Tuesday, September 22, 2026
spot_img
Home Blog Page 143

শিশু বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, কীভাবে বুঝবেন?

মো. জহির উদ্দিন

বাংলাদেশে তিন দশমিক আট ভাগ শিশুর মধ্যে বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা পাওয়া গেছে। বিদেশি গবেষণাগুলোতে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের শতকরা দুই থেকে তিন ভাগের বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা থাকে। এই প্রতিবন্ধীদের ৭৫ ভাগ থেকে ৯০ ভাগের মৃদু মাত্রার সমস্যাটি রয়েছে।

বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার তিনটি লক্ষণ থাকে। প্রথমত, এদের বুদ্ধি তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রায় কম। ওয়েক্সলার ইন্টেলিজেন্স স্কেল অনুযায়ী এদের আইকিউ বা বুদ্ধাঙ্ক সত্তর বা এর কম থাকে।

দ্বিতীয়ত, জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার দক্ষতার ক্ষেত্রে এই শিশুদের যথেষ্ট ঘাটতি থাকে। যেমন, এদের অন্যদের সঙ্গে ভাববিনিময় বা যোগাযোগের দক্ষতা কম, নিজের যত্ন নিজে নেওয়ার ও সংসারে টিকতে হলে যে সাধারণ দক্ষতাগুলো থাকা দরকার, সেগুলোর ক্ষেত্রে ঘাটতি, সামাজিক দক্ষতার ঘাটতি, লেখাপড়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকে, পেশাগত কাজের দক্ষতা, অবসর বিনোদনের দক্ষতা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলোর ক্ষেত্রেও এদের ঘাটতি হয়।

তৃতীয়ত, ব্যক্তির মানসিক প্রতিবন্ধিতার বিষয়টি তার আঠারো বছর বয়সের আগেই দৃশ্যমান হয়। বেশির ভাগ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুকে প্রথম দর্শনে বোঝা যায় না যে তাদের কোনো সমস্যা আছে। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুদের বিকাশ একটু দেরিতে হয়। তারা দেরিতে কথা বলতে শিখে, তাদের স্মৃতিশক্তি কম থাকে, মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা ও ধৈর্য কম থাকে, কোনো কিছু শেখার ক্ষমতাও কম থাকে। যেমন, তাদের সামাজিক রীতিনীতি শিখতে সমস্যা হয়, তাদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ঘাটতি থাকে, নিজের যত্ন নিজে নেওয়া শিখতেও তাদের সমস্যা হয়। যেমন, অন্য শিশু হয়তো দিব্যি টয়লেট করে পরিচ্ছন্ন হয়ে বের হচ্ছে। সেখানে প্রতিবন্ধী শিশু একা একা এটা করতে পারছে না। তার বড়দের সাহায্য লাগছে। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুদের শেখাতে গেলে অনেক ধৈর্য লাগে। এক জিনিস বারবার শেখাতে হয়। এ ধরনের শিশুদের মধ্যে লোকলজ্জার ভয়, কোন কথা বলা যাবে আর কোন কথা বলা যাবে না, সেই জ্ঞান কম থাকে।

মানসিক বা বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা চার ধরনের হয়।
১. মৃদু মাত্রার বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা (এদের আইকিউ বা বুদ্ধাঙ্ক থাকে ৫০ থেকে ৭০-এর মধ্যে)
২. মধ্যম মাত্রার বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা (এদের আইকিউ বা বুদ্ধাঙ্ক থাকে ৩৫ থেকে ৪৯-এর মধ্যে)
৩. চরম মাত্রার বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা (এদের আইকিউ বা বুদ্ধাঙ্ক থাকে ২০-৩৪-এর মধ্যে) এবং
৪. অতিরিক্ত চরম মাত্রার (এদের আইকিউ বা বুদ্ধাঙ্ক থাকে ২০-এর নিচে)।

উল্লেখ্য, বুদ্ধির একককে বলে আইকিউ বা বুদ্ধাঙ্ক। বিভিন্ন ধরনের মনোবৈজ্ঞানিক বুদ্ধি পরিমাপক দিয়ে পরিমাপ করা যায়। যেমন, ওয়েক্সলারের পরিমাপক স্কেলগুলো দিয়ে পরিমাপ করা। উল্লেখ্য, সাধারণ মানুষের আইকিউ গড়ে ৯০ থেকে ১০৯-এর মধ্যে থাকে।

মৃদু মাত্রার বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের বুদ্ধির একক বা আইকিউ স্কোর থাকে ৫০ থেকে ৬৯-এর মধ্যে। এরা সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়তে পারে। তবে তারা পরীক্ষায় সচরাচর খারাপ করে। হয়তো এক-দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে বিশেষ বিবেচনায় পাস করে। তারা নিজেদের যত্ন নিজেরা নিতে পারে। যেমন : একটু বড় হলে তার সাধারণ কেনাকাটা করা, গাড়িতে করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে একা একা যাওয়া। এরা বড় হয়ে সাধারণ পেশায় নিয়োজিত হতে পারে।

মধ্যম মাত্রার বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের বুদ্ধাঙ্ক বা আইকিউ ৩৫ থেকে ৪৯-এর মধ্যে থাকে। এই স্তরের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুদের অনেক অল্প বয়সেই বোঝা যায়। তাদের ভাষার বিকাশ দেরিতে হয়, এদের শিক্ষার ক্ষেত্রে ও সমাজে চলার জন্য প্রচুর সহযোগিতা দরকার হয়। তারা তেমন একটা লেখাপড়া করতে পারে না। তবে প্রচুর চেষ্টা করে তাদের সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে শেখানো যায়, তাদের সাধারণ কাজকর্ম, নিজের যত্ন নিজে নেওয়ার দক্ষতা কিছুটা শেখানো যায়। ইতিবাচক পরিবেশে বিশেষ তত্ত্বাবধানে তারা সীমিত পর্যায়ের পেশাগত কাজ করতে পারে। তাদের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী স্কুলে স্পেশাল এডুকেশন টিচারদের তত্ত্বাবধানে শেখালে ভালো ফল পাওয়া যায়।

যাদের তীব্র বা অতিরিক্ত তীব্র বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা থাকে, তাদের বুদ্ধাঙ্ক বা আইকিউ ৩৫-এর নিচে হয়। তাদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে রাখতে হয়। জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো তারা অত্যন্ত সীমিত পরিমাণে শিখতে পারে। এদের মধ্যে প্রায়ই নানা ধরনের শারীরিক রোগ থাকে। এদের গড় আয়ু সাধারণ মানুষের থেকে বেশ কম।

লেখক : ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট
সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট

 

ডিপ্রেশনে ভুগছেন, কখন ও কীভাবে বুঝবেন?

