জগতে আনন্দজজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ। ছবি : আব্দুর রহমান হৃদয়
ভিটামিন ডি দিবস : কেন জরুরি, কোথায় পাবেন?
শাশ্বতী মাথিন
বিশ্ব ভিটামিন ডি দিবস আজ। এই ভিটামিন শরীরের জন্য খুব জরুরি। এটি হাড় শক্তিশালী করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। করোনাভাইরাস রোধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। আর ভিটামিন ডি কাজটি ভালোভাবে করে।
ভিটামিন ‘ডি’- এর ঘাটতি হলে শরীরে কী সমস্যা হয়, এ বিষয়ে জানিয়েছেন হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক সালেহ আহমদ। তিনি বলেন, “ভিটামিন ‘ডি’-এর অভাবে শিশুদের রোগ রিকেটসিয়া হয়। এখানে হাড় বেঁকে যায়। এ ছাড়া এই ভিটামিনের অভাবে অস্টিওপরোসিস বা হাড় ক্ষয়ের সমস্যা বাড়ে। শরীরে ব্যথা, হাড়ে ব্যথা, মানসিক অবসাদ, ত্বকের সমস্যা, বিষণ্ণতা ইত্যাদি সমস্যা ঘটে।”
বাংলাদেশের মানুষের ক্ষেত্রে ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতি হওয়ার প্রবণতা রয়েছে জানিয়ে ডা. সালেহ বলেন, ‘যেহেতু এ দেশের মানুষ ফুল হাতা পোশাক পরে, তাই ত্বক সূর্যের আলোর সংস্পর্শে কম আসে। এ থেকেও ভিটামিন ডি এর ঘাটতি হয়। আবার এখনকার চাকরিগুলো বেশিরভাগই ডেস্ক কেন্দ্রিক। দীর্ঘক্ষণ বদ্ধ জায়গায় কাজ করা, সূর্যের আলোর সংস্পর্শ না আসা ভিটামিন ডি ঘাটতির বড় কারণ।’
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহে দৈনিক ৪০০ থেকে ৮০০ আইইউ (ইন্টারন্যাশনাল ইউটিন) অথবা ১০ থেকে ২০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন ডি প্রয়োজন জানিয়ে ডা. সালেহ বলেন, ভিটামিন ডি পাওয়া যায় সূর্যের আলোতে। এ ছাড়া তৈলাক্ত মাছ, ম্যাকরেল, স্যামন, সারদিন ইত্যাদি সামুদ্রিক মাছে এটি পাওয়া যায়। লাল মাংস (গরু, খাসি), ডিম ও দুধের মধ্যে সামান্য পরিমাণ ভিটামিন ডি পাওয়া যায়।
ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতি পূরণে সূর্যের আলোতে যেতে হবে এবং ভিটামিন ডি যুক্ত খাবার খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে বলে পরামর্শ তাঁর।
ওয়াহিদুল হুদা ডালটনের দুই কবিতা
১.
কবিতায় পড়া বনলতা সেন
মেইল ট্রেনটা প্ল্যাটফর্ম ছুঁতেই
আরো অনেকের সাথে সাথে
হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়লে তুমিও।
খুঁজে পেতে একদম ঠিক
আমার সামনের আসনেই।
জানালার ঠেস দিয়ে আয়েসীভঙ্গিতে
জীবনানন্দ দাশ পড়ছিলাম।
চোখ তুলতেই চোখাচোখি।
তুমি চোখ নামিয়ে নিলে।
আর আমি? জমে গেছি যেন!
জানি না কেন, চোখের ওপর থেকে
সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম।
এত সুন্দর কেউ হতে পারে!!
জানা ছিল না মোটেও।
ঠিক যেন একটা মোমের পুতুল
কেউ এনে বসিয়ে দিয়েছে।
বাইরে হকারের হাঁক-ডাক
মিলিয়ে যেতে লাগলো।
ট্রেনের গতি বেড়ে চলেছে।
আকাশে মেঘের হরদম আনাগোনা।
সহসা আকাশ কালো করা
মেঘেরা বৃষ্টি হয়ে নেমে এলো।
বৃষ্টির ছাঁট তোমাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে,
অসহায় ভঙ্গি তোমার।
আসন ছেড়ে উঠে গিয়ে
জানালার কাচটা নামিয়ে দিলাম।
তুমি ধন্যবাদটুকুও জানালে না।
গভীরভাবে কবিতায় ডুবতে চাইছি,
‘পাখির বাসার মতো দুটি চোখ,
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য!’
কী পড়ছি এসব?
কল্পনার বনলতা সেন তো আমার সামনে!
হুবহু মিলে যাচ্ছে সব বর্ণনা।
কবিতার পাতা থেকে ওঠে এসে
যেন ঠিক আমার সামনে বসেছ।
কী মনে হতে তুমি মুখ তুলে চেয়েই,
“কবিতা পড়েন বুঝি?
জীবনানন্দ দাশ আমারও খুব প্রিয়।”
সহসা এমন প্রশ্নের জন্য
প্রস্তুত ছিলাম না মোটেই।
কোনো মতে বললাম, ‘ও, তাই বুঝি?’
