একসঙ্গে করবো’।
- ‘তুমি খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছো’- এই ধরনের কথা তাকে বলবেন না। পরিবর্তে বলুন, ‘আমি তোমার আচরণটা এই মুহূর্তে পছন্দ করলাম না। আমরা এটা নিয়ে পড়ে কথা বলবো।’
- তাকে বলবেন না, ‘কান্না করা বন্ধ করো। এমন কিছু হয়নি যে কান্না করছো।’ বলুন, ‘আমি বুঝতে পারছি তোমার মন খারাপ হয়েছে। বল কীভাবে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি?’
- বলবেন না, ‘তুমি ঘরের জিনিস গুছাতে যেও না। নষ্ট করে ফেলবে।’ বলুন, ‘চলো আমরা একসঙ্গে ঘর গুছাই।’
সূত্র : ঋদ্ধি দেওরা ( প্যারেন্টিং কোচ) ইন্সটাগ্রাম।
শিশুকে নিয়ে দেখতে পারেন এই ৫ চলচ্চিত্র
সাতকাহন২৪.কম ডেস্ক
একটি ভালো গল্প, চলচ্চিত্র মানুষের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গীকে ইতিবাচকভাবে বদলে দিতে পারে। একটি ভালো চলচ্চিত্র একটি শিশুর মেধার বিকাশেও সাহায্য করে। আর বাড়ির সবাই বসে সিনেমা দেখা হলে একসঙ্গে নিজেদের সময়টাও উপভোগ করা যায়।
বাড়িতে শিশু থাকলে এবং তারা কিছুটা বুঝবে- এমন বয়সে পৌঁছুলে তাদের নিয়ে একত্রে দেখতে পারেন এই পাঁচ চলচ্চিত্র।
ফাইন্ডিং নিমো (২০০৩)
এখানে দেখানো হয়েছে মারলিন নামের একটি ছোট মাছকে, যে সমুদ্রের মধ্যে তার সন্তানকে খোঁজার চেষ্টা করে।
টয় স্টোরি (১৯৯৫)
এই গল্পটি তৈরি হয়েছে খেলনা বা টয় নিয়ে। খেলনাগুলো তখনই জীবন পায় যখন তার মালিক বাড়িতে থাকে না। তারা আনন্দ করে এবং কঠিন সময় কাটায়।
মোয়ানা (২০১৬)
এই অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রটি একজন সাহসী মেয়ে মোয়ানাকে নিয়ে তৈরি। মোয়ানা তার দ্বীপকে বাঁচানোর জন্য সমুদ্রের মধ্যে এক দুঃসাহসিক যাত্রা শুরু করে।
প্যাডিংটন (২০২৪)
গল্পটি তৈরি করা হয়েছে একটি ভালুকের জীবনকে ঘিরে। সে লন্ডনে তার নতুন বাড়ি পায় এবং হাসি ও সুন্দর মুহূর্ত তৈরি করতে চায়।
দ্যা লায়ন কিং (১৯৯৪)
এটি একটি অসাধারণ ডিজনি ক্লাসিক চলচ্চিত্র। এখানে গল্পের মূল চরিত্র সিম্বার জীবনের অভিজ্ঞতা, সাহস ও নেত্রীত্বের গুণ দেখানো হয়েছে।
সূত্র : রিদ্ধি দেওরা (প্যারিনিং কোচ) ইন্সটাগ্রাম।
ব্যস্ত দিনেও সুস্থ থাকার ছয় উপায়
সাতকাহন২৪.কম ডেস্ক
কাজের ব্যস্ততার কারণে দেহের যত্নে অবহেলা করে ফেলেন অনেকেই। আর এই অবহেলার নেতিবাচক প্রভাব একটা সময় দেহের ওপর মারাত্মকভাবে পড়ে। তখন হয়তো বিছানা থেকে উঠার আর কোনো শক্তিই অবশিষ্ট থাকে না।
তাই কাজের ব্যস্ততার ভেতরেও শরীরের যত্ন নেওয়া জরুরি। ভীষণ কাজের চাপের সময়েও দেহের যত্ন নেওয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ জানিয়েছে জীবনধারাবিষয়ক ওয়েবসাইট ওইকিহাউ।
স্বাস্থ্যকর খাবার খান
ব্যস্ত রয়েছেন বলে অনলাইনে পিৎজা বা বার্গার অর্ডার করে খেয়ে ফেললেন, তা কিন্তু চলবে না। এসব ফাস্টফুড জাতীয় খাবারের পরিবর্তে ঘরে খুব সহজে তৈরি করা যায়, এমন কিছু খান।
