Tuesday, May 26, 2026
spot_img
Home Blog Page 136

গল্প : করোনা আর বিস্কুট-কথন

– আহমেদ আল আমীন

কী শরিফ! আজও গাড়িতে যাবা না?
না মবিন ভাই। আপনি নেমে পড়েন। সাড়ে ১১টা বাজে।
শরিফের চোখ কম্পিউটারের স্ক্রিনে। আর হাতের আঙুলগুলো খেলছে কি-বোর্ডে। নিউজরুমে থাকা তিন-চারজনের সবাই নেমে গেছে নিচে। রাত সাড়ে ১১টা বাজে। ১১টা ৪৫-এ অফিসের গাড়ি ছাড়বে। পৌঁছে দিয়ে আসবে বাড়ি বাড়ি।
মবিন বয়সে বড় শরিফের চেয়ে, কিন্তু পদে নয়। মবিনের দিকে না তাকিয়েই শরিফ বলে, মবিন ভাই আপনি যান। আমি নিউজটা করে নামি। এই নিউজ সকালে রাখার জন্য না।
মবিন আবার বলে, ‘তুমি নিয়াজকে বুঝিয়ে দিয়ে যাও। ওর তো নাইট ডিউটি। সারারাত তো সে ঘুমাবে। দেখ এখন পর্যন্ত আসে নাই। সাড়ে ১১টা থেকে ওর ডিউটি শুরু হওয়ার কথা, কেয়ারলেস।’
শরিফ হাসে। ‘মবিন ভাই আপনি নামেন তো। দেখা যাবে আপনিও গাড়ি মিস করেছেন। মোহাম্মদপুর যাবেন, অনেক দূর। বাসটাস এখন কিছুই পাবেন না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি সাবধানে যেও।’
শরিফ চায়ে চুমুক দেয়। আবার হাত চালায় কি-বোর্ডে। একটু ভাবে, আবার লেখে। গাজীপুর থেকে আসা একটা নিউজ। স্থানীয় সংবাদদাতা পাঠিয়েছে। খুবই দায়সারাভাবে লেখা। একটা আট বছরের মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শুধু তাই না, ধর্ষণের পর মেয়েটাকে চাদরে পেঁচিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। একেবারে পল্লি গ্রামের মেয়ে। মেয়েটার বাবা নেই। ওর মা আর ও, এই ছিল সংসার। দেড়শ শব্দ লিখে থানার ওসির একটা বক্তব্য দিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নিউজটা পাঠায় গাজীপুরের প্রতিনিধি। নিউজটা হাতে পেয়ে গাজীপুর প্রতিনিধিকে ফোন দেয় শরিফ।
‘আমজাদ ভাই। আছেন ভালো। কী ব্যাপার বলেন তো, ছোট্ট একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে মেরেও ফেলল…।’
‘হ ভাই। রাত ৯টার দিকে খবর পাই। থানায় ফোন দিই। ভাই, ওসি সাবের বক্তব্য আছে তো। আর কোনো সমস্যা নিউজে?’
‘মামলা হয়েছে?’
‘মামলা করতে গেছিল ওর মা। গরিব মানুষ তো এরা। বুঝেটুঝে না। ওসি বলসে, সকালে আইসো, দেখব?’
‘আর লাশ?’
‘দিয়া দিসে ওর মায়েরে।’
‘ওমা পোস্টমর্টেম?’
‘শরিফ ভাই, এরা গরিব মানুষ। এত কিছু বুঝে? আর মাইয়া তো মইরাই গেছে। মায়ে আর পাইব। লাশ দিয়া দিসে। এতক্ষণে জানাজা হয়ে বোধ হয় কবর হয়ে গেছে।’
‘আমজাদ ভাই, আমি অফিসে আছি আরও কিছুক্ষণ। আপনি আরও একটু খবর নেন না প্লিজ। একটু আপডেট করে দেব। এটা আমার অনুরোধ।’
‘আচ্ছা ভাই, আমি দেখছি। আপনারে ফোন দিচ্ছি।’
রাত সাড়ে ১২টার দিকে নিউজটা শেষ হলো শরিফের। নিউজটার হেডলাইন দাঁড়াল এমন—

