রফিক-উল-আলম
‘ইনফার্টিলিটি কাউন্সেলিং অ্যান্ড গাইডেন্স বা বন্ধ্যত্বরোধে পরামর্শ’ সেশনে বসে প্রায় প্রতিদিনই অনেককে তাদের ‘ওয়েট ম্যানেজমেন্ট’ বা ওজন নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলতে হয়।
আর বলা মাত্রই প্রায় প্রত্যেকেই একেবারে গালভরে বলে ওঠে, ‘ওজন কমাতে চেষ্টা করছি স্যার, খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছি।’ কেউবা পরম আত্মতুষ্টির সঙ্গে গাল ফুলিয়ে বলে, ‘আমি ডায়েট করছি, স্যার।’ কী করে বোঝাই ওদের, ‘ডায়েট’ মানেই না খেয়ে থাকা নয়? ‘ওয়েট ম্যানেজমেন্ট’ মানেই ইউটিউব ঘেঁটে নানা টোটকা-টিপস নিয়ে ‘জিরো ফিগারে’ যাওয়া নয়।
মনের গভীরে ঢুকিয়ে রাখতে হবে ডায়েট ও ওজন নিয়ন্ত্রণ আসলে শারীরিক, অভ্যাসগত ও মানসিক প্রক্রিয়া। সুষ্ঠু ও সুনির্দিষ্ট জীবনযাপন অনুসরণ করে বয়স, উচ্চতা ও লিঙ্গভেদে একটি প্রত্যাশিত স্বাস্থ্যকর ওজনে পৌঁছানো যায়। পাশাপাশি প্রতিনিয়ত চর্চার মাধ্যমে তা মেনে চলাই হলো ওয়েট ম্যানেজমেন্ট বা প্রকৃত ডায়েট।
যারা সন্তানপ্রত্যাশী বা ইনফার্টিলিটিতে ভুগছেন, সবার জন্যই এই ওজন নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
তাই বলব, ওজন কমানোর ক্ষেত্রে একেবারে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ না করে বা মনগড়া কিছু পন্থা অবলম্বন না করে বা ইন্টারনেট ও চ্যাটজিপিটির বিদ্যা না ফলিয়ে বরং সংশ্লিষ্ট পেশাদারদের সহায়তা নিন। জানবেন, না বুঝে নিজে নিজে কেরামতির কারণেই হয়তো আজও আপনি ঝুলছেন; কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাচ্ছেন না।
অনেক সময় দেখা যায়, নিজে নিজে ভুলভাল ডায়েট চার্ট অনুসরণ করার কারণে গর্ভধারণ করলেও শিশুর হার্টবিট পাওয়া যায় না, ব্লাইটেড ওভামসহ নানাভাবে গর্ভপাত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
তাই সন্তানপ্রত্যাশীদের ওজন কমাতে নিতে হবে বাড়তি সতর্কতা। আসুন, জানি সেগুলো–
১. নিজের আদর্শ বিএমআই (বডিমাস ইনডেক্স) সম্পর্কে ধারণা না থাকায় অনেকেই শুধু নিজের ওজন কমানো বা বাড়ানোর দিকে নজর দিয়ে থাকে। ব্যক্তি হিসেবে সে কম ওজনে, নাকি বেশি ওজনে রয়েছে– কিছুই বোঝে না। অথচ দুটোই ক্ষতিকর, গর্ভধারণের ক্ষেত্রে অন্তরায়।
২. সবচেয়ে বড় ব্যাপার, সাধারণত যারা খাওয়া কমিয়ে ওজন কমানোর চেষ্টা করেন, তারা বেশির ভাগই নিজেদের নিউট্রিয়েন্ট রিকুয়ারমেন্টস (Nutrient Requirements) বা পুষ্টির চাহিদার দিকে একটুও খেয়াল করেন না। অথচ নিজের শরীরের জন্য, ডিম বড় হ্ওয়ার (ম্যাচিউরেশন) জন্য, ডিম্বস্ফুটনের (ওভ্যুলেশন) জন্য দেহে ফলিক এসিড, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়োডিন, আয়রন, জিংক, সেলেনিয়াম, ভিটামিন ‘ডি’, ভিটামিন ‘বি- ৬’, ভিটামিন ‘বি-১২’, ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড, প্রোটিন ও ফাইবারসহ নানা মিনারেল বা খনিজ পদার্থের প্রয়ােজন।
কখনও কি ভেবেছেন, প্রতিদিন যা খাচ্ছেন তার মধ্যে এসব পুষ্টিগত উপাদান রয়েছে কিনা? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, একদমই নেই। অর্থাৎ ওজন কমাতে গিয়ে অনেকে নিজেদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ থেকে বহুদূরে চলে যাচ্ছেন, বরং নিজের ক্ষতি করছেন।
৩. কাউকে কাউকে দেখি, নিজেদের নিয়মে ওজন কমাতে গিয়ে বীভৎস চেহারা বানিয়ে ফেলেছেন। অর্থাৎ এটিও শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থেকে বঞ্চিত করারই ফল। এতে আপনার শরীর ভেঙে পড়ছে।
৪. কেউ বা ইউটিউব বা অনলাইনে আকৃষ্ট হয়ে বিভিন্ন ফুড সাপ্লিমেন্ট ও ওজন কমানোর ওষুধসহ বিভিন্ন জিনিস খেয়ে থাকেন। মনে রাখতে হবে, এসব সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধ ওজন কমিয়ে দিলেও তা এক বিশাল স্বাস্থ্যঝুঁকি। এগুলো সাধারণত অন্য ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে কি ওজন কমানোর জন্য কোনো সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যাবে না? নিশ্চয় যাবে। ওজন কমানোর জন্য উপযুক্ত ফুড সাপ্লিমেন্টও পাওয়া যায়। তবে এগুলো শুধু সংশ্লিষ্ট পেশাদারদের পরামর্শ ও সহায়তা নিয়েই গ্রহণ করতে হবে।
সন্তানপ্রত্যাশীদের ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিলে একদিকে যেমন নিয়ম অনুযায়ী ওজন কমিয়ে গর্ভধারণ করার পথ সুগম হয়, তেমনি যারা শুধু সৌন্দর্য ও সুস্বাস্থ্যের জন্য ওজন কমাতে চান, তারাও তাদের রূপ ও ত্বকের লাবণ্য বজায় রেখে দিব্যি কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেতে পারেন।
লেখক: কনসালট্যান্ট; আইভিএফ অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি কাউন্সেলর;
ইমপালস হাসপাতাল, ঢাকা
ফোন: ০১৬৮৪৩৪২৪৪৯