প্রয়োজনে বাজার থেকে রেডিমেড রুটি আনিয়ে রাখুন, যেন কেবল ভেজে নিলেই খাওয়া যায়। এ ছাড়া বাজার থেকে কাটা সবজি বা মাংসও আনিয়ে রাখতে পারেন। যেন কাটাকাটির ঝামেলা ছাড়াই সহজে রান্না করা যায়। আর রান্নার সময় খাবারটি খুব তেল-মশলা দিয়ে ভুনতে না গিয়ে, একটু সিদ্ধ করে খান। এতেও সময় বাঁচবে। এ ছাড়া খুব ব্যস্ততার সময় লো ফ্যাট বিস্কুট, বাদাম ও ফল ইত্যাদি স্বাস্থ্যকর খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন।
পরের দিন অফিসে কী খাবেন ঠিক করুন
অফিসে যাওয়ার আগে সকালবেলা তাড়াহুড়া করে খাবার তৈরি করতে না গিয়ে আগের দিন রাতেই ঠিক করে রাখুন কী খাবেন। এ ক্ষেত্রে প্রোটিন সালাদ তৈরি করতে পারেন। এখানে মাংস ও সবজি দুটোই একসঙ্গে থাকে, আর দেহ শক্তিও পায়।
সকালের খাবার বাদ দেবেন না
ব্যস্ত থাকলে তাড়াহুড়ায় অনেকেই সকালের খাবার বাদ দেয়। এটি একদমই করা যাবে না। সকালের নাস্তা আমাদের সারাদিনের কাজ করার শক্তি দেয়। এটি বাদ দিলে ক্লান্ত, অলস ও বিরক্ত লাগবে। এতে কাজের গুণগত মান কমবে। তাই সকালে নাস্তা অবশ্যই করুন।
পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করুন
অতিরিক্ত ক্যাফেইন (চা ও কফি) ও মিষ্টিজাতীয় খাবার দেহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর বদলে স্বাস্থ্যকর তরল জাতীয় খাবার খান। পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করুন। চিনিহীন ফলের রস খেতে পারেন।
ব্যায়ামের জন্য সময় বের করুন
যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন ব্যায়ামের জন্য অন্তত ৩০ মিনিট সময় রাখুন। প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ব্যায়াম করুন। সেটাও করতে না পারলে গান শুনতে শুনতে অন্তত ১৫ মিনিট নাচুন। এতেও দেহ সক্রিয় থাকবে।
মানসিক চাপ কমান
অতিরিক্ত ব্যস্ততা উদ্বেগ, অবসাদ ও বিরক্তি ইত্যাদি মানসিক চাপ তৈরি করে। তবে এসবের মাঝেও জীবনের লক্ষ্যগুলো তো পূরণ করতেই হবে। হাল ছেড়ে বসে থাকলে তো চলবে না। তাই মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা শিখুন।
এ ক্ষেত্রে নেতিবাচক বিষয়ে মনোযোগ না দিয়ে ইতিবাচক চিন্তা করুন। নেতিবাচক ভাবনা আসবেই। তবে একে সরিয়ে ইতিবাচক ভাবনায় মনোনিবেশ করাটা জরুরি। পাশাপাশি ধ্যান, আধ্যাত্মিক কাজে সক্রিয় থাকাও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে। এ ছাড়া একটু সময় পেলে বেড়াতে যাওয়া, ছবি দেখা, ভালো সঙ্গীত শোনা ইত্যাদিও মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেবে।
যে ৬ লক্ষণে বুঝবেন বন্ধু গোপনে আপনার শত্রু
সাতকাহন২৪.কম ডেস্ক
বন্ধু মানে তো সেই যাকে নির্দ্বিধায় সব মনের কথা খুলে বলা যায়। হাসি-কান্না সবটাতেই যে পাশে থাকবে ছায়ার মতো। তাই নয় কি ?