‘ধর্ষণের পর হত্যা, নিথর শিশুর দাম ২ হাজার টাকা’
মেয়েকে দাফন করে সারা রাত কান্নাকাটি করছিলেন সুফিয়া বেগম। একদল লোক এসে বলল তাঁকে, ‘থানায় আর যাইও না। ধরো, এ টাকাটা রাখো।’ সুফিয়ার হাতে গুঁজে দেওয়া হলো টাকা। লোকজন চলে যাওয়ার পর সুফিয়া হাতের মুঠোয় দেখে এক হাজার টাকার দুইটা নোট।
রাস্তায় নামতে নামতে পৌনে ১টা বেজে গেল শরিফের। এতে সে অভ্যস্ত। নিউজ রেখে গাড়ি ধরার জন্য সে উঠতে পারে না। তাঁর কাছে সাংবাদিকতাটা কেবল চাকরি না। মানুষকে জানানোরও তো একটা বিষয় আছে। এই যে সুফিয়ার সঙ্গে এত বড় একটা অন্যায় হলো, এটা নিশ্চয়ই তাঁর অনলাইন নিউজ পোর্টালের মাধ্যমে কাল সকাল নাগাদ অনেকেই জেনে যাবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানবে, সরকার জানবে। সুফিয়া মেয়ে হারিয়েছে, ন্যায়বিচার তাঁর প্রাপ্য।
এরই মধ্যে সিগারেট ধরিয়েছে শরিফ। এতসব ভাবতে ভাবতে হাতিরঝিলের এক প্রান্তে চলে এসেছে সে। এই সময়টা রিকশা দু-একটা থাকে। তবে হাতিরঝিলের কাছেই শরিফের বাসা। রিকশা না নিয়ে হেঁটেই রওনা দেয় বেশিরভাগ সময়। অন্ধকার, পুলিশ, ছিনতাইকারী কোনো কিছুতেই ভয় নেই শরিফের। পকেটে অফিসের আইডি কার্ড আছে। আর এত আসা-যাওয়া এই পথে সবাই চেনে তাঁকে।
হাতিরঝিলের এক পাশে এই সময়ে বারবণিতাদের আনাগোনা শুরু হয়। কড়া সাজুগুজু করে নানা বয়সী মেয়েরা দাঁড়িয়ে থাকে। রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে নানা শ্রেণির লোকজন দাঁড়িয়ে থাকে তাঁদের সঙ্গে। কেউ সঙ্গে করে নিয়ে যায়। কেউ বা পাশের ঝোপেই। আবার গুলশান-বনানীর বড় গাড়িওয়ালা লোকজনও আসে। গাড়িতে করে নিয়ে যায়।
শরিফের প্রায়ই ইচ্ছা হয় ওই ভিড়টাতে গিয়ে দাঁড়াতে।
একবার এক ঘটনা ঘটেছিল।
সে রাতে হেঁটে যাওয়ার সময় শরিফ দেখে, তার পকেটে সিগারেট নেই। এক সিগারেটওয়ালা দাঁড়িয়ে আছে ওই মেয়েদের মাঝখানে। মেয়েরা, খদ্দেররা পান-সিগারেট কিনছে। শরিফ সিগারেটওয়ালার দিকে আনমনে তাকিয়ে হাঁটছে। সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না, সে কি সিগারেট কিনবে নাকি চলে যাবে? বাসায় গেলে সকাল ১০টার আগে নামা হবে না।
ঠিক এমন সময় মেয়েদের ভেতর থেকে একজন ডাক দেয় শরিফকে।
‘স্যার, আসেন। আপনার সিগারেট লাগবে?’
শরিফ হতভম্ব হয়ে যায়। হঠাৎ ডাকে সে নার্ভাস হয়ে যায়।
‘ওই জামাল, যা স্যারকে সিগারেট দিয়ে আয়।’
শরিফ তখনো আনমনা। হঠাৎ মেয়েটি চিৎকার দিল, ‘স্যার দাঁড়ান। আসবেন না।’
অভিনব এক ঘটনা ঘটল, যার জন্য শরিফ মোটেও প্রস্তুত ছিল না। একটা ট্রাক যাচ্ছিল বেশ দ্রুত। শরিফ সেটা খেয়াল করেনি। মেয়েটা চিৎকার না দিলে শরিফ ট্রাকের নিচেই পড়ত।
‘স্যার, আসেন এবার। জামাল, স্যারকে সিগারেট দে।’
শরিফ মেয়েটির দিকে একবারও তাকায়নি। গোটা পাঁচেক মেয়ে আর তিন-চারজন খদ্দের নিয়ে এখনো ছোটখাটো একটা ভিড়। ঠিক মাথার ওপরে কোনো স্ট্রিট লাইট নেই। কাছের স্ট্রিট লাইটের আলোর সবটা এখানে আসে না। কৃষ্ণচূড়া গাছের আড়ালে একটু ম্লান। সিগারেট ধরাতে গিয়ে মেয়েটিকে দেখল শরিফ। উজ্জ্বল শ্যামলা। খুব কড়া সাজুগুজু নেই। বেশ টেনে কাজল দেয়া চোখে।
এ সময় অন্য মেয়েরা শরিফকে বিব্রত করতে থাকে। ‘স্যার চলেন আমারে নিয়া। বাসায় যাইবেন নাকি অন্য কোথাও।’
শরিফ এখন পালাতে পারলে বাঁচে। শরিফকে উদ্ধার করল ওই মেয়েটিই। আর তাতে শরিফ আরও অবাক হলো। ‘ওই তোরা সব সর। স্যার ভালো মানুষ। সাংবাদিক। এখান দিয়া সব সময় হাঁইটা যায়, তোরা দেখস না? স্যারের বউ আছে। মাশাল্লাহ ছোট্ট একটা মাইয়া আছে। স্যার, আপনি যান। ওরা বুঝে নাই। মাফ করে দিয়েন।’
সিগারেটওয়ালাকে দ্রুত টাকা দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে শরিফ। আকাশপাতাল এক করে ভাবতে থাকে, মেয়েটি তার সম্পর্কে জানল কী করে? এমনকি তার বউ আছে, মেয়ে আছে এসব তথ্য জানে, সাংবাদিকতা করে এটা জানে, অদ্ভুত!
রাতদুপুরে শরিফ বাসায় ফেরে। তার কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে। ততক্ষণে মীরা আর অবন্তী ঘুমের দেশে। মীরা তার স্ত্রীর নাম। আর অবন্তী তার মেয়ে। অবন্তীর বয়স সাত বছর।