শুরু হলো আলাপচারিতা।
সবটাই কবি ও কবিতা নিয়ে।
ব্যক্তিগত অব্দি গড়ালো না তা।
শুধু জানলাম তুমি সাহিত্য নিয়ে পড়ছো,
আর আমি পড়াই।
ব্যাস, ঐটুকুই শেষ।
আরও কিছু বলার ছিলো।
হয়তো বলতে চেয়েছিলাম
বনলতা সেনের কথা।
বললাম না আর কিছুই।
আমার শিক্ষা আর রুচিবোধ
এসে কন্ঠরোধ করে দিল।
কে জানে, পাছে ফের হ্যাংলা ভাবো কি না!
সহসাই তোমার মাঝে চাঞ্চল্য।
গন্তব্য সামনে বুঝেই বুঝি।
ট্রেনের সিটি বেজে উঠলো,
আস্তে আস্তে প্ল্যাটফর্মে এসে থামতেই
উঠে দাঁড়ালে তুমি।
যাবার সময় মিষ্টি হেসে বলে গেলে,
‘ভালো থাকবেন।’
আমি বসে রইলাম সেভাবেই।
আর বনলতা সেন?
কবিতার বইয়ের পাতায়।
২.
আবার বনলতা সেন
ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী মেখে ফর্সা হবার
প্রতিযোগিতায় নামেনি মেয়েটা।
ডাগর চোখে কাজল পরেছে কি না বোঝার উপায় নেই।
খোলা চুলে এলোমেলো বাতাসেরা খেলা করছে,
তবু সময় নিয়ে গুছিয়ে বাঁধেওনি।
কে জানে কিসের এতো তাড়া ছিল?
হাতে বেশ কদিন আগের মেহেদীর ফিকে প্রায় রং,
বেশ ক’ গোছা কাঁচের চুড়ি আর কপালে টিপ।
ঘটা করে বলার মতো আর বিশেষ কিছু পেলাম না।
তবু কেন যেন এক ঝলক দেখেই মনে হলো,
কতো দিনের চেনা! আগে যেন কোথাও দেখেছি!
কোথায়, কোথায়? নাহ, কিছুতেই মনে পড়ছে না।
ট্রেনে ঠিক মুখোমুখি বসা আমরা।
চোখ বুঁজে নিবিষ্ট মনে গান শুনছেন তিনি।
ট্রেন চলছে, আমিও মনে মনে খুঁজেই চলেছি।
মনের সব কোণা মোটামুটি খোঁজা শেষ।
হঠাৎই যেন সমাধান নিয়ে এলেন জীবনানন্দ দাশ!
বনলতা সেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, এই তো বনলতা সেন!
কবি যেন এঁর সাথেই পরিচয় করিয়েছিলেন।
বুকের ভিতর প্রবল আলোড়ন চলছে,
তাঁকে বলতে ইচ্ছা হচ্ছে, ‘এতোদিন কোথায় ছিলেন?’
ট্রেন হুইসেল দিয়ে নাটোর স্টেশনে পৌঁছালো।
কান থেকে হেডফোন খুলে ব্যাগ গুছালেন তিনি।
ট্রেনের জানালা দিয়ে এক ভদ্রলোক উঁকি দিয়ে,
‘কি গো, পৌঁছালে অবশেষে? জলদি নামো!’
উনি আস্তে করে নেমে গেলেন ট্রেন থেকে।
এতটা সময়ের সফরে একটিবার আমার দিকে দেখেননি।
কোনো আলাপচারিতার ছুঁতোও পাইনি তাই।
নামটাও জানা হলো না। শুধু জানলাম,
বনলতা সেন এখনও নাটোরেই আছেন।
সংসারও করছেন বোধ হয় দিব্যি জমিয়ে।
বিষয়টা জীবনানন্দ দাশকে জানাতে পারলে বেশ হতো।
ছোটগল্প : প্লাজমা
মোশাররফ হোসেন রিপন
রাগ করে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে নিধি। বলে দিয়েছে আমার সঙ্গে তার আর কোনো সম্পর্ক নেই।
লকডাউনের সময় আহ্লাদি গলায় বলেছিল, ‘এসো একবার। মাঝখানে মাত্র দুটো গলি। মানুষ প্রেমের জন্য সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দেয়। আর তুমি কি না দুটো গলি পার হয়ে একবার দেখা দিতে পারো না?’
তার এই ডাক প্রণয়ের ঐশ্বর্যে ভরা। আবেগ আর ভালোবাসা দুর্দান্ত প্রকাশ।
তবু আমার যাওয়া হয়নি। আমার অক্ষমতা তাকে বুঝতে দিইনি। তার অনুযোগ না বোঝার ভান করেছি।
সে চেয়েছিল আমি তার জানালা বরাবর কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়াই। সে দোতলা থেকে এক পলক দেখবে। নেতাদের মতো করে হাত নাড়বে। দৃষ্টিসুখে লুতুপুতু হবে। প্রণয়ের আকাশে তখন প্রজাপতিগুলো নাল, নীল, বেগুনি পাখা মেলে উড়বে।
আমি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে থাকব। বলে দিয়েছে, ‘আমি হাত নাড়তে পারব না। আশপাশের কেউ দেখে ফেলার ভয় আছে। ভয় তার জন্য না; আমার জন্য। দেখে ফেললে এলাকার ছেলেপুলেরা উত্তম মধ্যম দিয়ে হাত পা ভেংগে দিতে পারে।’
আমি সব শুনে বললাম, ‘সম্ভব না।’ সে ক্ষেপে গেল। এতক্ষণ ক্ষুদেবার্তা আদান প্রদান চলছিল। এবার সরাসরি কল দিল। বুঝতে পারছি রাগে ফুঁসছে। আমি ফোন ধরিনি। এই ক’দিন ভিডিও কলেও যাইনি। ফোনে না পেয়ে আবার ক্ষুদেবার্তায় ফিরে এলো। নানান ধরনের ক্রোধান্বিত প্রতিক্রিয়ায় কেঁপে উঠল ইনবক্স। এত রকমের অদ্ভুত প্রতীকী চেহারা জীবনেও দেখিনি।
আবারো দমকা হাওয়ার আঁচড় পড়লো-
– ‘কেন সম্ভব না?’