মো. জহির উদ্দিন

বাংলাদেশের পূর্ণবয়সী মানুষের মধ্যে ৪ দশমিক ৬ ভাগ বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনে ভুগছে। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের মধ্যে এই রোগ প্রায় দ্বিগুণ। ডিপ্রেশনের রোগীদের মধ্যে পুরুষ ৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং নারী ৬৪ দশমিক ২ শতাংশ। বিষণ্ণতা এক ধরনের মানসিক রোগ। বিষণ্ণতার প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য হলো মন খারাপ হওয়া ও আগ্রহহীনতা; মনে কোনো আনন্দ-ফুর্তি না থাকা।

লক্ষণ
এ সময় মনে এক ধরনের ফাঁকা ফাঁকা অনুভূতি হয়। রোগী কোনো হবি বা শখের কাজ করতেও অনীহা প্রকাশ করে। সব ধরনের উদ্যোগই কমিয়ে দেয়। রোগী অপরাধ বোধে আক্রান্ত হয়। কেউ কেউ বিরক্তিতে আক্রান্ত হয়। তার মনে কোনো আশা থাকে না। নিজের পরিস্থিতির পরিবর্তনে তার কোনো কিছু করার নেই, এমনটা বিশ্বাস করে এবং সব উদ্যোগ ছেড়ে দেয়। নিজেকে গুরুত্বহীন ভাবে। যৌন বিষয়সহ কোনো বিষয়েই তার কোনো আগ্রহ থাকে না। স্মরণশক্তি কমে যায়, মনোযোগ ক্ষমতাও কম থাকে। এতে ছাত্ররা পড়ালেখা ভালোভাবে করতে পারে না। সিদ্ধান্ত নিতেও কষ্ট হয়। ঘুম নষ্ট হয়ে যায় বা ঘুম বেড়ে যায়। খাওয়ার রুচি কমে যায় বা বেড়ে যায়। এতে শারীরিক ওজনের ওপর প্রভাব পড়ে। ক্লান্তি বাড়ে বা শরীর দুর্বল লাগে। মরে যাওয়ার চিন্তা আসে বা আত্মহত্যার চিন্তা আসে। কেউ কেউ আত্মহত্যার চেষ্টাও করতে পারে। কথা বলা, চলাফেরা কমে যায়। মানুষ ধীরগতির হয়ে পড়ে। শান্ত বসে থাকতে অসুবিধা বোধ করে অনেকে। এক ধরনের অস্থিরতা ঘিরে ধরে। হজমে অসুবিধা হতে পারে।

তবে এই লক্ষণগুলোর সব কিন্তু বিষণ্ণতার রোগীদের থাকে না। আবার এক/ দুটি লক্ষণ মিলে গেলেই নিজেকে বিষণ্ণতা রোগী ভেবে বসবেন না যেন। লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন ধরে থাকলে, অনেক তীব্র হলে, দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হতে শুরু করলে সম্ভবত আপনার বিষণ্ণতা শুরু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একজন মানসিক রোগের চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন। এতে বোঝা যাবে, আপনার বিষণ্ণতাটি রোগের পর্যায়ে গেছে কি না।

কারণ
১. জীবনের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি,
২. দ্বন্দ্বপূর্ণ পরিবার,
৩. অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা,
৪. ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বৈশিষ্ট্য,
৫. বংশগত ও কিছু শারীরিক কারণসহ (মস্তিষ্কে নিউরোট্রান্সমিটারের ক্ষরণের অস্বাভাবিকতা) বিভিন্ন কারণে বিষণ্ণতা হতে পারে।
বিষণ্ণ কখনো কখনো জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এক গবেষণায় আত্মহত্যার চেষ্টাকারীদের ৬৫ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে মানসিক রোগ পাওয়া গেছে। আত্মহত্যা চেষ্টাকারীদের মধ্যে যারা মানসিকভাবে অসুস্থ, তাদের মধ্যে ৭০ দশমিক ৭ ভাগ বিষণ্ণতা রোগে ভুগে থাকেন।
কেউ বিষণ্ণতায় ভুগছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের সবকটি সরকারি মেডিকেল কলেজের সাইকিয়াট্রি ডিপার্টমেন্টে এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, পাবনা মানসিক হাসপাতালে ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রি ডিপার্টমেন্টে এই রোগের চিকিৎসা পাওয়া যায়। ওষুধের পাশাপাশি কথার চিকিৎসা বা সাইকোথেরাপি, বিশেষত কগনিটিভ বিহেভিয়র থেরাপি বিষণ্ণতার চিকিৎসায় ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে।

লেখক : অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর অব ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি, সাইকোথেরাপি বিভাগ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট

পুরুষের ইরেকটাইল ডিসফাংশন : কারণ ও করণীয়

মঈনুল হক

আমাদের সমাজে যৌনস্বাস্থ্য বিষয়টি নিয়ে আলোচনা যেন এক ঘোরতর বাজে বিষয়। তবে এ বিষয়ে অজ্ঞতার অভাবে ভুক্তভোগী হয় অনেকে; কলহ হয় দাম্পত্যে, সংসারে। তাই সেক্সুয়াল এডুকেশন জরুরি। পুরুষের যৌন অক্ষমতা (মেল সেক্সুয়াল ডিস ফাংশন) বলতে বোঝায়, তার সঙ্গীর সঙ্গে সন্তুষ্টিজনক যৌন সম্পর্ক অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিটিভিত্তিক সার্ভেতে দেখা গেছে, ৪০ থেকে ৭০ বছর বয়সের পুরুষের মধ্যে অন্তত ৫২ ভাগ পুরুষের পুরুষাঙ্গ শক্ত না হওয়া সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। এদের মধ্যে ১৭ ভাগের সামান্য, ২৫ ভাগের মাঝামাঝি এবং ১০ ভাগের পুরো সমস্যা রয়েছে।অপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ বছরের ওপরের বয়স্ক পুরুষের মধ্যে ৭০ ভাগ যৌন সম্পর্ক স্থাপন (সেক্সুয়ালি অ্যাকটিভ) করে। তবে এদের মধ্যে শতকরা ৪০ ভাগই সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যর্থ হয়। পুরুষের যৌন অক্ষমতা হওয়ার একটি অন্যতম বিষয় হলো, সহবাসের সময় পুরুষাঙ্গ পর্যাপ্তভাবে শক্ত না হওয়া বা ইরেকটাইল ডিসফাংশন (ইডি)।

কেন হয়?
এর কারণ হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেজিস্ট্রার, ইউরোলজিস্ট ও অ্যান্ড্রোলজিস্ট ডা. মধুসূদন মণ্ডল বলেন, ‘যারা উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল সমস্যায় ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে সাধারণত এ সমস্যা দেখা যায়। এ ছাড়া যারা অতিরিক্ত ধূমপান করে, তাদের ক্ষেত্রেও এ সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। আবার শ্রোণি (পেলভিক) এলাকার কোনো ক্যানসার বা অন্য কোনো রোগের জন্য রেডিওথেরাপি নেয়া অথবা সার্জারি করা পুরুষাঙ্গ শক্ত না হওয়ারও কারণ। মানসিক বিভিন্ন বিষয়, যেমন আত্মবিশ্বাসহীনতা, বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্ন হওয়া, সম্পর্কে অসন্তুষ্টি ইত্যাদিও এর অন্যতম কারণ।
একে মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা:
১. মানসিক
২. শারীরিক রোগব্যাধি সম্পর্কিত
৩. মিশ্র ধরনের অর্থাৎ মানসিক ও শারীরিক রোগব্যাধি মিলিত

মানসিক
কারো কারো ক্ষেত্রে স্বাভাবিক যৌন উত্তেজনার ঘাটতি, বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যৌন উত্তেজনার ঘাটতি, কোনো একটি নির্দিষ্ট সম্পর্কে উত্তেজনা না পাওয়া অথবা সঙ্গী থেকে ভয়-ভীতি পাওয়া বা মানসিক দ্বন্দ্ব, জীবনের বিভিন্ন দুর্ঘটনা থেকে মানসিক চাপ সৃষ্টি হওয়া, সঙ্গীকে সন্তুষ্টি দিতে না পারার ভয় ইত্যাদি কারণে বিষয়টি ঘটতে পারে।

রোগব্যাধি সংক্রান্ত
স্নায়বিক অসুখের কারণে যেমন, স্মৃতিভ্রম (ডিমেনসিয়া), পারকিনসনিজম, স্ট্রোক, মেরুরজ্জুর (স্পাইনাল কর্ড) আঘাত ও বিভিন্ন রোগে এটি হতে পারে। অপরদিকে ডায়াবেটিস, নিয়মিত মদ্যপান, ভিটামিনের অভাবের কারণে এই স্নায়বিক সমস্যা হয় ।
অনেক সময় হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে এই সমস্যা হতে পারে। পুরুষাঙ্গের শিরা বা ধমনির বিভিন্ন রোগে এমন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার বিভিন্ন ওষুধের নিয়মিত সেবনের কারণে হতে পারে। যেমন: অ্যান্টিসাইকোটিক, অ্যান্টিহাইপারটেনসিভ ধরনের ওষুধ।

মিশ্র ধরনের
তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মিশ্র প্রকৃতির কারণ থাকে। অর্থাৎ মানসিক কারণ, সঙ্গে শারীরিক সমস্যা।

চিকিৎসা
চিকিৎসার বিষয়ে ডা. মধুসূদন মণ্ডলের পরামর্শ-
এ ধরনের রোগীদের প্রথমত করণীয় হলো, নিজের ও পাশাপাশি সঙ্গীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের পরিপূর্ণ তথ্য গ্রহণ করা। শারীরিক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। প্রয়োজনে কিছু ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করতে হবে।
এ রোগের চিকিৎসা দুভাবে করা হয়। যথা:
১. নন-সার্জিক্যাল
২. সার্জিক্যাল

নন-সার্জিক্যাল
ওজন কমানো, নিয়মিত ব্যায়াম করা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া, দীর্ঘ সময় সাইকেল না চালানো, মদ্যপান ও ধূমপান বন্ধ রাখা। যেসব ওষুধ রোগটির কারণ হতে পারে, তা থেকে বিরত থাকা। প্রয়োজনে যৌন ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা। হরমোনজনিত সমস্যার কারণে হলে হরমোনথেরাপি নেওয়া। প্রচলিত ওষুধ যেমন, সিলডেনাফিল, টাডালাফিল ইত্যাদি চিকিৎসক (অ্যান্ড্রোলজিস্ট)- এর পরামর্শ নিয়ে গ্রহণ করা যায়। অন্যান্য পদ্ধতির মধ্যে ইনট্রাকেভারনাস ইনজেকশন, ট্রান্স ইউরেথ্রালথেরাপি, ভ্যাকুয়াম কন্সট্রিকশন ডিভাইস এগুলো নেয়া যেতে পারে।

সার্জিক্যাল
পুরুষাঙ্গের শিরা বা ধমনির সমস্যা হলে কখনো কখনো সার্জারি করে সমস্যার সমাধান করা হয়। এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পেনাইল প্রোসথেসিস ব্যবহার করা যেতে পারে।

নারীর নিজের যত্নে

ফারজানা ফাতেমা রুমী

কোভিড-১৯-এর সময়টায় নারীরা মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে পড়ছেন প্রতিনিয়ত। নিজের যত্ন কিংবা খেয়াল কীভাবে করা যায়, তা ভাবার যেন ফুরসতই নেই। মা-বাবার তাদের শিশুদের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি ঘরে বসেই অফিসের কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে চাপ বাড়ছে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের।