করোনার কালে
‘শরিফ এখন তো আমার সত্যিই ভয় লাগছে ভাই। এত দিন বিষয়টা আমলে নেই নাই। এখন দেখি ঢাকায় ধরা পড়ছে করোনাভাইরাস।’ মবিন বেশ চিন্তিত। মুখে মাস্ত পরে আছেন। হাতে পাতলা গ্লাভস। তুলনামূলক বয়স্ক আর অ্যাজমা রোগীরা খানিক ঝুঁকিপূর্ণ—এ তথ্য শোনার পর মবিন আরও দুশ্চিন্তায় আছেন। তাই সাবধানে থাকেন।
‘মবিন ভাই, এত নার্ভাস হয়েন না। সাবধানে থাকেন।’
‘তুমি মিয়া রাত করে বের হওয়া বন্ধ করো। এই সময়টায় বের হয়ে যেও তাড়াতাড়ি। এখন তো শহরে লকডাউন। চাইলে রিকশাও পাবা না।’ শরিফ নেমে যায় রাস্তায়। অফিসে আজ যে বিস্কুটটা দিয়েছে, সেটা অবন্তীর পছন্দের। শরিফ তখন খায়নি। বাসায় যাওয়ার সময় সেই বিস্কুটের প্যাকেটটা নিয়ে বের হলো।
লকডাউন, দীর্ঘ সরকারি ছুটি এসবের কারণে করোনাভাইরাস মোকাবিলা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আয়-উপার্জন! দিনে আনে দিনে খায় মানুষেরা পড়েছে বিপদে। দুপুরে, বিকালে, রাতে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষের দল। হঠাৎ দু-একটা গাড়ি আসে। কিছু বস্তা দিয়ে যায়। বস্তায় ছোট ছোট পলিথিনের ব্যাগে কিছু চাল, ডাল, তেল, আলু।
শরিফ এসব দেখে আর হেঁটে যায়। মানুষ একদমই নেই। গাড়ি নেই। রিকশাও নেই। স্ট্রিট লাইটগুলোর অনেকগুলোই বন্ধ করে দেওয়া। মানুষ যাতে ঘরেই থাকে, এ জন্য সরকার বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। হয়তো পথের বাতিগুলোর বেশ কয়েকটা বন্ধ করে দেওয়া এরই একটা অংশ।
শরিফ মাস্কটা পরে নেয়। চোখে চশমা আর মুখে মাস্ক। বাসায় অবন্তী আছে; কোনো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। এই এক জিনিস হয়েছে এখন। সবাই মাস্ক পরা পথে। কেউ এসে সালাম দিলেও চেনা যায় না। মাস্ক খুলে মুখ দেখালে তবে চেনা লাগে। শরিফ ভাবে, একদিক দিয়ে ভালোই হলো, মাস্কের আড়ালে চলে যাওয়া, কেউ চিনল না।
হাতিরঝিলে ঢুকে কিছুদূর এগোতেই শরিফ দেখে দুটি মেয়ে দুজন পুরুষের কাছে হাত পাতছে। কাঁদছে। সময়টা স্বাভাবিক না। শরিফ পকেট সাবধানে চেক করে আসতে আসতে আগায়।
রিকশা, গাড়ি নেই বলে মেয়ে দুইটাকে পুরুষ দুইটা কোথাও নিতে পারছে না। ওই দুই মেয়ে আকুতি করছে এখানেই কোথাও কাজ সেরে ফেলার। দুদিন ধরে আধাপেটা হয়ে আছে তারা। কোনো খদ্দের নেই। দুদিন বাসায় ছিল। কিন্তু অভুক্ত অবস্থায় কতক্ষণ থাকা যায়?
শরিফ দ্রুত পা বাড়ায়। এ সময় মানুষের কাছাকাছিও যাওয়া যাবে না। কার ভেতরে করোনাভাইরাস ঢুকে আছে, বোঝারও কোনো উপায় নেই।
একটু হাঁটতেই আবার কথাকাটাকাটির শব্দ শুনল শরিফ। নীরব রাস্তায় শরিফ হাঁটছে। সেই হাঁটার শব্দও হচ্ছে। হঠাৎ শরিফ দেখল, ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসছে এক লোক। পেছনে সেই মেয়েটি। ট্রাকের হাত থেকে তাকে বাঁচিয়েছিল। তবে আজ মেয়েটি খানিক বিধ্বস্ত। চোখে কাজল নেই। মুখে তাড়াহুড়ো করে করা মেকআপ আছে। তবে এই অবস্থাতেও মেয়েটিকে সুন্দর লাগছে।
লোকটি দ্রুত চলে যাচ্ছে। মেয়েটি বাধা দিল।
‘ভাই, আমার সাথে কাজটা কর। বিশ্বাস কর ভাই, আমার গা গরম হয়ে আছে। গায়ে জ্বর নাই। গা এমনিতে গরম।’
লোকটা খেঁকিয়ে ওঠে, ‘দূরে সর। এমনি গরম, তাই না? আমি জানি, করোনাভাইরাস হলে গায়ে জ্বর হয়। মাগি তোর থেইকা অসুখ নিয়া আমি বাড়িতে যাইতাম, আমার আর কাম নাই, না? আমার বাড়িতে পোলা-মাইয়া আছে।’
‘ভাই, তাইলে কয়টা টাকা দিয়া যাও। দুদিন ধরে খুব খারাপ অবস্থা। খাওন-দাওন নাই।’
লোকটা খেঁকিয়ে উঠে, ‘হ, কাম করতে পারছি না, মাগনা টাকা দিমু। ভাগ। গাভর্তি জ্বর। তোর করোনা হইসে।’
লোকটা হনহন করে চলে গেল।
শরিফ হাঁটছে। মেয়েটা শরিফকে ডাক দিল।
‘ভাই। শুনবেন।’
শরিফের মুখে মাস্ক। শরিফের মনে হলো, মেয়েটি তাঁকে চিনতে পারেনি।
মেয়েটি শরিফের সামনে এসে লাজুক হাসি হাসতে লাগল। ঠিক একসময় মোড়ে দাঁড়িয়ে মেয়েরা যা করে সে রকম।
শরিফ নড়তে পারছে না। চৈত্রের এই গরমেও সে ঘামছে। মাস্কের ভেতরে চুলকাচ্ছে নাকটা। রাজধানীর আকাশে বিশাল চাঁদ। আর চাঁদের আলোটা পড়ছে মেয়েটার মুখে। এত সুন্দর একটা মুখ। বড় কোনো ঘরে জন্ম নিলে তার সঙ্গে কথা বলার মতো সাহস পেত না কেউ!
‘ভাই, আসেন সময় কাটাই। আপনে যা দিবেন, তাতেই চলব।’
শরিফের ধারণা আরও পোক্ত হলো, মেয়েটি তাঁকে চিনতে পারেনি।
শরিফকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটি সালোয়ার খুলে ফেলল। শরিফ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। চাঁদের আলোটা তীব্রতা ছাড়াই দেখায় সব আর চৈত্রের বাতাসেই আছে অদ্ভুত আনন্দ। শরিফের কাছে এগিয়ে আসে মেয়েটি। হঠাৎ নিজেকে ফিরে পায় শরিফ। এ কি! না, না। এই মেয়েকে কাছে আসতে দেওয়া যাবে না। বাসায় মীরা আছে, অবন্তী আছে। মেয়েটি করোনাভাইরাস আক্রান্ত হলে?
শরিফ দ্রুত দূরে গিয়ে দাঁড়াল। মুখ দিয়ে একটি শব্দও বের করেনি সে। কেন যেন নিজেকে মেয়েটির কাছে চেনাতে তার ইচ্ছে হলো না। সে চাইছে না মেয়েটি তাকে চিনুক। মানিব্যাগ খুলে দেখে পকেটে ৫০ টাকা আছে। শরিফ এটাই মেয়েটির দিকে ছুড়ে দেয়।
‘ভাই। আমি কোনোদিন ভিক্ষা নেই নাই। আর আজ করছি এ রকমও কোনো দিন করি নাই। খদ্দেরের কাছে আমার দাম খারাপ না। কিন্তু করোনাভাইরাস আইসা সব শেষ করে দিল। পথে নামায়া দিল। আপনি আসেন ভাই। যা করার করেন। আমার গা গরম। বিশ্বাস করেন ভাই জ্বর না।’
শরিফ কিছু বলে না। মেয়েটির কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে।
মেয়েটি জামাটা পরে নেয়। তারপর বলে, ‘তাইলে এক কাজ করেন ভাই। একটু দাঁড়ান।’ বলে সে আবার ঝোপের আড়ালে গেল।
ঝোপের আড়াল থেকে বের হয়ে এলো একটা ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে। মেয়েটি ঘুমাচ্ছিল বোধ হয়। ‘ভাই, এটা আমার মেয়ে। সাত বছর বয়স। আমারে নিয়া সন্দেহ থাকলে এর সাথে কিছু করেন। আপনারে দিয়া বনি হইব ভাই। বিশ্বাস করেন আমরা না খাইয়া মরতে চাই না।’
চোখ কপালে ওঠে শরিফের। বলে কি এই নারী। পাগল নাকি? মেয়েটির গায়ে লাল ফ্রক। চাঁদের আলোটা যেন এবার পড়ল ছোট্ট মেয়েটির দিকে। মেয়েটির বয়স সাত। শরিফের মাথা ঘোরাচ্ছে। এ রকম একটা লাল ফ্রক অবন্তীরও আছে!
শিশুটির মা তাকে বলছে, ‘যাও মা, যেমনে কইয়া দিছি, উনার সাথে এমন করবা।’
শরিফের এবার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। হাতে থাকা বিস্কুটের প্যাকেটটা শিশুটির দিকে ছুড়ে মারে শরিফ। এরপর দৌড় দিতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে যায়। শিশুটিও দ্রুত আসছিল তার দিকে। কিন্তু বিস্কুটের প্যাকেটটা পেয়ে থমকে যায়। জোরে জোরে হাঁচি দেয় শিশুটি। তারপর বিস্কুটের প্যাকেটটি খুলে খেতে থাকে।
হুমড়ি খেয়ে পড়ে গিয়ে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ায় শরিফ। মাস্কটা সরে গিয়েছিল। ভালো করে পরে নেয়। কিন্তু মনে খচখচ করতে লাগল মেয়েটি তাকে চিনে ফেলেনি তো!
এদিকে শিশুর মা এসে শিশুকে মারতে লাগল। ‘খানকির মাইয়া। তুই হাঁচি দিছস কেন? হাঁচি দেওয়াতেই তো ব্যাটা চলে গেল। সে মনে করব তোরও অসুখ। তুই কাজ করলে আরও কিছু টাকা পাইতাম। এই বিস্কুট শেষ হইলে খাবি কী?’
মা-মেয়ের কাছ থেকে ততক্ষণে যথেষ্ট দূরে চলে গেছে শরিফ। ছোট্ট মেয়েটি মায়ের মারও খাচ্ছিল, বিস্কুটও খাচ্ছিল।