বুঝতে পারছিলাম অবস্থা বেশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। ভাবছি, কীভাবে ব্যাপারটা সহজ করা যায়।
– ‘সম্ভব না। কারণ তোমাদের এলাকায় কাকের মেলা বসেছে। আন্তঃজেলা কাক মেলা। আকাশ গাছ পালা সব এখন তাদের দখলে। ওদের মেলা চলার সময় উপরের দিকে তাকাতে নেই।’
– ‘মানে!’
– ‘তাকালে মান-ইজ্জত যায়।’
– ‘কাক-টাক কী বলছ এসব?’
– ‘বললে না গাছের নিচে দাঁড়িয়ে উপরের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে! এভাবে তাকালে জামা কাপড় নষ্ট হবে; তাও সমস্যা নেই। কিন্তু গলা দিয়ে নেমে পেটে চলে গেলে সমস্যা। আমার আবার এলার্জি আছে জানো তো। গাড়িতেও বমি আসে। কাকের ইয়ে খেয়ে বমি করে যদি নাড়ি-ভুঁড়ি বের হয়ে যায়! বাঁচবো তো?’
– ‘কাকের মেলা এখানে না আপনার মাথায়। আর আপনাকে হা করে তাকাতে বলেছে কে?’
রেগে গেলে সে তুমি থেকে আপনিতে চলে যায়।
– ‘তুমি না বললে একটু আগে?’
– ‘অহ আচ্ছা তাই না! আচ্ছা। আপনি হা করে থাকলেও সমস্যা নেই। মুখে যেহেতু মাস্ক থাকবে, তাই আপনার গলা দিয়ে নামার ভয় নেই। এবার সোজা চলে আসেন। মাফ নেই।’
– ‘মাস্ক পরবো নাকি?’
– ‘জি মাস্ক পরবেন।’
– ‘তাহলে তো আর চেহারা দেখা যাবে না। একটা মাস্ক দেখাতে এতদূর যাবো? তুমি তো এটা ঘরে বসেই দেখতে পারো।’
– ‘আমার মেজাজ কিন্তু চড়ে যাচ্ছে!’
– ‘চড়া মেজাজ নিয়ে আয়নার দিকে তাকিও না নিধি। রাগলে তোমাকে অদ্ভুত লাগে। ভয় পেয়ে বেহুঁশ হয়ে যেতেও পারো।’
– ‘একদম চুপ। কোনো কথা না।’
– ‘আচ্ছা চুপ করলাম।’
– ‘তো ভিডিও কলে আসেন না কেন? আপনার মতলবটা কি বলেন-তো শুনি?’
– ‘হঠাৎ সন্ন্যাসী দেখলে তুমি ভয় পেয়ে যাবে তাই। জান তো কত দিন ধরে সেলুনে যেতে পারি না। দাড়ি-গোঁফ লম্বা হয়ে কেমন যেন জট পাকিয়ে গেছে; মাজারের ফকিরের মতন।’
– ‘চেহারা দেখাবেন না ভালো কথা। কথা বলতে সমস্যা কী? ফোন ধরলে কী হয়? উফফ! ইচ্ছে করছে——।’
– ‘এখন আমার কী মনে হয় জানো নিধি? মনে হচ্ছে আমি সত্যিকারের সন্ন্যাসী হয়ে গেছি। ধ্যানে বসে দেখলাম; অদ্ভুত একটা জগতে আমি বিচরণ করছি। এ সময় কিন্তু কথা বলা যায় না। নিয়ম নেই।’
– ‘এসব কী হচ্ছে? এতো দেখি পুরাই পাগল!’