১. প্রতিদিন অন্তত পাঁচ ঘণ্টা যেন শান্তির ঘুম হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সারা দিনের ব্যস্ততা থেকে নিজের জন্য এক ঘণ্টা সময় বের করে রুটিন করে লিখে রাখুন।
২. ঘুম থেকে উঠে ১০ মিনিট বারান্দার রোদে বসুন। হাতে থাকতে পারে চা/কফির মগ। আর বারান্দায় সবুজের সমারোহ থাকলে তার যত্ন নিয়েও এই সময়টা কাটাতে পারেন।
৩. সকালে পাঁচ মিনিট আর বিকেলে পাঁচ মিনিট ডিপ ব্রেথ অনুশীলন করতে পারেন। আরাম করে বসে নাক দিয়ে শ্বাস নিন, বুক ভরে, কিছুক্ষণ ধরে রাখুন, ছেড়ে দিন।
৪. প্রতিদিন ১০ মিনিট গল্প, উপন্যাস, কবিতার বই, ম্যাগাজিন অথবা ধর্মগ্রন্থ পড়ুন ।
৫. রূপচর্চা করুন। চুল ও ত্বকের যত্নে আপনার হাতের নাগালে যা আছে, তা-ই ব্যবহার করুন। একদম সময় না থাকলেও অন্তত ১০মিনিট ব্যয় করুন।
৬. আপনার শারীরিক অবস্থা বুঝে হালকা কিছু ব্যায়াম করতে পারেন বিকেলের দিকে।
৭. নিজের পছন্দমতো একটু সাজুন। হালকা কাজল কিংবা ছোট টিপ পরতে পারেন। পরিপাটি হয়ে থাকুন। হোক না ঘরেই, তাতে কী! কিছুই ভালো না লাগলে চুপ করে ১০ মিনিট নিজেকে সময় দিন।
৮. আপনি প্রি-মেনোপজ/মেনোপজ সময়টায় থাকলে অবশ্যই নিজের মানসিক স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস, অন্যান্য শারীরিক সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে একটু বেশি সচেতন থাকতে হবে। কারণ, হরমোন পরিবর্তনের জন্য এ সময়টা আপনার মুড সুইং করা স্বাভাবিক।
৯. আগে কখনও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে থাকলে এ সময়টা অতিক্রম করতে সমস্যা হলে পুনরায় যোগাযোগ করে নিন। নিতে পারেন টেলিকাউন্সেলিং সেবা।

লেখক : সাইকোলজিস্ট ও বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সংগঠনের আজীবন সদস্য।

গল্প : করোনা আর বিস্কুট-কথন

– আহমেদ আল আমীন

কী শরিফ! আজও গাড়িতে যাবা না?
না মবিন ভাই। আপনি নেমে পড়েন। সাড়ে ১১টা বাজে।
শরিফের চোখ কম্পিউটারের স্ক্রিনে। আর হাতের আঙুলগুলো খেলছে কি-বোর্ডে। নিউজরুমে থাকা তিন-চারজনের সবাই নেমে গেছে নিচে। রাত সাড়ে ১১টা বাজে। ১১টা ৪৫-এ অফিসের গাড়ি ছাড়বে। পৌঁছে দিয়ে আসবে বাড়ি বাড়ি।
মবিন বয়সে বড় শরিফের চেয়ে, কিন্তু পদে নয়। মবিনের দিকে না তাকিয়েই শরিফ বলে, মবিন ভাই আপনি যান। আমি নিউজটা করে নামি। এই নিউজ সকালে রাখার জন্য না।
মবিন আবার বলে, ‘তুমি নিয়াজকে বুঝিয়ে দিয়ে যাও। ওর তো নাইট ডিউটি। সারারাত তো সে ঘুমাবে। দেখ এখন পর্যন্ত আসে নাই। সাড়ে ১১টা থেকে ওর ডিউটি শুরু হওয়ার কথা, কেয়ারলেস।’
শরিফ হাসে। ‘মবিন ভাই আপনি নামেন তো। দেখা যাবে আপনিও গাড়ি মিস করেছেন। মোহাম্মদপুর যাবেন, অনেক দূর। বাসটাস এখন কিছুই পাবেন না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি সাবধানে যেও।’
শরিফ চায়ে চুমুক দেয়। আবার হাত চালায় কি-বোর্ডে। একটু ভাবে, আবার লেখে। গাজীপুর থেকে আসা একটা নিউজ। স্থানীয় সংবাদদাতা পাঠিয়েছে। খুবই দায়সারাভাবে লেখা। একটা আট বছরের মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শুধু তাই না, ধর্ষণের পর মেয়েটাকে চাদরে পেঁচিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। একেবারে পল্লি গ্রামের মেয়ে। মেয়েটার বাবা নেই। ওর মা আর ও, এই ছিল সংসার। দেড়শ শব্দ লিখে থানার ওসির একটা বক্তব্য দিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নিউজটা পাঠায় গাজীপুরের প্রতিনিধি। নিউজটা হাতে পেয়ে গাজীপুর প্রতিনিধিকে ফোন দেয় শরিফ।
‘আমজাদ ভাই। আছেন ভালো। কী ব্যাপার বলেন তো, ছোট্ট একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে মেরেও ফেলল…।’
‘হ ভাই। রাত ৯টার দিকে খবর পাই। থানায় ফোন দিই। ভাই, ওসি সাবের বক্তব্য আছে তো। আর কোনো সমস্যা নিউজে?’
‘মামলা হয়েছে?’
‘মামলা করতে গেছিল ওর মা। গরিব মানুষ তো এরা। বুঝেটুঝে না। ওসি বলসে, সকালে আইসো, দেখব?’
‘আর লাশ?’
‘দিয়া দিসে ওর মায়েরে।’
‘ওমা পোস্টমর্টেম?’
‘শরিফ ভাই, এরা গরিব মানুষ। এত কিছু বুঝে? আর মাইয়া তো মইরাই গেছে। মায়ে আর পাইব। লাশ দিয়া দিসে। এতক্ষণে জানাজা হয়ে বোধ হয় কবর হয়ে গেছে।’
‘আমজাদ ভাই, আমি অফিসে আছি আরও কিছুক্ষণ। আপনি আরও একটু খবর নেন না প্লিজ। একটু আপডেট করে দেব। এটা আমার অনুরোধ।’
‘আচ্ছা ভাই, আমি দেখছি। আপনারে ফোন দিচ্ছি।’
রাত সাড়ে ১২টার দিকে নিউজটা শেষ হলো শরিফের। নিউজটার হেডলাইন দাঁড়াল এমন—