তবে সেই মানুষটিই আস্তিনের সাপ হলে, কষ্টটা একটু বেশিই পেতে হয়। তাই বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হওয়া জরুরি। আপনি যার সঙ্গে মিশছেন, সে আসলেই আপনার প্রকৃত বন্ধু, কি না তা বুঝতে পারবেন এই ছয়টি লক্ষণে। চলুন জানি-
- সে সবসময়ই আপনার সমালোচনা করে। কিন্তু কথাটা এমনভাবে বলে যেন মনে হয় আপনার খুব উপকার করে
দিচ্ছে। - বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা বা বেড়াতে যাওয়ার পর কি আপনার বিরক্ত লাগতে শুরু করে বা মেজাজ খারাপ হতে শুরু করে? বিষয়টি এমন হলে বন্ধু নির্বাচনে সাবধান।
- আপনার ভালো কিছু অর্জনকে সে উদযাপন করে না, এমনকি কেউ আপনার প্রশংসা করে দুটো কথা বললেও বেশিক্ষণ তার ভালো লাগে না, এমন হলে সে প্রকৃত বন্ধু নয়।
- অন্যের প্রতি দোষারপ ও অভিযোগ করা, অন্যের খুঁত ধরা তার রোজকার অভ্যাস। একটু চিন্তা করে দেখুন, আপনি কতবার এটির শিকার হয়েছেন? তাহলে বুঝে যাবেন, সে আপনার কতটা ভালো বন্ধু।
- আপনার কঠিন সময়ে সে কতবার পাশে ছিলো? তারও একটি তালিকা করে ফেলুন। বুঝবেন যেই ভালোবাসা ও উদারতা আপনি তাকে দেখাচ্ছেন, সেটি আসলেই কি পাওয়ার যোগ্য সে!
- আপনার বন্ধু কি সবসময় জীবনকে একটা প্রতিযোগিতা হিসেবে চিন্তা করে এবং আপনার সঙ্গে তার তুলনা করতে থাকে বা অন্য কারো সঙ্গেও তার নিজের তুলনা করতে থাকে ? এমন হলে একটু থামুন। সাধারণত ঈর্ষাপরায়ণ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মানুষই এমন হয়। এদের কাছ থেকে সতর্ক হন। এরা বন্ধুর খোলসে শত্রু।
সময় সঠিকভাবে ব্যবহারের ১৯ কৌশল
সাতকাহন২৪.কম ডেস্ক
প্রবাদ রয়েছে, সময় ও নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। ঠিক তাই। সময়ের কাজ সময়ে করলেই জীবনের লক্ষ্যগুলো পূরণ হয়, আর বড় কিছু অর্জন করা যায়।
তাই একে সঠিকভাবে ব্যবহারের কৌশল শেখা জরুরি। সময় ব্যবস্থাপনার কিছু প্রয়োজনীয় কৌশল জানিয়েছে ক্যারিয়ারবিষয়ক ওয়েবসাইট আপওয়ার্ক।
- দিনকে কীভাবে কাজে লাগাবেন, সেই পরিকল্পনা করুন।
- একদিনে আপনি কী কী কাজ শেষ করতে চান সেগুলো লিখে ফেলুন।
- জীবনের লক্ষ্যগুলো একটি কাগজে লিখুন।
- ৮০/২০ রুল অনুসরণ করুন। ২০ শতাংশ কাজ করবেন, তবে এর ফলাফল আসবে ৮০ শতাংশ, এভাবে পরিকল্পনা করুন।
- একসঙ্গে অনেক কাজ করতে যাবেন না। এতে কাজের গতি নষ্ট হয়।
- একবারে একটি কাজই করুন।
- আপনার মনোযোগ নষ্ট করে এমন বিষয়গুলোকে কাজের জায়গা থেকে সরিয়ে দিন।
- ক্লান্ত লাগলে, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নিন।
- ‘না’ বলতে শিখুন। সব কাজের জন্যই ‘হ্যাঁ’ বলতে যাবেন না। হাতে সময় কম থাকলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘না’ বলুন।
- কম প্রয়োজনীয় কাজগুলো পরে করুন।
- সঠিক সময় আসবে, এই ভাবনায় বসে না থেকে কাজ শুরু করে দিন।
- যেই কাজটি করতে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত লাগে, সেটাই আগে করুন।
- ডেডলাইন সেট করুন, অর্থাৎ কাজটি কখন বা কবে শেষ করবেন সেই জন্য সময় নির্ধারণ করুন। ডেডলাইন ছাড়া কাজ ধীর গতির হয়ে পড়বে, শেষ করতেও দেরি হবে।
- সেসব দিকে খেয়াল করা বন্ধ করুন, যেগুলো আপনার লক্ষ্যকে অর্জন করতে বাধা দেয়।
- প্রয়োজন না হলে বেশি নিঁখুতভাবে কাজ করার দরকার নেই।
- অপ্রয়োজনীয় মিটিংগুলো বন্ধ করুন।
- প্রয়োজনীয় মেইলগুলো চেক করার জন্য সময় রাখুন।
- নেতিবাচক মানুষজনকে যেকোনো উপায়ে এড়িয়ে চলুন।
- সেটাই করুন, যেটি আপনি ভালোবাসেন।
কিশোরী নির্যাতন কেন হচ্ছে, প্রতিরোধ কেন জরুরি ?