লেখক : সাংবাদিক

পিরিয়ডের ব্যথা কেন হয়, করণীয়?

– ডা. হুমায়রা বুশরা হোসেন

পিরিয়ড বা ঋতুস্রাবের সময় তলপেটে ব্যথা খুব সাধারণ একটি সমস্যা। বেশির ভাগ নারীরই এ সমস্যা হতে দেখা যায়। বলা হয়, যাদের পিরিয়ড হয়, তাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি নারীই এই সমস্যায় ভোগেন।
ব্যথা কোন সময় শুরু হয়?
ব্যথাটি পিরিয়ড শুরু হওয়ার এক-দুদিন আগে থেকে আরম্ভ হয়ে দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। সাধারণত ব্যথাটি অল্প মাত্রায় হয়ে থাকে। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে ব্যথাটি তীব্র হয়, যা তার দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

কেন ব্যথা হয়?
১. পিরিয়ডের সময় জরায়ুর ভেতরের পর্দা থেকে বের হওয়া প্রোসটাগ্ল্যানডিন নামক এক ধরনের হরমোনের জন্য এমন ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অথবা সন্তান হওয়ার পর কমে যায়।
২. কিছু রোগের জন্যও পিরিয়ডের সময় ব্যথা হতে পারে।
যেমন : জরায়ুর টিউমার
—এন্ডোমেট্রিওসিস
—এডেনোমাওসিস
—পিআইডি
—ডিম্বাশয়ের বা ওভারিয়ান সিস্ট
—পেলভিক কনজেশন সিনড্রোম
—আইইউসিডি ইত্যাদি।

ব্যথা কমাতে করণীয়

রোয়া পদ্ধতি

তলপেটে গরম স্যাঁক বা হট ওয়াটার ব্যাগ ব্যবহারে কিছুটা আরাম পাওয়া যায়।
—গরম পানিতে গোসল করা যেতে পারে।
—হালকা ব্যায়াম করতে হবে। যেমন : হাঁটাহাঁটি করা, স্ট্রেচিং বা যোগব্যায়াম করা।

ওষুধ সেবন

—সাধারণ ব্যথার ওষুধ, যেমন : প্যারাসিটামল ও এনএসআইডি সেবনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যথা কমে যায়।
—হরমোনাল কিছু ওষুধে উপকার পাওয়া যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এসব ওষুধ সেবন করতে পারেন। তবে অতিরিক্ত ব্যথা হলে অন্য কোনো রোগের উপসর্গ রয়েছে কি না, জানার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
লেখক : এফসিপিএস (অবস অ্যান্ড গাইনি) ট্রেইন্ড ইন এআরটি/ইনফার্টিলিটি (ইন্ডিয়া, জার্মানি)

চুলের যত্নে ৬টি সহজ নিয়ম

অনন্যা চৈতী

ঘন সুন্দর চুল সবাই চায়। তবে প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে ঠিকমতো চুলের যত্ন নেওয়াটাই যেন একটি বড় হ্যাপা। কিছু নিয়ম রয়েছে যেগুলো মেনে চললে খুব সহজেই কিন্তু চুল ভালো রাখা যায়। এতে সুন্দর চুলের অধিকারী হতে খুব বেশি কষ্টও পোহাতে হয় না। এ বিষয়ে পরামর্শ জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফেমিনা।