‘ধর্ষণের পর হত্যা, নিথর শিশুর দাম ২ হাজার টাকা’
মেয়েকে দাফন করে সারা রাত কান্নাকাটি করছিলেন সুফিয়া বেগম। একদল লোক এসে বলল তাঁকে, ‘থানায় আর যাইও না। ধরো, এ টাকাটা রাখো।’ সুফিয়ার হাতে গুঁজে দেওয়া হলো টাকা। লোকজন চলে যাওয়ার পর সুফিয়া হাতের মুঠোয় দেখে এক হাজার টাকার দুইটা নোট।
রাস্তায় নামতে নামতে পৌনে ১টা বেজে গেল শরিফের। এতে সে অভ্যস্ত। নিউজ রেখে গাড়ি ধরার জন্য সে উঠতে পারে না। তাঁর কাছে সাংবাদিকতাটা কেবল চাকরি না। মানুষকে জানানোরও তো একটা বিষয় আছে। এই যে সুফিয়ার সঙ্গে এত বড় একটা অন্যায় হলো, এটা নিশ্চয়ই তাঁর অনলাইন নিউজ পোর্টালের মাধ্যমে কাল সকাল নাগাদ অনেকেই জেনে যাবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানবে, সরকার জানবে। সুফিয়া মেয়ে হারিয়েছে, ন্যায়বিচার তাঁর প্রাপ্য।
এরই মধ্যে সিগারেট ধরিয়েছে শরিফ। এতসব ভাবতে ভাবতে হাতিরঝিলের এক প্রান্তে চলে এসেছে সে। এই সময়টা রিকশা দু-একটা থাকে। তবে হাতিরঝিলের কাছেই শরিফের বাসা। রিকশা না নিয়ে হেঁটেই রওনা দেয় বেশিরভাগ সময়। অন্ধকার, পুলিশ, ছিনতাইকারী কোনো কিছুতেই ভয় নেই শরিফের। পকেটে অফিসের আইডি কার্ড আছে। আর এত আসা-যাওয়া এই পথে সবাই চেনে তাঁকে।
হাতিরঝিলের এক পাশে এই সময়ে বারবণিতাদের আনাগোনা শুরু হয়। কড়া সাজুগুজু করে নানা বয়সী মেয়েরা দাঁড়িয়ে থাকে। রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে নানা শ্রেণির লোকজন দাঁড়িয়ে থাকে তাঁদের সঙ্গে। কেউ সঙ্গে করে নিয়ে যায়। কেউ বা পাশের ঝোপেই। আবার গুলশান-বনানীর বড় গাড়িওয়ালা লোকজনও আসে। গাড়িতে করে নিয়ে যায়।
শরিফের প্রায়ই ইচ্ছা হয় ওই ভিড়টাতে গিয়ে দাঁড়াতে।
একবার এক ঘটনা ঘটেছিল।
সে রাতে হেঁটে যাওয়ার সময় শরিফ দেখে, তার পকেটে সিগারেট নেই। এক সিগারেটওয়ালা দাঁড়িয়ে আছে ওই মেয়েদের মাঝখানে। মেয়েরা, খদ্দেররা পান-সিগারেট কিনছে। শরিফ সিগারেটওয়ালার দিকে আনমনে তাকিয়ে হাঁটছে। সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না, সে কি সিগারেট কিনবে নাকি চলে যাবে? বাসায় গেলে সকাল ১০টার আগে নামা হবে না।
ঠিক এমন সময় মেয়েদের ভেতর থেকে একজন ডাক দেয় শরিফকে।
‘স্যার, আসেন। আপনার সিগারেট লাগবে?’
শরিফ হতভম্ব হয়ে যায়। হঠাৎ ডাকে সে নার্ভাস হয়ে যায়।
‘ওই জামাল, যা স্যারকে সিগারেট দিয়ে আয়।’
শরিফ তখনো আনমনা। হঠাৎ মেয়েটি চিৎকার দিল, ‘স্যার দাঁড়ান। আসবেন না।’
অভিনব এক ঘটনা ঘটল, যার জন্য শরিফ মোটেও প্রস্তুত ছিল না। একটা ট্রাক যাচ্ছিল বেশ দ্রুত। শরিফ সেটা খেয়াল করেনি। মেয়েটা চিৎকার না দিলে শরিফ ট্রাকের নিচেই পড়ত।
‘স্যার, আসেন এবার। জামাল, স্যারকে সিগারেট দে।’
শরিফ মেয়েটির দিকে একবারও তাকায়নি। গোটা পাঁচেক মেয়ে আর তিন-চারজন খদ্দের নিয়ে এখনো ছোটখাটো একটা ভিড়। ঠিক মাথার ওপরে কোনো স্ট্রিট লাইট নেই। কাছের স্ট্রিট লাইটের আলোর সবটা এখানে আসে না। কৃষ্ণচূড়া গাছের আড়ালে একটু ম্লান। সিগারেট ধরাতে গিয়ে মেয়েটিকে দেখল শরিফ। উজ্জ্বল শ্যামলা। খুব কড়া সাজুগুজু নেই। বেশ টেনে কাজল দেয়া চোখে।
এ সময় অন্য মেয়েরা শরিফকে বিব্রত করতে থাকে। ‘স্যার চলেন আমারে নিয়া। বাসায় যাইবেন নাকি অন্য কোথাও।’
শরিফ এখন পালাতে পারলে বাঁচে। শরিফকে উদ্ধার করল ওই মেয়েটিই। আর তাতে শরিফ আরও অবাক হলো। ‘ওই তোরা সব সর। স্যার ভালো মানুষ। সাংবাদিক। এখান দিয়া সব সময় হাঁইটা যায়, তোরা দেখস না? স্যারের বউ আছে। মাশাল্লাহ ছোট্ট একটা মাইয়া আছে। স্যার, আপনি যান। ওরা বুঝে নাই। মাফ করে দিয়েন।’
সিগারেটওয়ালাকে দ্রুত টাকা দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে শরিফ। আকাশপাতাল এক করে ভাবতে থাকে, মেয়েটি তার সম্পর্কে জানল কী করে? এমনকি তার বউ আছে, মেয়ে আছে এসব তথ্য জানে, সাংবাদিকতা করে এটা জানে, অদ্ভুত!
রাতদুপুরে শরিফ বাসায় ফেরে। তার কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে। ততক্ষণে মীরা আর অবন্তী ঘুমের দেশে। মীরা তার স্ত্রীর নাম। আর অবন্তী তার মেয়ে। অবন্তীর বয়স সাত বছর।