ডা. হালিদা হানুম আখতার
আজ নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে কথা বলতে চাই। ২০২২ সালে দৈনিক প্রথম আলোতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এখানে বলা হয়, নারীর জন্য নিরাপদ কোনো স্থান নেই। ঘরে-বাহিরে নির্বিশেষে কন্যা শিশুর প্রতি সহিংসতা ও যৌন নিপীড়ন বেড়েই যাচ্ছে।
কেবল মে মাসেই ধর্ষনের শিকার হয়েছে ৮৪টি। এর মধ্যে চারজন কিশোরীসহ ১০জন প্রতিবন্ধী। দলবদ্ধ ধর্ষনের শিকার হয়েছে একজন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও দুইজন নারী।
তাই বলা যায়, নারীর প্রতি সহিংসতা কিন্তু বেড়েই চলেছে। কমেনি। কমার কোনো পরিসংখ্যান পাইনি। তাহলে নারী কোথায় নিরাপদ এটা আমাদের চিন্তা করতে হবে এবং কোথায় সে নির্যাতনের শিকার বেশি হচ্ছে, সেটি জানতে হবে।
আর এই বিষয়ে নারীকে দোষ দিলে হবে না। নির্যাতনের শিকার যে হয়, সে তো দোষী নয়। তাকে নির্যাতন যে করে তার সমস্যা রয়েছে। অনেক সময় নারী কোথাও গেলে, রাস্তায় গেলে, বাসে চড়লে, স্কুলে যাওয়ার পথে ধর্ষনের শিকার হয়। তাহলে সে যাবে কোথায় ? আর আমাদের মতো উন্নতিকামী বাংলাদেশে নারী কেন ঝুঁকিতে থাকবে ? নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকবে ? এই প্রশ্নগুলো কি আমরা নিজেরা নিজেদের করতে পারি ? আমার মনে হয়, আজ সময় এসেছে এসব প্রশ্ন বার বার করার।
একজন কিশোরীর কথা চিন্তা করি। কিশোরীকে তো স্কুলে যেতে হবে। আবার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অনেক কিশোরী চাকরি বা কাজ করছে। বাড়িতে কাজ করছে। বাড়িতে একজন কিশোরী কাজ করলে তার ওপর সহিংসতার পরিমাণ চিন্তার বাহিরে। এসব নিয়ে অনেক পরিসংখ্যান রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্স ২০১১ ও ২০১৫ সালে সমীক্ষা করেছে। ২০১৫- এর সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, প্রায় ৪৩ শতাংশ কিশোরী, যারা বিবাহিত, তারা স্বামীর মাধ্যমে সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এই সহিংসতার ধরন মারপিট হতে পারে, আর্থিক হতে পারে, যৌন নির্যাতন হতে পারে। তাহলে দেখা যাচ্ছ, দুই জনের মধ্যে একজন বিবাহিত কিশোরী, তার জীবদ্দশায় সহিংসতার শিকার হয়। তাহলে, সেই নারী কোথায় যাবে? বা কোথায় রয়েছে ? চিন্তা করুন।
আর যারা বিবাহিত নয়, তারা যখন বাহিরে যাচ্ছে, তারা সহিংসতার শিকার হচ্ছে। তারা পথের মধ্যে ধর্ষনের শিকার হয়। একজন দিয়ে নয়, দলবদ্ধ ধর্ষনের শিকার হতে দেখা যাচ্ছে। অনেক সময় ধর্ষিতা নারীকে মেরে ফেলা হচ্ছে। মেরে তাকে, জমিতে বা পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। মেয়েটি যে একজন মানুষ সেটাই যেন আমরা ভুলে যাই। একজন নারী বা কিশোরী যে একজন মানুষ আমরা কেমন করে ভুলে যাই? নিজেদের প্রশ্ন করতে শিখতে হবে। তাই, এমন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সামাজিক পরিবর্তন দরকার। আমাদের নৈতিক চরিত্রের পরিবর্তন করতে হবে।
আবার একজন ধর্ষককে হয়তো আইনগতভাবে ধরা হল। আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি। তবে তার শাস্তিটা কী হচ্ছে, সেটি কিন্তু জানতে পারছি না। শাস্তি না দেখানো হলে কিন্তু এসব অপরাধ কমবে না।