ভেজা চুলের যত্ন
গোসলের পর নরম তোয়ালে দিয়ে চেপে চেপে চুল মুছতে হবে। কখনোই জোরে জোরে ঘষে মুছা যাবে না। কারণ, এ সময় চুলের গোড়া নরম থাকে; চুল ঝরে পড়ার আশঙ্কা থাকে সবচেয়ে বেশি। এমনকি ভেজা চুল আঁচড়ানো থেকেও বিরত থাকতে হবে এ সময়টায়।

অতিরিক্ত তাপ এড়িয়ে চলা
অতিরিক্ত তাপ চুলের ক্ষতি হওয়ার অন্যতম কারণ। তাই চুল ব্লো-ড্রাই, আয়রন করার সময় এটি ১৮৫ ডিগ্রি হিটে সেট করে নিলে ভালো। অতিরিক্ত তাপ চুলের স্বাভাবিক প্রোটিন, কেরোটিনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চুলকে নিস্তেজ করে ফেলে।

সঠিক নিয়মে তেল মেসেজ
চুলের পরিপূর্ণ পুষ্টি জোগাতে প্রয়োজন সঠিক নিয়মে তেল ম্যাসাজ করা। অনেকেই শুধু চুলের উপরিভাগে ও আগায় তেল লাগায়, যেটা একেবারেই ঠিক নয়। চুলের গোড়ায় আঙুলের সাহায্যে মৃদু বৃত্তাকার গতিতে তেল ম্যাসাজ করতে হবে।

অতিরিক্ত গরম পানি নয়
শীতকালে অনেকেই চুলে সরাসরি গরম পানি ব্যবহার করে থাকে। গরম পানি মাথার স্ক্যাল্পের স্বাভাবিক তৈলাক্ততা শোষণ করে চুলকে নির্জীব করে দেয়। হালকা গরম পানি বরং চুল ও শরীর উভয়ের জন্যও উপকারি। তাই শীতকাল তো বটেই অন্য ঋতুতেও ব্যবহার করা যাবে হালকা গরম পানি।

চিরুনি ও ব্রাশ থাকুক পরিষ্কার
নোংরা ব্রাশ ও চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ালে স্ক্যাল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই প্রতিদিনই চুলে ব্যবহৃত ব্রাশ ও চিরুনি পরিষ্কার রাখাটা জরুরি।

শোবার সময় চুলের যত্ন
রাতে চুলের যত্ন নেয়াটা খুব জরুরি। অনেকেই মনে করেন রাতে চুল শক্ত করে বেঁধে ঘুমানো ভালো। ধারণাটি ভুল। বরং চুল খুলে নিচের দিকে রেখে ঘুমানো ভালো। আর বাঁধত হলে, হালকা করে বেঁধে নেয়াটাই উপকারী।

আকর্ষণীয় নখ পেতে ব্যবহার করুন ৪ উপাদান

– অনন্য চৈতী

কখনও ভেবে দেখেছেন, আকর্ষণীয় নখের পেছনে রহস্য কী? হয়তো ভাবছেন, এটি বিউটি পার্লারের ব্যয়বহুল পেডিকিউর-ম্যানিকিউরের কারসাজি! ধারণাটি একেবারে ভুল, তা বলছি না। তবে নখ সুন্দর রাখতে সব সময় যে পার্লারে যেতে হবে, সেটি কিন্তু নয়।
কিছু উপাদান রয়েছে, সেগুলো ব্যবহার করে ঘরে বসেই নখ ভালো রাখার কাজটি সেরে নিতে পারেন। নখ আকর্ষণীয় রাখতে কিছু ঘরোয়া উপাদানের কথা জানিয়েছে টামস অব ইন্ডিয়া।

জলপাইয়ের তেল
জলপাইয়ের তেল বা অলিভ অয়েল ময়েশ্চারাইজারসমৃদ্ধ। এটি নখের ওপরের ছত্রাকগুলো গভীর থেকে নিরাময় করতে কাজ করে। এ ছাড়া নখ হয়ে ওঠে আকর্ষণীয়। প্রতিদিন একটি ছোট বাটিতে অলিভ অয়েল হালকা গরম করে আঙুলগুলো সেই তেলে ১৫ মিনিট ডুবিয়ে দিন। এই কাজটি করার আগে নখগুলো অবশ্যই ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে। ১৫ মিনিট পর তেল থেকে আঙুল তুলে একটি পরিষ্কার তোয়ালে দিয়ে নখ ভালোমতো মুছে নিন।

ছোট্ট একটি রসুন
অনেকেরই নখ ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। এ সমস্যা কমাতে রসুন কার্যকর ভূমিকা পালন করে। রসুন কেটে নখে ঘষতে পারেন, আবার এটির রস নখে লাগাতে পারেন। এতে নখ ভেঙে যাওয়ার সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে অচিরেই।

এক চা চামচ লেবুর রস
নখ বিবর্ণ দেখাচ্ছে? চিন্তা কীসের? একটি ছোট বাটিতে এক চা চামচ বেকিং সোডা, এক চা চামচ লেবুর রস এবং সামান্য পানি মেশান। মিশ্রণটিতে ১০ মিনিটের জন্য নখগুলো ভিজিয়ে রাখুন। এরপর আলতো করে ব্রাশ দিয়ে স্ক্রাব করুন। আকর্ষণীয় ও স্বাস্থ্যকর নখ পেতে প্রতিদিনই এ কাজ করতে পারেন।

গোলাপজল
অ্যান্টিসেপটিক সমৃদ্ধ, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যযুক্ত গোলাপজল অস্বাস্থ্যকর নখের সমস্যা সমাধানে ভালো কাজ করতে পারে। এটি নখের অভ্যন্তরীণ অংশ পরিষ্কার করে এবং নখের ময়েশ্চারাইজার ধরে রাখে।
প্রতিদিন আঙুলগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করে একটি ছোট কটন বলে গোলাপজল নিয়ে নখে লাগান। এতে নখ সুন্দর হয়ে উঠবে।

করোনার সময় বাইরে যাচ্ছেন, মেনে চলুন ৬ বিষয়

সাতকাহন২৪.কম ডেস্ক

বাংলাদেশ গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হলেও বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে এ দেশের আবহাওয়াও। এই গরম তো এই বৃষ্টি, সেইসঙ্গে করোনা! এ পরিস্থিতিতে অনেক মানুষকেই বাইরে কাজে যেতে হচ্ছে। যাদের প্রায় প্রতিদিনই ঘরের বাইরে যেতে হচ্ছে, তাদের জন্য রইল জরুরি কিছু পরামর্শ।