করোনার কালে
‘শরিফ এখন তো আমার সত্যিই ভয় লাগছে ভাই। এত দিন বিষয়টা আমলে নেই নাই। এখন দেখি ঢাকায় ধরা পড়ছে করোনাভাইরাস।’ মবিন বেশ চিন্তিত। মুখে মাস্ত পরে আছেন। হাতে পাতলা গ্লাভস। তুলনামূলক বয়স্ক আর অ্যাজমা রোগীরা খানিক ঝুঁকিপূর্ণ—এ তথ্য শোনার পর মবিন আরও দুশ্চিন্তায় আছেন। তাই সাবধানে থাকেন।
‘মবিন ভাই, এত নার্ভাস হয়েন না। সাবধানে থাকেন।’
‘তুমি মিয়া রাত করে বের হওয়া বন্ধ করো। এই সময়টায় বের হয়ে যেও তাড়াতাড়ি। এখন তো শহরে লকডাউন। চাইলে রিকশাও পাবা না।’ শরিফ নেমে যায় রাস্তায়। অফিসে আজ যে বিস্কুটটা দিয়েছে, সেটা অবন্তীর পছন্দের। শরিফ তখন খায়নি। বাসায় যাওয়ার সময় সেই বিস্কুটের প্যাকেটটা নিয়ে বের হলো।
লকডাউন, দীর্ঘ সরকারি ছুটি এসবের কারণে করোনাভাইরাস মোকাবিলা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আয়-উপার্জন! দিনে আনে দিনে খায় মানুষেরা পড়েছে বিপদে। দুপুরে, বিকালে, রাতে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষের দল। হঠাৎ দু-একটা গাড়ি আসে। কিছু বস্তা দিয়ে যায়। বস্তায় ছোট ছোট পলিথিনের ব্যাগে কিছু চাল, ডাল, তেল, আলু।
শরিফ এসব দেখে আর হেঁটে যায়। মানুষ একদমই নেই। গাড়ি নেই। রিকশাও নেই। স্ট্রিট লাইটগুলোর অনেকগুলোই বন্ধ করে দেওয়া। মানুষ যাতে ঘরেই থাকে, এ জন্য সরকার বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। হয়তো পথের বাতিগুলোর বেশ কয়েকটা বন্ধ করে দেওয়া এরই একটা অংশ।
শরিফ মাস্কটা পরে নেয়। চোখে চশমা আর মুখে মাস্ক। বাসায় অবন্তী আছে; কোনো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। এই এক জিনিস হয়েছে এখন। সবাই মাস্ক পরা পথে। কেউ এসে সালাম দিলেও চেনা যায় না। মাস্ক খুলে মুখ দেখালে তবে চেনা লাগে। শরিফ ভাবে, একদিক দিয়ে ভালোই হলো, মাস্কের আড়ালে চলে যাওয়া, কেউ চিনল না।
হাতিরঝিলে ঢুকে কিছুদূর এগোতেই শরিফ দেখে দুটি মেয়ে দুজন পুরুষের কাছে হাত পাতছে। কাঁদছে। সময়টা স্বাভাবিক না। শরিফ পকেট সাবধানে চেক করে আসতে আসতে আগায়।
রিকশা, গাড়ি নেই বলে মেয়ে দুইটাকে পুরুষ দুইটা কোথাও নিতে পারছে না। ওই দুই মেয়ে আকুতি করছে এখানেই কোথাও কাজ সেরে ফেলার। দুদিন ধরে আধাপেটা হয়ে আছে তারা। কোনো খদ্দের নেই। দুদিন বাসায় ছিল। কিন্তু অভুক্ত অবস্থায় কতক্ষণ থাকা যায়?
শরিফ দ্রুত পা বাড়ায়। এ সময় মানুষের কাছাকাছিও যাওয়া যাবে না। কার ভেতরে করোনাভাইরাস ঢুকে আছে, বোঝারও কোনো উপায় নেই।
একটু হাঁটতেই আবার কথাকাটাকাটির শব্দ শুনল শরিফ। নীরব রাস্তায় শরিফ হাঁটছে। সেই হাঁটার শব্দও হচ্ছে। হঠাৎ শরিফ দেখল, ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসছে এক লোক। পেছনে সেই মেয়েটি। ট্রাকের হাত থেকে তাকে বাঁচিয়েছিল। তবে আজ মেয়েটি খানিক বিধ্বস্ত। চোখে কাজল নেই। মুখে তাড়াহুড়ো করে করা মেকআপ আছে। তবে এই অবস্থাতেও মেয়েটিকে সুন্দর লাগছে।
লোকটি দ্রুত চলে যাচ্ছে। মেয়েটি বাধা দিল।
‘ভাই, আমার সাথে কাজটা কর। বিশ্বাস কর ভাই, আমার গা গরম হয়ে আছে। গায়ে জ্বর নাই। গা এমনিতে গরম।’
লোকটা খেঁকিয়ে ওঠে, ‘দূরে সর। এমনি গরম, তাই না? আমি জানি, করোনাভাইরাস হলে গায়ে জ্বর হয়। মাগি তোর থেইকা অসুখ নিয়া আমি বাড়িতে যাইতাম, আমার আর কাম নাই, না? আমার বাড়িতে পোলা-মাইয়া আছে।’
‘ভাই, তাইলে কয়টা টাকা দিয়া যাও। দুদিন ধরে খুব খারাপ অবস্থা। খাওন-দাওন নাই।’
লোকটা খেঁকিয়ে উঠে, ‘হ, কাম করতে পারছি না, মাগনা টাকা দিমু। ভাগ। গাভর্তি জ্বর। তোর করোনা হইসে।’
লোকটা হনহন করে চলে গেল।