বাহিরের দেশগুলোতে দেখবেন, আপনি খুব দ্রুত গতিতে গাড়ি চালালে সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে ম্যাসেজ চলে আসে ‘ তুমি স্পিডে গাড়ি চালিয়েছো, তোমার ফাইন হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই টাকা না দিলে ড্রাইভিং লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা যাবে।’ এটি হল শাস্তি।
এখন একজন মানুষ আরেকজনকে মেরে ফেললে তার কী শাস্তি হচ্ছে, আমরা কিন্তু জানতে পারি না। ধরা পড়া বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, এই পর্যন্ত জানি। তবে তার শাস্তিটি জনসম্মুখে না দিতে পারলে অপরাধ বন্ধ হবে না।
আমাদের এই নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। সবার দায়িত্ব এটি বন্ধ করা। কোনো অবস্থাতেই একজন নারীকে আমরা নির্যাতনের শিকার দেখতে চাই না।
তবে, এটিতো গেলে মারামারি-কাটাকাটি ধরনের সহিংসতা। এবার আরেকটি দিকও বলতে চাই। আরেকটি বিষয় হল, একজন নারীকে আমরা ১৮ বছরের আগে বিয়ে দিয়ে দিই। এটি একটি নির্যাতন। ১৮ বছরের আগে তাকে গর্ভধারণে বাধ্য করা হচ্ছে, এটি আরেক ধরনের নির্যাতন। গর্ভধারণের পর চারবার অ্যান্টিনেটাল কেয়ারে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, সেটি দেওয়া হচ্ছে না। তার বাড়িতে থাকা যে অভিভাবক, সে হয়তো বলছে ‘আমাদের তো এভাবেই ১৪টা বাচ্চা হয়েছে, আমাদের তো হাসপাতালে যেতে হয় নাই। তোমাকে প্রথম বাচ্চাতেই এতো হাসপাতালে যেতে হবে কেন?’ এটি বন্ধ করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গর্ভাবস্থায় অন্তত পক্ষে চারবার চিকিৎসক দেখিয়ে চেকআপ বা অ্যান্টিনেটাল কেয়ার জরুরি। না হলে মেয়েটির মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়বে। আরেকটি বিষয় হল, মেয়েটির প্রসব বাড়িতে করা যাবে না। তার প্রসব একটি ক্লিনিক্যাল জায়গাতে করাতে হবে, যেখানে চিকিৎসক ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি রয়েছেন। না হলে একেও নির্যাতন বলতে হবে।
সুতরাং, বাড়িতে যে অভিভাক রয়েছে (স্বামী, শাশুড়ি বা অন্যান্য) তাদের সবার দায়িত্ব হবে মেয়েটিকে সেবাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া।
সন্তান প্রসবের সময় কিশোরীর করুণ মৃত্যুর অনেক ঘটনা রয়েছে। এগুলো গল্প নয়। বাস্তব ঘটনা। মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়নি। বাড়িতে দাই দিয়ে প্রসব করানো হয়েছে। তবে ফুল পড়েনি। ফুল বের করতে নাড়ি ধরে টান দেওয়া হয়েছে। এতে রক্তপাত হয়ে মা মারা গেছে। আবার হয়তো খাঁমচি দিয়ে ফুল বের করা হল, কিছুক্ষণ পর মেয়েটি মারা গেলো। এসব হল নির্যাতন। এগুলো থেকে নারীকে বাঁচাতে হবে।
এসবের দায়িত্ব কিন্তু মেয়েটির পরিবারের। কারণ, সে তো একজন বাচ্চা মেয়ে। পরিবার তাকে ছোটবেলায় বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। তাকে সন্তান হওয়ার জন্য বাধ্য করছে। আবার চিকিৎসকের কাছেও নিয়ে যাচ্ছে না। তার পেছনে টাকা খরচ করতে চাইছে না। এগুলো সব নির্যাতনের সংজ্ঞায় পড়ে।
তাই সবার প্রতি ভীষণভাবে নিবেদন থাকবে, কিশোরীর যে প্রজনন স্বাস্থ্যের অধিকার, সেটি তাকে দিতে হবে। তার লেখাপড়া, ভালো খাবার খাওয়া, সেবা পাওয়ার অধিকার তাকে দেওয়া প্রয়োজন। না হলে আমরা অপরাধ করবো। নির্যাতনের পর্যায়ে আমাদের কাজটি পড়ে যাবে। তখন নির্যাতনের জন্য কোনো শাস্তি থাকলে, সেটি আমাদেরও হওয়া প্রয়োজন।
লেখক : রোকেয়া পদকে ভূষিত বিশিষ্ট নারী ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
বাল্যবিবাহের কুফল কী?