– ‘সন্ন্যাসীদের পাগল বলতে নেই; পাপ হয়। তোমার কাছে কী একটা হলুদ শাড়ি হবে? পেঁচিয়ে দেখতাম। অবশ্য নতুন কাপড় লাগবে। নারীর পরিধেয় কাপড় সন্ন্যাসীর শরীরে লাগাতে নেই। ধ্যানভঙ্গ হয়।’
– ‘হুহ! সত্যি তাহলে সন্ন্যাসগ্রহণ করেছেন? বেশ। সন্ন্যাসীর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।’
তারপর সাথে সাথেই ব্লক করে দিলো। এভাবে মাস পার হয়ে গেল। আর কোনো যোগাযোগ হলো না। এদিকে আমার সন্ন্যাসজীবনও শেষ হয়ে এলো।
লকডাউন খুলে দিয়েছে। অফিস শুরু হয়েছে। গনপরিবহন চালু হয়েছে। কিন্তু চারিদিকে প্রচুর লোক করোনা আক্রান্ত হচ্ছে। কারো কারো অবস্থা সংকটাপন্ন।
আমি এগিয়ে গেলাম অপরিচিত একজনকে সাহায্য করতে। হাসপাতাল থেকে বের হয়ে রিক্সার জন্য দাঁড়িয়েছি। মাথার উপর গমগমে রোদ। ভালো করে চোখ মেলা যাচ্ছে না।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাড়ির কালো কাঁচ ধীরে ধীরে নেমে গেল। ভেতর থেকে অস্ফুট গলায় ডাক দিল কে যেন। পরিচিত লাগছে, আবার লাগছে না। তাকিয়ে দেখি নিধি। সেকেন্ডের মধ্যেই নেমে এলো সে।
একি অবস্থা হলো মেয়েটির! এলোমেলো চুল। মাস্কের জন্য দেখা না গেলেও বুঝা যাচ্ছে বিদ্ধস্ত চেহারা। চোখের কোণায় শিশির বিন্দু জমেছে। অস্থির চোখ দুটোতে আতংকের স্পষ্ট ছাপ।
– ‘নিধি তুমি এখানে?’
সে আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই হাউমাউ করে বলল, ‘আমার আব্বুর করোনা পজিটিভ। অবস্থা খুবই খারাপ। তবে প্লাজমা জোগাড় হয়েছে। এখন প্লাজমা নিচ্ছে।’
তার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। আমি শান্তনা দিতে গিয়েও কেঁপে উঠলাম। ঠিক কি বলতে হবে জানি না। তার চোখের পানি মুছে দিতে ইচ্ছে করল ভীষণ। তাদের গাড়িতে থাকা কিছু কৌতুহলী চোখের দিকে নজর পড়াতে নিবৃত হলাম।
যার কথায় আমি হাসপাতালে এসেছি তিনি এলেন।
হাসপাতালের দিকে ছুটার আগে তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে নিধিকে বলল, ‘উনিই আংকেলকে প্লাজমা দিয়েছেন।’
তারপর হাতে থাকা কিছু পথ্য নিয়ে হাঁটা ধরেছেন হাসপাতালের দিকে। ধরে নিলাম এই ভদ্রলোক নিধির কাজিন। আগে জানা ছিল না।
নিধির চোখ ছানাবড়া। অবাক হতে হতে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল যেন।
– ‘তুমি — মানে — তুমি—-?’
– ‘আমি অপলক তাকিয়ে থাকি।’
– ‘তুমি প্লাজমা দিয়েছ মানে?’
– ‘হুম। ওই যে আমার সন্ন্যাসজীবন। তাই প্লাজমা দিতে পেরেছি।’
– ‘তোমার করোনা হয়েছিল? হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে বলল।’
এবার শব্দ করে কাঁদছে। খুব চেষ্টা করেও চেপে রাখতে পারছে না। বুঝে নিল এই দূরত্বের পেছনের কারণ ছিল করোনা।
আবেগের অতিশয্যে কি না, সে দ্রুত দু’কদম এগিয়ে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ডানে বামে তাকালো। তবে থেমে যেতে হলো কোনো কারণে। হয়ত কোনো ইচ্ছে চারপাশের কিছু দৃষ্টির কাছে হার মেনেছে।
সে অস্ফুট গলায় বলল, ‘আমাকে বললে কী হতো?’
বললাম, ‘আমার জন্যও কি চোখের জল ফেলতে? বা ফেলছো এখন?’
সে তাকিয়ে আছে। কোনো কথা বললো না। কিছু কথা না বলাতেই সুন্দর।
নারীর চোখে সমুদ্র বাস করে। কারণে- অকারণে তাতে জোয়ার বয়ে যায়। আবেগ, দুঃখ, কষ্টের অনুভূতিতে জোয়ার আসে। জলের ধারা বহন করে কেবল চোখ দুটোই। চোখের জলে কোনো রং থাকে না। একই জল ভিন্ন ভিন্ন কষ্টে। ভিন্ন আবেগে, ভিন্ন অনুভূতিতে ঝরে। যার সমুদ্র শুধু সে-ই জানে।
নিধিইও জানে নিশ্চয়ই। কিছু অনুভুতি ছুঁয়ে গেল আমাকেও।
আমি কিছুটা ঝুঁকে ফিসফিস করে বললাম, ‘এখন আর কাকের মেলা নেই। সন্ন্যাসজীবনও নেই।’
করোনাকালে জয়েন্টের ব্যথা : করণীয় কী
ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল
পৃথিবীজুড়ে মানুষ আজ আক্রান্ত কোভিড-১৯ এ। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে, ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছে মানুষ। এ ধরনের সংকটময় জীবনে প্রবীণদের বিভিন্ন জয়েন্টে বা অস্থিসন্ধির ব্যথা বেড়ে যাচ্ছে।
