ডা. তাওহীদা রহমান ইরিন
প্রথম পর্বের পর, শেষ পর্ব
পিসিওএসের পেশেন্টরা যেহেতু প্রি-ডায়াবেটিক বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে থাকে, তাই তারা সুগার কন্ট্রোল ( রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে) করতে অনেক সময় মেটফরমিন দিয়ে থাকেন এবং লক্ষণ অনুযায়ী ওষুধ দেন।
ময়মনসিংহ মেডিক্যালের একটি স্টাডিতে দেখা গেছে, পিসিওএসের রোগীদের থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে। এই কারণে রোগীদের থাইরয়েড স্ক্রিনিং করাটাও খুব জরুরি এবং এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট এই ক্ষেত্রে ভালো সমাধান দিতে পারেন। আর গাইনিকোলজিস্টরা পিসিওএসের রোগীদের যেভাবে চিকিৎসা দেন তা হলো, অবিবাহিতদের অনিয়মিত পিরিয়ডকে নিয়মিত করার জন্য ওরাল কন্ট্রাসেপটিভ পিল, এন্টি এন্ড্রোজেন হরমোন দিয়ে থাকেন। যারা বিয়ের পর সন্তান নিতে চায় তাদের ওভুলেশন ইনডিউসিং ড্রাগ দেওয়া হয়।
পিসিওএসের একটি প্রধান সমস্যা স্কিন ম্যানিফেস্টেশন। ত্বকের কিছু সমস্যা দেখা দেয়, যেটি আমি শুরুতেই গল্পের মাধ্যমে জানিয়েছি। এদের মধ্যে যখন ব্রণ দেখা দেয়, ডার্মাটোলজিস্টরা সেই অনুযায়ী একটি স্কিন কেয়ার দিয়ে থাকেন। সাধারণত ব্রণগুলো অনেক সময় প্রদাহজনিত ও সিস্টিক টাইপের হয়ে থাকে। এই ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক ও রেটিন এ ডেরিভেটিভ আইসোট্রেটিনয়েন দেওয়া হয়ে থাকে। রেগুলার যে মূল ত্বকের যত্ন ব্রণের জন্য যেমন, ময়েশ্চারাইজার, ক্লিনজার, সানস্ক্রিন এবং ব্রণের উপর ব্যবহারের জন্য মেডিকেশন এগুলো দেওয়া হয়।
কিছু আধুনিক ট্রিটমেন্টও করা হয়ে থাকে। যেমন: পিলিং, ব্লু লাইট থেরাপি, আনওয়ান্টেড হেয়ারের ক্ষেত্রে হেয়ার রিডাকশন লেজার কয়েকটি সেশনে করা হয়। পিগমেন্টেশনের ক্ষেত্রে স্কিন লাইটেনিং কসমেসিউটিক্যালস প্রোডাক্টগুলো দেওয়া হয়। এগুলোতে আরবুটিন, কজিক এসিড, ল্যাকটিক এসিড থাকে। এগুলো স্লিপিং মাস্ক বা স্কিন লাইটেনিং ক্রিম ইত্যাদি ফর্মুলাতে পাওয়া যায়।
দুই দশক আগেও পিসিওএসের সমস্যা এতো প্রকট ছিল না। আমরা স্কুল-কলেজে পড়ার সময়, কিন্তু খুব কম স্থুলকায় মেয়েদের দেখতাম। অধিকাংশ মেয়েদেরই ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকতো। কারণ, আমরা খেলাধুলার জায়গা পেয়েছি, খেলেছি, আমাদের ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটিস ছিল। এখনকার ছেলে-মেয়েদের সেটি নেই, চার দেয়ালে বন্দী।
প্রায় ৫০ শতাংশ স্থুলকায় রোগীরাই আমাদের কাছে আসে পিসিওএসের সমস্যা নিয়ে। বার বার আমার আলোচনার মাধ্যমে উঠে এসেছে – লাইফস্টাইল মডিফিকেশন। লাইফস্টাইল মডিফিকেশনের মাধ্যমে পিসিওএসের এর লক্ষণগুলো অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে আমাদের উপমহাদেশের স্বনামধন্য চিত্রনায়িকা সোনম কাপুর। তিনি তার একটি ডকুমেন্টরিতে বলেছেন, পিসিওএসের জন্য দেশে-বিদেশে অনেক ডাক্তার দেখিয়েছেন কিন্তু কোনোভাবেই এ সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পাচ্ছিলেন না। এরপর তিনি শুধুমাত্র এক্সারসাইজ, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট এবং মিল প্ল্যান এই তিনটিতে ফোকাস করে তাঁর সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন এবং সেটি তিনি সবার সঙ্গে শেয়ার করেছেন অন্যকে অনুপ্রাণিত করার জন্য। এই ক্ষেত্রে ওজন নিয়ন্ত্রণ বিশাল ভূমিকা রাখে। ওজন নিয়ন্ত্রণের কারণে হরমোনের ভারসাম্য হবে, অন্যান্য যে লক্ষণগুলো রয়েছে সেগুলো আস্তে আস্তে কমে আসবে। আনওয়ান্টেড হেয়ার, আনইভেন পিগমেন্টেশন বা ডার্ক প্যাচগুলো শরীরের বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় সেগুলো কমে আসে। সবচেয়ে বড় কথা, ওজন কমার সঙ্গে সঙ্গে তার মনও ভালো হতে শুরু করে, মুড বুস্ট আপে হেল্প হয়।