ডা. হালিদা হানুম আখতার
বাল্যবিবাহ একটি গুরুতর সমস্যা। একে ইংরেজিতে চাইল্ড ব্রাইড বলা হয়। চাইল্ড মানে শিশু, আর ব্রাইড মানে বধূ। এর মানে একটি শিশুকে আমরা বধূ বানিয়ে ফেলছি। সে অন্য আরেকজন পুরুষের স্ত্রী হয়ে যাচ্ছে।
একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পরিপূর্ণ যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে আমরা কি বিষয়টির জটিলতা সম্পর্কে কখনো গভীরভাবে চিন্তা করি ?
বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে এমন একটি দেশ, যেখানে সর্বোচ্চ শিশু বিবাহ রয়েছে। যদিও আগের তুলনায় বাল্যবিবাহের পরিমাণ কমেছে। আগে ছিল ৬০ শতাংশ, এখন ৫০। আবার যত কিশোরী রয়েছে, তাদের মধ্যে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ৫২ শতাংশের। এর মানে, এদের বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছরের আগে; সে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার আগেই। নিশ্চয়ই জানা রয়েছে, ইউনিসেফের সংজ্ঞা অনুসারে, ১৮ বছর বয়সের আগে যে কেউই শিশু।
কেন শিশু বলা হচ্ছে ? ঐ বয়স আসা পর্যন্ত মেয়েটির শরীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার জন্য শরীরের যে পরিপূর্ণতা দরকার সেটি হয়। সেই সময় তাকে চাপ দিয়ে দিলে হীতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। কেমন সেটি ? স্বামীর সঙ্গে চলাফেলার চাপ, একটি বড় পরিবেশে যাওয়ার চাপ, এর মধ্যে কেউ গর্ভধারণ করলে, সেটির চাপ ইত্যাদি মেয়েটির ওপর প্রভাব ফেলছে। এগুলো বড় বোঝা।
গর্ভের বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে শুনতে ভালো লাগলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে দেখলে, একজন কিশোরী, যার শরীরে এখনো পূর্ণতা আসেনি, তার জরায়ুর মধ্যে একটি বড় বাচ্চা দিয়ে দিলে সম্পূর্ণ শারীর-মনের ওপর একটি বাড়তি ওজন তৈরি হয়। এই ওজন তার সার্কুলেটরি, হরমোনাল ও ইউট্রাসের সিস্টেমের (প্রক্রিয়ার) ওপর বিরাট প্রভাব ফেলে। সে কিন্তু এখনো বড় হয়নি। তার পেলভিস ১৮ বছরের পরেও ২১ বছর পর্যন্ত বড় হতে থাকে।
সুতরাং একটি ছোট পেলভিসের মধ্যে একটি বড় বাচ্চা ঢুকিয়ে দিলে মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বাধাগ্রস্ত প্রসব হতে পারে। পেলভিসের মুখ বড় না হওয়ার কারণে শিশু বের হতে অসুবিধায় পড়বে। শিশুর মাথার হাড় ও মায়ের পেলভিসের হাড় একত্রে চাপ দিলে এবং বেশিক্ষণ সেভাবে থাকলে, রক্ত চলাচল করতে না পেরে জায়গাটি মরে যাবে। এতে মায়ের রেকটোভেজাইনাল ফিসচুলা বা ভাসিকোভাজিনাল ফিসচুলা হতে পারে। এতে মায়ের গা থেকে পায়খানা বা প্রস্রাবের গন্ধ বের হতে থাকবে।
এখন চিন্তা করুন, ১৮-এর কম বছর বয়সী একজন মেয়ে কোলের মধ্যে বাচ্চা, আর তার গা দিয়ে প্রস্রাব বা পায়খানার গন্ধ বের হচ্ছে, তাকে কে ঘরে রাখবে? স্বামী ? রাখবে না। তাকে দুইদিন পরে বলবে, ‘বাপের বাড়ি চলে যাও’। তাই বিষয়টি বেশ শঙ্কার।
মা-বাবারা চিন্তা করে না, এই কম বয়সী মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে আমরা কোথায় পাঠাচ্ছি ? এমন জায়গায় পাঠানো হয়, যেখানে হয়তো মেয়েটির গোয়াল ঘরেও জায়গা হয় না। বাপের বাড়ি গিয়ে অসহায়ের মতো ঘুরে বেড়াতে হয়। হয়তো দেখবেন রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেখানেও মানুষ গন্ধের কারণে থাকতে দেয় না। তাহলে কোথায় যাবে এই মেয়েটি?