১. ব্যাগে সব সময় অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখুন। কিছুক্ষণ পরপর হ্যান্ড স্যানিটাউজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করে নিন।
২. বাইরে বের হওয়ার সময় অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তিন স্তরবিশিষ্ট মাস্ক ব্যবহার করাই শ্রেয়। হাতে অবশ্যই গ্লাভস ব্যবহার করুন।
৩. এ সময় বাইরের খাবার পরিহার করাই ভালো। বাড়ির বাইরে গেলে সঙ্গে রাখতে হবে বাড়িতে তৈরি খাবার এবং বিশুদ্ধ পানি।
৫. কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি—তাই এ সময় ছাতা সঙ্গে রাখাটা জরুরি।
৬. যেহেতু সময়টা গরমের, তাই হালকা রঙের সুতি পোশাক পরাই ভালো। খুব গাঢ় বা কালো রঙের পোশাক এড়িয়ে যান।
সূত্র : আনন্দবাজার, সানন্দা

নারীর পেশির গঠন ভালো করবে এই ফলটি

অনন্যা চৈতী

জীবনের কোনো না কোনো সময় পেশির ব্যথায় ভোগে না, এমন নারী হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে একটি ফল রয়েছে, যেটি পেশির গঠন বাড়াতে বেশ উপকারী। আর সেটি হলো ব্লু-বেরি।

ব্লু-বেরি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া বার্ধ্যক্যজনিত সময়ে পেশির উন্নতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি আঘাতের পরও পেশি গঠনে কাজ করে। সম্প্রতি এক গবেষণায় এমনটাই জানা গেছে। গবেষণাটির ফল প্রকাশিত হয় জার্নাল অব নিউট্রিশনে।

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরিচালিত গবেষণার ফলে দেখা যায়, ‘ছয় সপ্তাহ ধরে নারীরা ডায়েটে ব্লু-বেরি খাওয়ার কারণে তাদের পেশির কোষ বৃদ্ধিতে সাহায্য হচ্ছিল।’ গবেষণাটি ছয় সপ্তাহ ধরে ২২ জন ২৫ থেকে ৪০ এবং ১০ জন ৬০ থেকে ৭৫ বছর বয়সী নারীকে নিয়ে পরিচালিত হয়। অংশগ্রহণকারীদের নিয়মিত সকালে তাজা ব্লু-বেরির রস (এক দশমিক ৭৫ গ্রাম) পান করতে দেয়া হতো।
এ ছাড়া শুকনো ব্লু-বেরি সকালে ও সন্ধ্যায় ১৯ গ্রাম করে খেতে দেয়া হতো। গবেষণা চলাকালীন তাদের পলিফেনল ও অ্যাসকোয়ানিন সমৃদ্ধ খাবার এড়িয়ে যেতে বলা হয়। ব্লু-বেরি খাওয়ার দেড় ঘণ্টা পর অংশগ্রহণকারীদের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, তাদের শরীরে এক ধরনের সিরামের উপস্থিতি বিদ্যমান, যা ব্লু-বেরি থেকে পাওয়া। সিরামটি তাদের শরীরের পেশির কোষের প্রজনন ক্রিয়াকে প্রসারণ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও অক্সিজেন গ্রহণের হার এবং বিপাক পরিচালনার ক্ষমতায় বিশেষ প্রভাব ফেলে।

২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী নারীদের ওপর পরিচালিত গবেষণা থেকে দেখা যায়, ব্লু-বেরি সমৃদ্ধ সিরাম তাদের শরীরের পেশি প্রজনন কোষের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং সেইসঙ্গে কোষগুলোতে অক্সিজেনের পরিমাণও বৃদ্ধি করেছে। অন্যদিকে ৬০ থেকে ৭৫ বছর বয়সী নারীদের শরীরে ব্লু-বেরি থেকে প্রাপ্ত সিরাম কোনো উপকারী প্রভাব ফেলতে পারেনি।

নারীদের ওপর ব্লু-বেরির যে সমীক্ষা চালানো হয়েছে সেটি ভবিষ্যতে চিকিৎসাশাস্ত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে জানান গবেষণাটির প্রধান আনা থ্যাল্যাকার-মেরার (পিএইচডি)।

রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রসমূহের (সিডিসি) মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পেশি তার নির্দিষ্ট শক্তি ও নমনীয়তা হারাতে থাকে। ৩০ বছর বয়সের পর থেকে মাংসপেশির ভর ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমে যায় এবং এই হার ৬০ বছর বয়সের পর আরো বেড়ে যায়। তাই বয়ঃসন্ধির সময় থেকেই একজন নারীর উচিৎ হবে তার প্রতিদিনের ডায়েটে তাজা ব্লু-বেরির রস রাখা। সম্প্রতি কার্ডিওভাসকুলার, ডায়াবেটিস, মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্লু-বেরির বিশেষ ভূমিকা নিয়েও গবেষণা চলছে।

টলস্টয়ের ‘অ্যানা ক্যারেনিনা’