আগে যারা নিয়মিত মর্নিং ওয়াক করতেন, তারা আর সেটা করতে যান না। আগে যারা সন্ধ্যায় নিয়মমাফিক হাঁটতেন, তারাও এক প্রকার শুয়ে বসে দিন কাটাচ্ছেন। বিভিন্ন অফিস-আদালত খুললেও করোনার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কারণে অন্যান্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার রুটিন নিয়মগুলো মেনে চলা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে এ সময়ে হাসপাতালের আউটডোরে যেতেও ইতস্তত বোধ করেন। চিকিৎসকের চেম্বারে যেতেও নিরাপদবোধ করেন না।
তাহলে বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতে ব্যথা করলে, এই অনিশ্চিত সময়গুলোতে কীভাবে ব্যথা থেকে মুক্তি পাবেন? কীভাবে মোকাবিলা করবেন আপনার জয়েন্টের তীব্র, অসহনীয় ব্যথা? এই করোনাকালে আপনাদের জয়েন্টের সুরক্ষা দিতে কিছু পরামর্শ-
১. প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ
আপনার জয়েন্টে ব্যথা শরীরের প্রদাহ থেকে হতে পারে। প্রদাহ জয়েন্টের টিস্যুগুলোকে আক্রমণ করে। এতে আপনার জয়েন্টগুলোর মধ্যে তরল পদার্থ সৃষ্টি হয়। জয়েন্ট ফুলে যায় এবং মাংসপেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিছু বিষয় মেনে চলে আপনি বাড়িতে বসেই প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। যেমন :
- হাঁটুতে তীব্র ব্যথা হলে, দু্ই-তিনদিন পূর্ণ বা আংশিক বিশ্রাম নিন। তবে বিছানায় শুয়ে সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেবেন না।
- হাঁটু ফোলা কমানোর জন্য আপনি হাঁটুতে বরফের ঠাণ্ডা সেঁক নিবেন। এ ক্ষেত্রে আপনি ৫ থেকে ১৫ মিনিট আইসব্যাগ রাখতে পারেন। আইসব্যাগ না থাকলে একটি কাপড়ে বরফ মুড়ে সেটি ব্যথার স্থানে রাখুন। কিছুতেই ত্বকে সরাসরি বরফ লাগাবেন না।
২. প্রদাহবিরোধী ওষুধ ব্যবহার
করোনা মহামারির প্রথম দিকে অনেক রোগী এনএসএআইডি বা ব্যথানাশক ওষুধের কথা জেনেছেন। এসব ওষুধ সাধারণ
আরথ্রাইটিস ও জয়েন্টের ব্যথার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। উল্লেখ্য, আরথ্রাইটিস ও জয়েন্টের ব্যথা কোভিড ইনফেকশনকে আরো খারাপ করে তোলে। তবে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে এনএসএআইডি কোভিড-১৯ কে আরো বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং এ সময়ে আপনি জয়েন্টে ব্যথার জন্য এনএসএআইডি যেমন আইবুপ্রফেন বা ন্যাপ্রোফেন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খেতে পারেন। এখন পর্যন্ত প্যারাসিটামল খুবই কার্যকর ওষুধ। সত্যিকার অর্থে কোন ওষুধটি আপনার জন্য প্রযোজ্য সেটি অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। আপনার জয়েন্ট ব্যথার জন্য এবং সেই ব্যথা নিরাময়ে আপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সঠিক ওষুধ কোনটি সেটি নির্বাচনে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
৩. ব্যথা বাড়ার কারণ পরিহার
জয়েন্টে আঘাত লাগলে বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমে আপনার জয়েন্টে ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। জয়েন্টে ব্যথা বেড়ে যাওয়ার আরো কারণের মধ্যে রয়েছে চাপ, আবহাওয়া, বারবার হাঁটাচলা করা, ইনফেকশন ও অতিরিক্ত ওজন। এ ক্ষেত্রে ব্যথা কমানোর জন্য যা করবেন সেগুলো হলো :
- নিচু চেয়ারে বসবেন না।
- দীর্ঘসময় একটানা হাঁটবেন না।
- সিঁড়ি দিয়ে উঠা-নামা করবেন না।
- দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকবেন না।
- শরীর বাঁকিয়ে ফেলতে হয়, এমন ব্যায়াম করবেন না।
আর এ সময় সঠিক খাবার গ্রহণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আপনি যা খাবেন তা সরাসরি শরীরে প্রভাব ফেলে। শারীরিক কাজকর্মের মতো খাওয়া-দাওয়ার দিকে নজর দিতে হবে। অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ করলে ওজন বেড়ে যেতে পারে। এতে জয়েন্টে ব্যথা হবে। আপনার শারীরিক উচ্চতা ও ভর অনুযায়ী ওজন বজায় রাখবেন।