আমরা কি ১৮ বছরের আগে বিয়ে দিয়ে দেওয়া এই মেয়েটির করুণ জীবনের জন্য নিজেদের দায়ী মনে করি ? আমরা কি ভাবি আমাদের কী শাস্তি হতে পারে এর জন্য? আজ মিষ্টি কথা বলার দিন নয়। আমি এই সচেতনতাটা সবার মধ্যে তুলতে চাই, আমরা ১৮ বছরের আগে মেয়ে বিয়ে দেবো না।
আমাদের একটি স্লোগান রয়েছে, ‘১৮ বছরের আগে বিয়ে নয়, ২০ বছরের আগে সন্তান নয়।’ আর দুই সন্তান নেওয়ার আগে ব্যবধান হতে হবে অন্তত তিন বছর। না হলে, মা বা শিশু মারা যেতে পারে। অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভাবস্থা হবে। তখন গর্ভপাত করাতে হতে পারে।
আমরা এতক্ষণ বললাম বিবাহিত কিশোরীর কথা। তবে আমাদের তো আরো কিশোরী রয়েছে। অবিবাহিতদের মধ্যে কখনো গর্ভধারণ হয়ে গেলে, সেখানে কী? আমরা যারা সেবা দিয়ে থাকি, স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলি, তারা জটিলতাগুলো বেশি জানি। আমাদের অনেক রোগী দেখার অভিজ্ঞতা হয়। আর একজন মা-বাবা হয়তো একটি সন্তান দেখে। তাই তুলনাটা করতে পারে না।
সুতরাং আজকের বক্তব্য হবে, দয়া করে আপনারা ১৮ বছর বয়সের আগে মেয়ের বিয়ে দেবেন না।
আরেকটি বিষয় হল, ১৮ বছর বয়সের আগে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিলে গর্ভধারণ হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমন হলে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনা হয়। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেলো। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে মেয়েটির জীবনে যে অগ্রগতি ও ক্ষমতায়ন, সেটি বাধাগ্রস্ত হওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া।
এসব বিষয় আমরা আগাম চিন্তা না করে, শিশুটির কথা না ভেবে স্বার্থপরের মতো কেবল নিজেরটাই ভেবে বিয়ে দিই। আমি মনে করি, এটি বিরাট বড় অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি হওয়া উচিত।
তাই মা-বাবা, সমাজ ও পরিবারের কাছে, আমার বিনীত অনুরোধ থাকবে, যারা শিশুটির দায়িত্বে রয়েছেন, তারা দয়া করে অভিভাবক বা গার্জিয়ান হন। গেট কিপার বা দারোয়ান হবেন না। অভিভাবক হয়ে মেয়েটিকে সহযোগিতা করুন, তাকে বড় হতে সাহায্য করুন। পাশাপাশি নারী ও পুরুষের মধ্যে যে বৈষম্য, সেটি যতটুকু সম্ভব কমিয়ে আনতে সচেষ্ট হন। তবেই আমরা সুস্থ পরিবার ও দেশ পাবো এবং সুস্থ একজন মেয়েকে নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবো।
লেখক : রোকেয়া পদকে ভূষিত বিশিষ্ট নারী ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।