শরিফ হাঁটছে। মেয়েটা শরিফকে ডাক দিল।
‘ভাই। শুনবেন।’
শরিফের মুখে মাস্ক। শরিফের মনে হলো, মেয়েটি তাঁকে চিনতে পারেনি।
মেয়েটি শরিফের সামনে এসে লাজুক হাসি হাসতে লাগল। ঠিক একসময় মোড়ে দাঁড়িয়ে মেয়েরা যা করে সে রকম।
শরিফ নড়তে পারছে না। চৈত্রের এই গরমেও সে ঘামছে। মাস্কের ভেতরে চুলকাচ্ছে নাকটা। রাজধানীর আকাশে বিশাল চাঁদ। আর চাঁদের আলোটা পড়ছে মেয়েটার মুখে। এত সুন্দর একটা মুখ। বড় কোনো ঘরে জন্ম নিলে তার সঙ্গে কথা বলার মতো সাহস পেত না কেউ!
‘ভাই, আসেন সময় কাটাই। আপনে যা দিবেন, তাতেই চলব।’
শরিফের ধারণা আরও পোক্ত হলো, মেয়েটি তাঁকে চিনতে পারেনি।
শরিফকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটি সালোয়ার খুলে ফেলল। শরিফ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। চাঁদের আলোটা তীব্রতা ছাড়াই দেখায় সব আর চৈত্রের বাতাসেই আছে অদ্ভুত আনন্দ। শরিফের কাছে এগিয়ে আসে মেয়েটি। হঠাৎ নিজেকে ফিরে পায় শরিফ। এ কি! না, না। এই মেয়েকে কাছে আসতে দেওয়া যাবে না। বাসায় মীরা আছে, অবন্তী আছে। মেয়েটি করোনাভাইরাস আক্রান্ত হলে?
শরিফ দ্রুত দূরে গিয়ে দাঁড়াল। মুখ দিয়ে একটি শব্দও বের করেনি সে। কেন যেন নিজেকে মেয়েটির কাছে চেনাতে তার ইচ্ছে হলো না। সে চাইছে না মেয়েটি তাকে চিনুক। মানিব্যাগ খুলে দেখে পকেটে ৫০ টাকা আছে। শরিফ এটাই মেয়েটির দিকে ছুড়ে দেয়।
‘ভাই। আমি কোনোদিন ভিক্ষা নেই নাই। আর আজ করছি এ রকমও কোনো দিন করি নাই। খদ্দেরের কাছে আমার দাম খারাপ না। কিন্তু করোনাভাইরাস আইসা সব শেষ করে দিল। পথে নামায়া দিল। আপনি আসেন ভাই। যা করার করেন। আমার গা গরম। বিশ্বাস করেন ভাই জ্বর না।’
শরিফ কিছু বলে না। মেয়েটির কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে।
মেয়েটি জামাটা পরে নেয়। তারপর বলে, ‘তাইলে এক কাজ করেন ভাই। একটু দাঁড়ান।’ বলে সে আবার ঝোপের আড়ালে গেল।
ঝোপের আড়াল থেকে বের হয়ে এলো একটা ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে। মেয়েটি ঘুমাচ্ছিল বোধ হয়। ‘ভাই, এটা আমার মেয়ে। সাত বছর বয়স। আমারে নিয়া সন্দেহ থাকলে এর সাথে কিছু করেন। আপনারে দিয়া বনি হইব ভাই। বিশ্বাস করেন আমরা না খাইয়া মরতে চাই না।’
চোখ কপালে ওঠে শরিফের। বলে কি এই নারী। পাগল নাকি? মেয়েটির গায়ে লাল ফ্রক। চাঁদের আলোটা যেন এবার পড়ল ছোট্ট মেয়েটির দিকে। মেয়েটির বয়স সাত। শরিফের মাথা ঘোরাচ্ছে। এ রকম একটা লাল ফ্রক অবন্তীরও আছে!
শিশুটির মা তাকে বলছে, ‘যাও মা, যেমনে কইয়া দিছি, উনার সাথে এমন করবা।’
শরিফের এবার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। হাতে থাকা বিস্কুটের প্যাকেটটা শিশুটির দিকে ছুড়ে মারে শরিফ। এরপর দৌড় দিতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে যায়। শিশুটিও দ্রুত আসছিল তার দিকে। কিন্তু বিস্কুটের প্যাকেটটা পেয়ে থমকে যায়। জোরে জোরে হাঁচি দেয় শিশুটি। তারপর বিস্কুটের প্যাকেটটি খুলে খেতে থাকে।
হুমড়ি খেয়ে পড়ে গিয়ে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ায় শরিফ। মাস্কটা সরে গিয়েছিল। ভালো করে পরে নেয়। কিন্তু মনে খচখচ করতে লাগল মেয়েটি তাকে চিনে ফেলেনি তো!
এদিকে শিশুর মা এসে শিশুকে মারতে লাগল। ‘খানকির মাইয়া। তুই হাঁচি দিছস কেন? হাঁচি দেওয়াতেই তো ব্যাটা চলে গেল। সে মনে করব তোরও অসুখ। তুই কাজ করলে আরও কিছু টাকা পাইতাম। এই বিস্কুট শেষ হইলে খাবি কী?’
মা-মেয়ের কাছ থেকে ততক্ষণে যথেষ্ট দূরে চলে গেছে শরিফ। ছোট্ট মেয়েটি মায়ের মারও খাচ্ছিল, বিস্কুটও খাচ্ছিল।