৪. সঠিক ব্যায়াম করুন
কিছু ব্যায়াম বাড়িতে করতে পারেন। এগুলো আপনার হিপ ও হাঁটুকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে। হিপ ও হাঁটুর স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেশি হলো, কোয়াড্রিসেপ মাংসপেশি। এই পেশি উড়ুর সামনে থাকে। হাঁটু সামনের দিকে সোজা করুন বা পা সামনে ছড়িয়ে দিন। চেয়ারে বসে এটি করতে পারেন। চেয়ারে বসে করলে হাঁটুকে সমান সোজা রাখুন, তাহলে কোয়াড্রিসেপ পেশির ব্যায়াম হবে।
মনে রাখবেন, ভুল ব্যায়ামে হাঁটুসহ নানা স্থলে ব্যথা হতে পারে। তাই সঠিক পদ্ধতিতে ব্যায়াম ও বিশ্রাম খবু জরুরি।
৫. চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
বর্তমান করোনাকালে অনেক অর্থোপেডিক সার্জন টেলিমিডিসিনের মাধ্যমে পরামর্শ দিচ্ছেন। আপনি সরাসরি না দেখাতে চাইলে ভিডিও কল বা ফোনে কলের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন। তবে আপনার অবস্থা গুরুতর হলে বর্তমান স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং অবশ্যই মাস্ক পরে চিকিৎসকের কাছে যাবেন।
- ওয়েটিং রুমে এবং রোগীসেবার স্থানগুলোতে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে বসবেন।
- ওয়েটিং রুমে যতটা সম্ভব কম সময় কাটাবেন। চিকিৎসককে অনুরোধ করবেন খুব দ্রুত সময়ের ভেতর আপনাকে দেখে বিদায় দিতে।
- একই সময় যেন বেশি রোগীর ভিড় না হয় সেদিকে চিকিৎসকের খেয়াল রাখতে হবে। বেশি ভিড় থাকলে চেম্বারে না যাওয়াই ভালো। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞের চিকিৎসার মান একই। তাই নির্দিষ্ট চিকিৎসকের চেম্বারে ভিড় না করে অপেক্ষারত কম ভিড়ের চেম্বারে অ্যাপোয়েনমেন্ট করুন।
- রোগীর সাথে হাসপাতালে বা চেম্বারে একজনের বেশি ভিজিটর আসবেন না। রোগী ও তার অ্যাটেনডেন্সকে অবশ্যই মাস্ক পরে আসতে হবে। চেম্বারে ঢোকার আগে তাদের তাপমাত্রা পরীক্ষা করতে হবে এবং সম্পূর্ণ হেলথ স্ক্রিনিং করতে হবে।
- অপারেশনের প্রয়োজন গলে রোগীকে কোভিড১৯ পরীক্ষা করে নিতে হবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক অর্থোপেডিকস ও ট্রমা, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল
জহির রায়হানের টুনি
অধ্যাপক আমেনা আক্তার ডলি
অমর কথাশিল্পী জহির রায়হানের অন্যতম উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’র এক ব্যতিক্রমধর্মী নারী চরিত্র টুনি। বয়স তার তেরো-চৌদ্দর মাঝামাঝি। টুনি চরিত্রটি আধুনিক শিক্ষা-দীক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। তবে ভালোবাসার চিরন্তন ধারায় উজ্জ্বল। সংসার সম্পর্কে অনভিজ্ঞ টুনি কিশোরীসুলভ দুরন্তপনায় দুঃখ, জ্বালা-যন্ত্রণায় অত্যন্ত মানবিক। ঔপন্যাসিক আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তার মানসকন্যা টুনির চরিত্র সুনিপুণভাবে চিত্রায়িত করেছেন। টুনিকে কেন্দ্র করেই উপন্যাসের মূল ঘটনার অগ্রগতি ও পরিসমাপ্তি ঘটেছে। সে জন্যই এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র টুনি।
টুনি নবীনগরের শিকদার বাড়ির বউ। গায়ের রং কালো, ছিপছিপে দেহ, আয়ত চোখ। সমবয়সী কারও সঙ্গে দেখা হলে সবকিছু ভুলে মনের সুখে গল্প জুড়ে দেয় আর হাসে। হাসতে হাসতে মেঝেতে গড়াগড়ি দেয় টুনি। তার চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, মনমানসিকতা বেড়ে উঠেছে আবহমান গ্রামবাংলায়। টুনি কিশোরীসুলভ চপলতার প্রতীক। পল্লিজীবন ও টুনির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। স্বচ্ছ প্রকৃতির সঙ্গে টুনির প্রাণ যুক্ত হয়ে তার চরিত্র হয়েছে সরল নির্মল।