কাজী ওমর ইফতেখার

লিঁও টলস্টয়, জগতখ্যাত রাশিয়ান লেখক; ছোট-বড় সকলেই তার নামের সঙ্গে পরিচিত। কেউ তার নাম জেনে থাকেন লেখার মাধ্যমে, আবার কেউ বা জানেন অগ্রজ ব্যক্তি অথবা ইলেকট্রনিক নানা মাধ্যমে। সে যা-ই হোক, লিঁও টলস্টয়ের ‘অ্যানা ক্যারেনিনা’ উপন্যাসটির নামের সঙ্গে কমবেশি সবাই আমরা পরিচিত। আমরা অনেকে উপন্যাসটি পড়েছি, আবার অনেকে শুধু নামেই জানি।
আজ সেই ‘অ্যানা ক্যারেনিনা’ সম্পর্কে রইল কিছু চমকপ্রদ তথ্য।
১. ‘অ্যানা ক্যারেনিনা’ মূলত ১৮৭৩ থেকে ১৮৭৭ সাল অবধি রাশিয়ান পত্রে সিরিয়ালযুক্ত আকারে প্রকাশিত হয়েছিল।
২. লিঁও টলস্টয়ের রাজনৈতিক মতামতগুলো তখন জনপ্রিয় ছিল না এবং সাময়িকী সম্পাদকের সঙ্গে তার সংঘর্ষ হয়। সুতরাং উপন্যাসের প্রথম সম্পূর্ণ উপস্থিতি ছিল একটি বই হিসেবে।
৩. ‘অ্যানা ক্যারেনিনা’ চরিত্রটি রাশিয়ার কবি আলেকজান্ডার পুশকিনের কন্যা মারিয়া গার্টুং দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল।
৪. সমালোচকেরা উপন্যাসটিকে ‘উচ্চ জীবনের রোমাঞ্চকর রোম্যান্স’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। সমালোচক লেখক ফিয়োডর দস্তয়েভস্কির কাছ থেকে তাদের বক্তব্য গ্রহণ না করে বলেছিলেন, এটি ‘শিল্পের কাজ হিসেবে নির্দোষ’ এবং রাশিয়ান লেখক ভ্লাদিমির নবোকভ ‘টলস্টয়ের স্টাইলের নির্লজ্জ জাদু’ প্রশংসা করেছেন এবং আমেরিকান লেখক (এবং নোবেল বিজয়ী) উইলিয়াম ফকনার এটিকে ‘এখন পর্যন্ত সেরা লেখা’ বলেছেন।
৫. ২০০৭ সালের এক জরিপে ১২২ জন লেখক ‘অ্যানা ক্যারেনিনা’কে ‘সর্বকালের সেরা লেখা উপন্যাস’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
৬. বইটির শিরোনামটি কখনও কখনও ‘আন্না কারেনিন’ (যেমন রাশিয়ার বাইরে বিবাহিত হলে তাকে ডাকা হতো) বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
৭. নবোকভ রাশিয়ান ‘এ’ অপসারণের পক্ষে ছিলেন, তবে অন্যান্য অনুবাদক রাশিয়ান নামটি রেখে গেছেন।
৮. লিঁও ও সোফিয়া টলস্টয়ের আদালতের অনেক বিবরণ লেভিন ও কিটির রোম্যান্সে উপস্থিত হয়।
৯. লেভিন টলস্টয়ের একটি আধা-আত্মজীবনীমূলক উপস্থাপনা বলে মনে করা হয়; যেহেতু তিনি একই বিশ্বাস, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতা ধারণ করেছেন।
১০. টলস্টয় যখন ‘অ্যানা ক্যারেনিনা’ লিখেছিলেন, রাশিয়ায় তখন বিবাহবিচ্ছেদ একটি জটিল, ব্যয়বহুল ও অপমানজনক প্রক্রিয়া ছিল। কেবল তিনটি পরিস্থিতি ছিল যেখানে বিবাহবিচ্ছেদ মঞ্জুর হবে- স্ত্রী / স্ত্রীদের শারীরিক অক্ষমতা, নিখোঁজ পত্নী (বছরের পর বছর) ও ব্যাভিচার।
সূত্র : ম্যানোফলাবুকডটকম
লেখক : ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

অমৃতা প্রীতমের ২ কবিতা

– কানিজ ফাতেমা মিথিলা
অমৃতা প্রীতম বিংশ শতকের প্রথম পাঞ্জাবি নারী কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন দেশি-বিদেশি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। অথচ গুগল বা ইউটিউবে তার নাম সার্চ করলে যতটা না তার কাজ বা জীবন সম্পর্কে জানা যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি জানা যায় আরেক বিখ্যাত কবি সাহির লুধিয়ানভির সঙ্গে তার প্রেমের বিষয়ে। যদিও সাহিরের প্রতি আবেগ কখনই গোপন করেননি অমৃতা; বরং সমাজের রীতিনীতি, প্রথা উপেক্ষা করে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা এই নারী নিজের প্রেমের কথা জোরের সঙ্গে প্রকাশ করে এসেছেন আজীবন।
তবে কেবল সাহিরের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে বা কয়েকটা প্রেমের কবিতা দিয়ে বিচার করলে অমৃতাকে চেনা যাবে না। জানা যাবে না, কী অসাধারণ সব লেখনী তার কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে।
১৯১৯ সালের ৩১ আগস্ট ভারতের পাঞ্জাবে (তৎকালীন পাকিস্তানের মান্দি বাহাউদ্দিন নামক স্থানে) অমৃতা প্রীতমের জন্ম। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, লোকগান, জীবনী, আত্মজীবনীসহ শতাধিক বই লিখেছেন। ভারত-পাকিস্তান ভাগের নির্মমতা নিয়ে লেখা তার কবিতা ‘আজ আখ্যা ওয়ারিশ শাহ নু’ এবং উপন্যাস ‘পিঞ্জর’ পাঠকমহলে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা পায়। পিঞ্জর উপন্যাস নিয়ে পরবর্তীকালে ২০০৩ সালে পুরস্কারজয়ী সিনেমা নির্মিত হয়।
১৯৫৬ সালে প্রথম নারী হিসেবে পান সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার। এরপর পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণসহ একাধিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। পেয়েছেন অসংখ্য বিদেশি পুরস্কারও। তার লেখা বই বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ২০০৫ সালের ৩১ অক্টোবর দিল্লিতে নিজ অ্যাপার্টমেন্টে ঘুমের ঘোরে মারা যান অমৃতা প্রীতম।
অমৃতা প্রীতমের নির্বাচিত ২টি কবিতা
১. হঠাৎ দেখা
আমি নিশ্চুপ, শান্ত, অটল দাঁড়িয়ে ছিলাম
কেবল পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সমুদ্রে
একটা তুফান ছিল
জানি না
সমুদ্রের মাথায় হঠাৎ কী খেয়াল চাপল
তুফানটাকে একটা থলির ভেতর ভরে
সে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে হেসে দূরে চলে গেল
বোকা বনে গেলাম
তবু তার এই কুদরতকে গ্রহণ করলাম
জানতাম
এ ধরনের ঘটনা শত বছরে একবারই ঘটে থাকে
লাখো চিন্তা মাথায় খেলা করছিল
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম
যে একে সঙ্গে নিয়ে নিজের শহরে ফিরব কীভাবে?
আমার শহরের সব গলিই সরু
আমার শহরের সব ছাদই নিচু
আমার শহরের সব দেয়ালই প্রতারক
মনে হলো
তোমাকে কোথাও যদি খুঁজে পেতাম
তাহলে সমুদ্রের মতো একে বুকের ভেতর রেখে
আমরা দুটো তীরের মতো হেসে উঠতে পারতাম
নিচু ছাদ আর সরু গলির শহরে বাস করতে পারতাম
কিন্তু পুরো দুপুরটা
তোমাকে খুঁজতেই কেটে গেল
আর এই আগুন যন্ত্রণা আমি একাই গিলে ফেললাম
আমি একা এক তীর
তীরকেই টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেললাম
এরপর যখন সন্ধ্যা হয়ে এলো
সমুদ্রের তুফানকে সমুদ্রের কাছেই ফিরিয়ে দিলাম
এখন যখন রাত ঘিরে ধরেছে
তখন তোমার দেখা পেলাম
তুমিও উদাস, চুপ, শান্ত আর অটল দাঁড়িয়ে
আমিও উদাস, চুপ, শান্ত আর অটল দাঁড়িয়ে
কেবল দূরে বয়ে যাওয়া সমুদ্রে একটা তুফান রয়ে গেছে
২. একটি দলিল
চাঁদ ও সূর্যের প্রচ্ছদে মোড়ানো
পৃথিবী কী চমৎকার একটি বই
অথচ ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দাসত্ব……..
হে খোদা, এসব কি তোমারই দৈববাণী
নাকি নিছক ছাপার ভুল?

