Friday, April 17, 2026
spot_img
Homeঅন্যান্যনারীর ডিমেনসিয়া বেশি হয় কেন?

নারীর ডিমেনসিয়া বেশি হয় কেন?

ডা. হালিদা হানুম আখতার

ডায়াবেটিস সম্পর্কে আমাদের একটি ধারণা রয়েছে যে, এটি একটি রোগ। হ্যাঁ, এটি একটি রোগ। এটি দেহের একটি মেটাবলিক সমস্যা। শুধু রোগ নয়, এর সঙ্গে যে সমস্যা হয়, সেখান থেকে বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই, এটি একটি ক্ষতিকারক রোগ। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর আরেকটি দিক রয়েছে, এটি জনস্বাস্থ্যের একটি রোগ।

কেন এটি বলছি? ডায়াবেটিস বাড়ে-কমে বা হয়, এর কয়েকটি দিক রয়েছে। যেমন, আমার জীবন-যাপনটা কী রকম, আমি ব্যায়াম করছি কি না, আমি খাবারকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রাখছি কি না, আমি অতি মাত্রায় শর্করা খাচ্ছি কি না-এসব বিষয় এই রোগে জরুরি ভূমিকা পালন করে।

আবার এই রোগে একজন ব্যক্তি ও পরিবারের আর্থ সামাজিক অবস্থার ওপরও নির্ভর করে। কারণ, এর সঙ্গে তার ব্যবহারিক দিকটা, তার জীবন অতিবাহিত করার যে বিষয়টি তার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।

তার রোজগার, তার বাসস্থান, তার শিক্ষা, চিকিৎসা করার সামর্থ্য, তার রোজগার, সে পুষ্টিকর খাবার খেতে পারছে কি না, না কি সে অন্য ধরনের খাবার খাচ্ছে। এসব বিষয়ের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।

আরেকটি হলো, অসুখটা হয়েই গেলে এর জন্য যে পরীক্ষা বা নিয়মিত চেকআপ করতে হয়, তার জন্য অর্থের প্রয়োজন। আবার ডায়াবেটিস অন্য অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করলো কি না, এটি বুঝতে হলেও অর্থের দরকার। সেই টাকা ব্যক্তিটির কাছে রয়েছে কি না সেটি বুঝতে হবে। এর ওপর তার ডায়াবেটিসের সার্বিক ব্যবস্থাপনাটা নির্ভর করে। সুতরাং এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়।

কারণ, আমরা দেখেছি, যারা দরিদ্র, তাদের মধ্যে যে অসমতাটা রয়েছে, তা হলো, খাদ্য বা তার চিকিৎসা নেওয়ার অবস্থান যেটি এগুলোর ওপর নির্ভর করে। পাশাপাশি তার শিক্ষার ওপরও নির্ভরশীল। সে শিক্ষিত একটি ব্যক্তি হলে তাকে আমরা সচেতন করতে পারি, যেন সে রোগ নির্ণয় করে আগেই জানতে পারে এবং প্রতিরোধ করতে পারে। এর চিকিৎসার মাধ্যমে অন্য কোনো জটিলতা যেন না হয়, সেই বিষয়টি সে বুঝতে পারবে। সুতরাং এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

কারণ, আমরা দেখেছি যে ডায়াবেটিস শুধু একটি ব্যক্তিকেই আক্রান্ত করে না, তার পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ, এটি যখন একটি ব্যক্তির পরিবারের অর্থটি ধরে টান দেয়, সেটা তার পরিবারের জন্য একটি বিরাট ব্যয়বহুল বিষয়।

আবার অনেক সময় দেখা যায়, তার হার্টে সমস্যা হয়ে গেলো। কারণ, আমরা জানি ডায়াবেটিস হার্টকেও আক্রান্ত করে। অথবা তার চোখ ও কর্নিয়া আক্রান্ত হয়। হয়তো তার কিডনির সমস্যা হয়ে গেলো। তো কোনো কিছু জটিল হয়ে পড়লে, সেটি ঠিকঠাক করা ভীষণ ব্যয়বহুল হয়ে যায়।

যারা অর্থবান তারা ব্যয় করে চিকিৎসা করে ভালো হয়ে যেতে পারে; একটা সমান অবস্থায় আসতে পারে। তবে যারা দরিদ্র, তাদের জন্য এটি একটি বিরাট বিষয় হয়ে যায়। অর্থের অভাবে সম্পূর্ণ চিকিৎসা করা জটিল হয়ে পড়ে। সুতরাং এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