খুব অল্প বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল পরীর দিঘিরপাড়ের বুড়ো মকবুল শিকদারের সঙ্গে। মা-বাবার বড় আদরের মেয়ে টুনি। সংসার জীবনে অনেকটা অনভিজ্ঞ, উদাসীন। স্বামীর সঙ্গে বয়সের ব্যবধানের কারণে টুনির ছেলেমানুষি কিশোরীসুলভ মনোভাবটা মানিয়ে নিতে পারেনি। তাই সমবয়সী পেলে সে মনের সুখে গল্প করে আনন্দ পায়। হাসতে হাসতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সংসারের প্রতি তার দায়বদ্ধতা নেই। স্বামীর প্রতি ভালোবাসাটাও প্রগাঢ় নয়। জীবনে তার স্বাদ, আহ্লাদ ও চাপল্যের পরিচয় প্রকট।
ঘরের দাওয়ায় বসে পুঁথির কথাগুলো গুনগুন করে টুনি। টুনি ছিল সংগীতপ্রিয়। সংস্কৃতমনা টুনির প্রতিভা বিকশিত হয়ে উঠতে পারেনি। এখানেও টুনি নিজেকে প্রস্ফুটিত গোলাপের মতো ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। টুনির চোখ জোড়াও পানিতে টলটল করে ওঠে। তবে মুষলধারার বৃষ্টির মতো অঝোরধারায় ঝরে পড়ে না। এখানেও টুনি নিজের মনের কষ্ট না পাওয়ার বেদনা, যন্ত্রণা নিজের মাঝে একাত্ম করে দেয়।
স্বামীর বাড়িতে থেকেও টুনি তারুণ্যের প্রতীক খেলার সাথি মন্তুকে নিয়ে ভোররাতে জলাভূমিতে শাপলা তোলে, গভীর রাতে অন্যের পুকুরে মাছ চুরি করে আনন্দ পায়। বাপের বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে নীরব নিঝুম রজনীতে মন্তুকে নিয়ে সে নিজেই গাছে চড়ে খেজুরের রস নামিয়ে কলস ভরে। আবার সেই ভরা রসের কলস মাটিতে আছড়ে ভেঙে ফেলে। মন্তুর প্রতি টুনির অবচেতন মনের ভালোবাসা, ভালোলাগা না পাওয়ার যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত, জর্জরিত রক্তাক্ত হৃদয়ের বহিঃপ্রকাশ। জীবনে না পেল স্বামীর একনিষ্ঠ ভালোবাসা, না দিতে পারল মন্তুকে তার অন্তরের অন্তস্তল থেকে নির্ভেজাল ভালোবাসা। অদৃষ্টের কী নির্মম পরিহাস, জীবনের নিষ্ঠুর কারাগারে টুনি বন্দি। হীরণের বিয়েতে আম্বিয়া মন্তুর ঘরে প্রবেশ করেছিল; সে সময় সকলের রসিকতাকে থামিয়ে দিয়েছিল টুনি। মেনে নিতে পারেনি মন্তুর সঙ্গে আম্বিয়াকে জড়িয়ে কোনো কথা।
তার প্রেম প্রকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে মন্তুর হাতে মেহেদি মাখানোর মাধ্যমে। তার ভালোবাসার মেহেদিতে রাঙিয়ে দিয়েছে মন্তুর হাত দুখানি। টুনি যে একজন নারী এবং তার জীবনেও চাওয়া-পাওয়া আছে, তা সে মন্তুর সাহচর্যে এসে বুঝতে পেরেছিল। বুড়ো মকবুলের তৃতীয় স্ত্রী হয়ে যে নারীত্ব সুপ্ত হয়ে পড়ে, মন্তুর সংস্পর্শে তা আবার জেগে উঠল।
বুড়ো মকবুল তাকে যা-দিয়েছে, সংসারজীবনে তাতে তার মনমানসিকতা আত্মতৃপ্তিতে পরিপূর্ণতা পায়নি। সে কারণেই টুনির জীবন শূন্যতা আর রিক্ততায় ভরে ওঠে। মকবুলের প্রতিও টুনি ছিল বিরক্ত। তাই মন্তুর এক প্রশ্নের জবাবে টুনি বলল, ‘মরলেই তো বাঁচি।’
ভালোবাসার পাশাপাশি অবস্থান করে ঈর্ষা। আম্বিয়ার প্রতি তার কোনো ক্ষোভ ছিল না। তবে যখন আম্বিয়ার সঙ্গে মন্তুর বিয়ের কথার আলোচনা শোনে, তার সংযমের বাঁধ ভেঙে যায়। কিছুতে মেনে নিতে পারেনি মন্তুর সঙ্গে আম্বিয়ার বিয়ে। তাই বিয়ে ঠেকানোর জন্য টুনি বুড়ো মকবুলকে প্ররোচনা দিয়ে প্রলুব্ধ করে আম্বিয়াকে বিয়ে করার। মন্তুর প্রতি তার মনের দুর্বলতা এত প্রবল ও তীব্র ছিল যে আম্বিয়াকে সতিন করে নিতেও আপত্তি ছিল না। মন্তুর প্রতি আম্বিয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা হোক, তা টুনি সহ্য করতে পারেনি। এটা একনিষ্ঠ প্রেমের ধর্ম। এখানটায় টুনি চরিত্র উজ্জ্বল, স্পষ্ট।
অসুস্থতার পর স্বামী মকবুলের সেবা-শুশ্রূষা করেছে। সারাক্ষণ টুনি ওর আশপাশে থাকে। একটু অবকাশ পেলে রসুই ঘরে গিয়ে রান্নাবান্নার পাটটা সেরে আসে। সে মরিচগাছ আর লাউ-কুমড়োর গাছগুলোর তদারক করে আসে। অবশেষে টুনির সেবা-যত্নকে অস্বীকার করে মৃত্যু চিরকালের, চিরদিনের জন্য তার স্বামীকে নিয়ে গেল।