চলবে..

ত্বকের উজ্জ্বলতা কেন হারায়? প্রতিরোধে করণীয়

ডা. তাওহীদা রহমান ইরিন

সুন্দর, স্বাস্থ্যকর ত্বক সবার কাম্য। ত্বকের উজ্জ্বলতা হারানোর কারণ জানার আগে জেনে নেওয়া জরুরি উজ্জ্বল ত্বক বলতে কী বোঝায়? উজ্জ্বল ত্বক হলো সেই ত্বক, যা সুস্থ-স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত। অর্থাৎ ভারসাম্যপূর্ণ ত্বকই সুস্থ ত্বক। কয়েকটি বিষয় রয়েছে, যেগুলো ত্বকের উজ্জ্বলতা হারানোর ক্ষেত্রে দায়ী। আসুন জানি বিষয়গুলো।

১. ত্বকে পানির পরিমাণ ঠিকঠাক না থাকলে, অর্থাৎ ত্বকের আর্দ্রতা বজায় না থাকলে ত্বক উজ্জ্বলতা হারায়, মলিন হয়ে পড়ে।
২. ত্বকের উজ্জ্বলতা হারানোর আরেকটি কারণ, কোষের অসুস্থতা বা ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। সুস্থ কোষ ত্বকের জন্য সঠিক পরিমাণ মেলানিন তৈরি করে। আর কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে হাইপার অ্যাকটিভ হয়ে বেশি মেলানিন তৈরি হয়। এটি ত্বকের উজ্জ্বলতার পথে বড় বাধা।
৩. উজ্জ্বলতা হারানোর আরেকটি কারণ হলো বয়স। বয়স বাড়তে থাকলে ইলাস্টিন ও কোলাজেন কমতে থাকে। এতে ত্বক দৃঢ়তা ও স্থিতিস্থাপকতা হারায়। কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। তখন বেশি মেলানিন তৈরি করে।
৪. এর সঙ্গে অনিদ্রা, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, অপুষ্টিকর খাবারের কারণেও ত্বক অনুজ্জ্বল হয়ে পড়ে।

প্রতিরোধ

১. নিজের ত্বককে চিনতে শিখুন। ত্বকের ধরন আর আবহাওয়া বুঝে যত্ন নিন। বাইরে বের হলে যেকোনো ঋতুতেই ত্বকের ওপরে ধুলোর আস্তরণ পড়ে। ত্বক পরিষ্কার করার জন্য প্রথমে অলিভ অয়েল, নারিকেল তেল বা আমন্ড অয়েল, গোলাপজল, নারিকেল দুধ দিয়ে মুখ ভালো করে ম্যাসাজ করে নিন। এরপর হালকা গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে মুখটা মুছে ফেলুন। সবশেষে ভালো কোনো মাইলড ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন।
২. মুখ ধোয়ার পরে অবশ্যই ত্বককে ময়েশ্চারাইজ করে নেয়া জরুরি। ময়েশ্চারাইজার পুরো মুখে ভালো করে ম্যাসাজ করতে হবে।
৩. উজ্জ্বল ও সুন্দর ত্বকের জন্য বাইরে বের হওয়ার আগে সানস্ক্রিন ক্রিম ব্যবহার করাটা অপরিহার্য।
৪. শরীরের সুস্থতার পাশাপাশি ত্বকের সুস্থতাও কিন্তু নির্ভর করে ব্যায়ামের ওপরে। ব্যায়াম মানসিক চাপ দূরে রাখে। নিয়মিত ব্যায়াম আমাদের শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে ও অক্সিজেন চলাচলে সহায়তা করে।
৫. ভালো ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম দরকার। একটি ভালো ঘুম দেহের হরমোন মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে কাজ করে। শরীরকে সতেজ ও রোগমুক্ত রাখতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম।
৬. এ ছাড়া দিনে দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করতেই হবে। সতেজ ত্বকের জন্য পানির বিকল্প নেই।নিয়ম করে প্রতিদিন আট গ্লাস পানি পান করুন।
৭. সুন্দর ত্বকের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার, যেমন গাজর, ডিম, টমেটো, কমলা, গ্রিন টি, নারিকেল তেল, শাক, শসা, মৌসুমি ফল (পেয়ারা, আনারস), বাদাম, কুমড়ার বীজ, মাছ, টক দই, জিরা, আদা, হলুদ ইত্যাদি খাদ্যতালিকায় রাখুন। নিয়মিত এসব খাবার খেলে ত্বক থাকবে সজীব ও প্রাণবন্ত।
লেখক : চিফ ডার্মাটোলজিস্ট, শিওর সেল।

লেখক : চিফ ডার্মাটোলজিস্ট, শিওর সেল।

- Advertisement -
সাতকাহন
Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.