লেখক : সাংবাদিক

পিরিয়ডের ব্যথা কেন হয়, করণীয়?

– ডা. হুমায়রা বুশরা হোসেন

পিরিয়ড বা ঋতুস্রাবের সময় তলপেটে ব্যথা খুব সাধারণ একটি সমস্যা। বেশির ভাগ নারীরই এ সমস্যা হতে দেখা যায়। বলা হয়, যাদের পিরিয়ড হয়, তাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি নারীই এই সমস্যায় ভোগেন।
ব্যথা কোন সময় শুরু হয়?
ব্যথাটি পিরিয়ড শুরু হওয়ার এক-দুদিন আগে থেকে আরম্ভ হয়ে দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। সাধারণত ব্যথাটি অল্প মাত্রায় হয়ে থাকে। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে ব্যথাটি তীব্র হয়, যা তার দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

কেন ব্যথা হয়?
১. পিরিয়ডের সময় জরায়ুর ভেতরের পর্দা থেকে বের হওয়া প্রোসটাগ্ল্যানডিন নামক এক ধরনের হরমোনের জন্য এমন ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অথবা সন্তান হওয়ার পর কমে যায়।
২. কিছু রোগের জন্যও পিরিয়ডের সময় ব্যথা হতে পারে।
যেমন : জরায়ুর টিউমার
—এন্ডোমেট্রিওসিস
—এডেনোমাওসিস
—পিআইডি
—ডিম্বাশয়ের বা ওভারিয়ান সিস্ট
—পেলভিক কনজেশন সিনড্রোম
—আইইউসিডি ইত্যাদি।

ব্যথা কমাতে করণীয়

রোয়া পদ্ধতি

তলপেটে গরম স্যাঁক বা হট ওয়াটার ব্যাগ ব্যবহারে কিছুটা আরাম পাওয়া যায়।
—গরম পানিতে গোসল করা যেতে পারে।
—হালকা ব্যায়াম করতে হবে। যেমন : হাঁটাহাঁটি করা, স্ট্রেচিং বা যোগব্যায়াম করা।

ওষুধ সেবন

—সাধারণ ব্যথার ওষুধ, যেমন : প্যারাসিটামল ও এনএসআইডি সেবনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যথা কমে যায়।
—হরমোনাল কিছু ওষুধে উপকার পাওয়া যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এসব ওষুধ সেবন করতে পারেন। তবে অতিরিক্ত ব্যথা হলে অন্য কোনো রোগের উপসর্গ রয়েছে কি না, জানার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
লেখক : এফসিপিএস (অবস অ্যান্ড গাইনি) ট্রেইন্ড ইন এআরটি/ইনফার্টিলিটি (ইন্ডিয়া, জার্মানি)

চুলের যত্নে ৬টি সহজ নিয়ম

অনন্যা চৈতী

ঘন সুন্দর চুল সবাই চায়। তবে প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে ঠিকমতো চুলের যত্ন নেওয়াটাই যেন একটি বড় হ্যাপা। কিছু নিয়ম রয়েছে যেগুলো মেনে চললে খুব সহজেই কিন্তু চুল ভালো রাখা যায়। এতে সুন্দর চুলের অধিকারী হতে খুব বেশি কষ্টও পোহাতে হয় না। এ বিষয়ে পরামর্শ জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফেমিনা।

ভেজা চুলের যত্ন
গোসলের পর নরম তোয়ালে দিয়ে চেপে চেপে চুল মুছতে হবে। কখনোই জোরে জোরে ঘষে মুছা যাবে না। কারণ, এ সময় চুলের গোড়া নরম থাকে; চুল ঝরে পড়ার আশঙ্কা থাকে সবচেয়ে বেশি। এমনকি ভেজা চুল আঁচড়ানো থেকেও বিরত থাকতে হবে এ সময়টায়।

অতিরিক্ত তাপ এড়িয়ে চলা
অতিরিক্ত তাপ চুলের ক্ষতি হওয়ার অন্যতম কারণ। তাই চুল ব্লো-ড্রাই, আয়রন করার সময় এটি ১৮৫ ডিগ্রি হিটে সেট করে নিলে ভালো। অতিরিক্ত তাপ চুলের স্বাভাবিক প্রোটিন, কেরোটিনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চুলকে নিস্তেজ করে ফেলে।

সঠিক নিয়মে তেল মেসেজ
চুলের পরিপূর্ণ পুষ্টি জোগাতে প্রয়োজন সঠিক নিয়মে তেল ম্যাসাজ করা। অনেকেই শুধু চুলের উপরিভাগে ও আগায় তেল লাগায়, যেটা একেবারেই ঠিক নয়। চুলের গোড়ায় আঙুলের সাহায্যে মৃদু বৃত্তাকার গতিতে তেল ম্যাসাজ করতে হবে।

অতিরিক্ত গরম পানি নয়
শীতকালে অনেকেই চুলে সরাসরি গরম পানি ব্যবহার করে থাকে। গরম পানি মাথার স্ক্যাল্পের স্বাভাবিক তৈলাক্ততা শোষণ করে চুলকে নির্জীব করে দেয়। হালকা গরম পানি বরং চুল ও শরীর উভয়ের জন্যও উপকারি। তাই শীতকাল তো বটেই অন্য ঋতুতেও ব্যবহার করা যাবে হালকা গরম পানি।

চিরুনি ও ব্রাশ থাকুক পরিষ্কার
নোংরা ব্রাশ ও চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ালে স্ক্যাল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই প্রতিদিনই চুলে ব্যবহৃত ব্রাশ ও চিরুনি পরিষ্কার রাখাটা জরুরি।

শোবার সময় চুলের যত্ন
রাতে চুলের যত্ন নেয়াটা খুব জরুরি। অনেকেই মনে করেন রাতে চুল শক্ত করে বেঁধে ঘুমানো ভালো। ধারণাটি ভুল। বরং চুল খুলে নিচের দিকে রেখে ঘুমানো ভালো। আর বাঁধত হলে, হালকা করে বেঁধে নেয়াটাই উপকারী।

- Advertisement -
সাতকাহন
Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.