টুনি একা হয়ে গেল। সারা দুপুর টুনি কাঁদল। সারা বিকেল। সারা সন্ধ্যা। মকবুলের মৃত্যুর পর টুনির কল্পনা আর বাস্তবতার সত্যতা উপলব্ধি করতে পেরেছে মর্মে মর্মে। কবি ভাষায়, ‘মানুষ যা চায় তা পায় না, আর যা পায় তা ভুল করেই পায়।’ একাকিত্বের যন্ত্রণায় নীল হয়ে যায়, চোয়ালের হাড় দুটো বেরিয়ে আসে। চোখের নিচে কালি পড়ে। মুখখানা বিষণ্ণ, মাথায় ছোট একটা ঘোমটা। যে টুনি হেসেখেলে বেড়াতে পছন্দ করত, সে আজ স্থির। একদিন মন্তুকে আস্তে করে বলল, ‘আমারে একদিন সময় কইরা আমাগো বাড়ি পৌঁছাইয়া দিয়া আইবা।’ টুনি শিকদারবাড়ি থেকে বাবার বাড়ি ফিরে যেতে চায়। যেখানটায় ছোট ঘর, মালপত্র ভরা। কয়েকটা বড় বড় মাটির ঘটি এক কোণে রাখা, তার পাশে তিন-চারটা বেতের ঝুড়ি। উত্তর কোণে দড়ির সঙ্গে ঝুলছে টুনির দুখানি শাড়ি। একটা ময়লা কাঁথা। তা ছাড়া ঘরের ঠিক মাঝখানে ছিল কাঠের সঙ্গে কতগুলো শিকে। শিকের মধ্যে কয়েকটা হাঁড়ি-পাতিল রাখা।
টুনি তার জীবনে দারিদ্র্যকেও দেখেছে। তাই উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত জীবন্ত টুনির বিয়ে হয়েছে দুই সতিনের ঘরে। আজ টুনি রেখে আসা গরিব বাবার গৃহে বিধবা হয়ে এ অল্প বয়সে ফিরে যায়।
সবার গলা জড়িয়ে টুনি কাঁদল। বিদায় নিল। পরীর দিঘিরপাড়ের ওপর দিয়ে আসার সময় দূর থেকে বুড়ো মকবুলের কবরটা চোখে পড়ল। শুকনো মাটির ঢেলাগুলো ঢিপির মতো উঁচু হয়ে আছে। টুনির চলে যাওয়া খুব কষ্টের। মন্তু নৌকার বাইরে এসে বসতে বলল। তবে টুনি সহসা এসে বসল না। আজ নদীর জলে হাতের পাতা ডুবিয়ে দিয়ে খেলা করল না। উজ্জ্বল দৃষ্টি মেলে তাকাল না কোনো দিকে। টুনির জীবনের এ পরিবর্তন কঠিন রূঢ় বাস্তবতার। শুধু বলল, ‘আম্বিয়াকে বিয়ে কইরলে এই নাওডা তোমার অইয়া যাইব না।’ শান্তির হাটের কাছে এসে মন্তু টুনিকে বলল, ‘মনোয়ার হাজিরে কইলে ও মোল্লা ডাইকা সব ঠিক কইরা দিব।’ প্রতি উত্তরে টুনি বলল, ‘না, তা আর অয় না মিয়া, তা অয় না।’ যে টুনি আম্বিয়ার সঙ্গে মন্তুর বিয়ে ভেঙে দিতে চেয়েছে, সে আজ স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে বাস্তবতাকে। আজ এতটা কাছে পেয়েও মন্তুর প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দিয়েছে টুনি। টুনির জীবনের ট্র্যাজেডি উপন্যাসে টুনি চরিত্রকে শুকতারার মতো উজ্জ্বল করে রেখেছে।
গ্রামবাংলার বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনের চিত্র চিত্রিত করতে গিয়ে লেখক ব্যতিক্রমধর্মী টুনি চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। আমাদের গ্রামবাংলার অদৃষ্টবাদী, কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে কেউই আপন ব্যক্তিত্ব নিয়ে আপন ইচ্ছা, আপন আকাঙ্ক্ষা প্রচার করে টিকে থাকতে পারেনি। টুনি গতানুগতিকতার চক্র ছিন্ন করে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনি। টুনি জহির রায়হানের এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। সে যেন এ যন্ত্রণাময় সংসার সমুদ্রের অনির্বাণ দীপশিখা। যতবার সে বেদনাময় জীবনের খেলাঘরে উৎসবের বাসর সাজাতে চেয়েছে, ততবারই তার সে সাধ নিষ্ঠুর নিয়তির নির্মম পরিহাসে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। যদিও লেখক গতানুগতিক প্রথায় কাহিনিপ্রধান উপন্যাস সৃষ্টি করেননি, তবুও তিনি রূঢ় বাস্তব জীবন পরিবেশ বিচরণশীল নর-নারীর সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনায় মেশানো জীবনকে উপেক্ষা করতে পারেনি।
২৮তম বিসিএস (স্বাস্থ্য) ফোরামের সভাপতি মুরাদ, সাধারণ সম্পাদক সুমন
ফিচার ডেস্ক
ডা. মোহাম্মদ মুরাদুল ইসলাম ও ডা.সুমন কুমার সেন ২৮তম বিসিএস (স্বাস্থ্য) ফোরামের নির্বাচনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। অনলাইনভিত্তিক এ নির্বাচন আজ বুধবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। ৭৪৫ বৈধ ক্যাডার অফিসার ভোটারের মধ্যে ৫৪৯ জন ভোট প্রদান করেন।
গণতান্ত্রিক জয় বাংলা পরিষদ মনোনীত ডা. মুরাদ ও ডা. সুমন প্যানেল ৫২০ ভোট পেয়ে পূর্ণ প্যানেলে নির্বাচিত হয়। প্রতিপক্ষ প্যানেল পেয়েছে ১৩ ভোট। ১৬টি ভোট অসম্পূর্ণ প্রদানের জন্য বাতিল হয়।
৬৩ সদস্যবিশিষ্ট নবনির্বাচিত এ কমিটি ২০২২ সাল পর্যন্ত সংগঠন পরিচালনা করবে।