প্রতিদিন ১০ হাজার স্টেপ হাঁটা এবং আধাঘন্টা ইয়োগার সময় রাখতেই হবে। কারণ এই ১০ হাজার স্টেপ হাঁটা বা এক ঘণ্টা হাঁটলে, প্রথম ৩০ মিনিট এটি তার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে, পরের ৩০ মিনিট তার অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। যারা জিমে যান, তাদের জন্য সেটা খুবই ভালো। আর যারা যেতে পারেন না, তারা নিজের ঘরে হাঁটতে পারেন, ইয়োগা করতে পারেন, লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেন। টিনএজারদের জন্য স্কিপিং, সুইমিং খুব ভালো একটা অপশন। যে যেভাবে ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি করতে পারে সেটাই তাদের জন্য বেশ উপকারী।
খাবার-দাবারের ক্ষেত্রে সুগারি ফুড, কমার্শিয়াল ড্রিংকস, প্যাকড জুস, প্রসেসড ও ক্যানড ফুড – এই খাবারগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। জাংক ফুড বা ফাস্ট ফুডের প্রতি আসক্তি আমাদের ওজন ও সেই সঙ্গে পিসিওএসের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। এ খাবারের পরিবর্তে হেলদি মিল প্ল্যান শুরু করতে হবে। It’s a good start to reduce weight with healthy meal plan. এই ক্ষেত্রে খাবার তালিকায় খাদ্যের প্রতিটি সুষম উপাদান থাকতে হবে। একে আমরা ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস বলি। যেমন: কমপ্লেক্স কার্ব, প্রোটিন, প্রচুর ভিটামিন ও মিনারেল, হেলদি ফ্যাট – এগুলো দিয়ে খাদ্য তালিকা সাজাতে হবে।
কমপ্লেক্স কার্বে ওটস, বাদামী আটার রুটি, বাদামী চাল কাউন; প্রোটিনের মধ্যে প্রাণীজ প্রোটিন, যেমন: বিভিন্ন ধরনের মাছ, ছোট মাছ, তৈলাক্ত বা সামুদ্রিক মাছ যেখানে প্রচুর পরিমাণে ডিএইচএ ও ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড থাকে। এই ক্ষেত্রে স্যালমন, সারদিন যেমন তৈলাক্ত মাছ, তেমনি আমাদের দেশের কই, ইলিশও এই ধরনের মাছ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ‘ডি’-এর অভাবের সঙ্গেও পিসিওএসের সমস্যার একটি সম্পর্ক রয়েছে। টক দই প্রোবায়োটিক ও ভিটামিন ‘ডি’ দেবে। বাদাম ও বীজ, স্বাস্থ্যকর চর্বির ভালো উৎস। গাঢ় সবুজ শাকসবজি, রঙিন মৌসুমি দেশী ফল ভিটামিন ও মিনারেলের প্রধান উৎস। শরীরকে আর্দ্র রাখতে প্রচুর পরিমাণ পানির সঙ্গে পান করতে পারেন গ্রিন টি, আদা চা, লেবু চা, হলুদের চা। এগুলোতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে বায়োফ্লেভোনয়েড।
কিছু খাবার, যেটা আমাদের ফিল গুড হরমোন ডোপামিন, সেরোটোনিনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যেমন: বাদাম, খেজুর, বেরি, স্ট্রবেরি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যুক্ত খাবার। এগুলো স্লিপ ইনডিউসার হিসেবে কাজ করে। কারণ ঘুম ভালো হলে হরমোনের ভারসাম্য ঠিক থাকবে, ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ঘুম কম হলে আমাদের হাঙ্গার হরমোন লেপটিনের পরিমান কমে যায়। লেপটিন হলো, ক্ষুধা কমানোর হরমোন আর গ্রেলিন হচ্ছে ক্ষুধা বাড়ানোর হরমোন। ঘুম কম হলে গ্রেলিনের পরিমান বেড়ে যায়। পিসিওএসের রোগীদের এমনিতেই ঘুম কম হয়, তারপরেও কোনো কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে, একটি সাইকেলের মত কাজ করে এবং ওজন বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।
লেখক: প্রধান চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ; রিজুভা ওয়েলনেস।