যারা দরিদ্র, তাদের ক্ষেত্রে যে জটিলতা হয়, সেটি হলো, চিকিৎসা না করতে পারলে, এটি দেহের অন্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে, প্রভাবিত করে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিয়ে যায়।

আমরা জানি, ডায়াবেটিস হলে মৃত্যুর আশঙ্কা বেশি থাকে। উন্নত দেশগুলোতে আমরা দেখেছি, ১০ ডলারের মধ্যে এক ডলার ডায়াবেটিসের জন্য ব্যয় হয়। কারণ, এর অনেক জটিলতা হয়ে যায়। এটিও দেখা গেছে যে, ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ব্যয়ভারটা দ্বিগুণ। সুতরাং এটা বিরাট একটি ক্ষয়জনিত রোগ, যেটি পরিবার, ব্যক্তি ও তার আর্থিক অবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সুতরাং এর জন্য আমরা একে বলি, এটি একটি জনস্বাস্থ্য রোগ। তাই এই বিষয়ে জ্ঞান থাকা দরকার। সবাই মিলে এর প্রতিরোধ করা, এটি নির্ণয় করে পরিবারের কারো জন্য যেন ক্ষতিকর না হয়, এরকম একটি ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে ২০১১ থেকে ২০১৭ এর মধ্যে নারী-পুরুষের ডায়াবেটিসের প্রাধান্য বেড়ে গেছে। ছিলো ১১ বা ১২ দশমিক শতাংশ, সেটি বেড়ে গিয়ে ছয় বছরে ১৪ শতাংশ হয়েছে। আরেকটি জিনিস হলো, দশজন নারী পুরুষের মধ্যে ছয়জনই জানে না, তার ডায়াবেটিস রয়েছে কি না। এটি আরো সাংঘাতিক বিষয়। আমি জানলে তো চিকিৎসা করতে পারি। খাবার খাওয়া, ব্যায়ামের মাধ্যমে আমার ডায়াবেটিসকে কমিয়ে রাখতে পারি।

তবে যে জানেই না, অসুস্থ সে কীভাবে নিজেকে প্রতিরোধ করতে পারবে? তো এই অজানা বিষয়টিও তার জন্য বিরাট বড় চিকিৎসার অভাব, জ্ঞানের অভাব, তার শিক্ষা ও অর্থের অভাব, তার সচেতনতার অভাব। এসব কারণে সে রোগটিকে ধরে বসে রয়েছে। অনেকে জানেও না, তার এই রোগটি হয়েছে। এটি স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য দুটোর ক্ষেত্রেই শঙ্কার বিষয়।

আরেকটি জিনিস আমি দেখেছি, নারীর ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসটা একটি বয়সে পুরুষের তুলনায় বেশি হয়। নারী সাধারণত পরিবারের দ্বিতীয় স্থানের ব্যক্তি, তার হাতে পয়সা থাকে না, তার হাতে সময় থাকে না, ঘর-সংসার চালাতে হয়। সে কোন চিকিৎসকের কাছে যাবে, কখন যাবে সেটি সে জানে না। যাওয়ার জন্য যে অর্থের সংকুলান দরকার, সেটিও নেই। এই জন্য চিকিৎসা সেবার আওতায় নারীরা কম আসে। তাই জটিলতা বেশি হয়। এসব কারণে তাদের মৃত্যু বেশি হয়ে থাকে।

সুতরাং নারীর এই রোগটি হলে ভোগান্তিটা বেশি হয়। এই বিষয়টি আমাদের সবারই জানা দরকার। বিশেষ করে নারীদের আরেকটি বিষয় রয়েছে, নারীর মধ্যে শিক্ষার যে অভাব রয়েছে, সেটিও তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে। পুরুষদের মধ্যে আবার দেখা গেছে, যারা বিত্তশালী তাদের ব্যবহারিক দিকের কারণে ডায়াবেটিস বেশি হয়।

সুতরাং নারী-পুরুষের কিছু পার্থক্য রয়েই গেছে, যেটি আমাদের জানা দরকার। এবং আমরা জনস্বাস্থ্য ও সচেতনতা সৃষ্টি করার সময় তথ্য দিলে আমরা দলটিকে আলাদা করতে পারবো। তাহলে, ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও ব্যবস্থা গ্রহণে তাদের আরো বেশি সচেতন করতে পারা যাবে।

সুতরাং ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ হলো, যেখানে আমার জ্ঞান থাকতে হবে; আমাকে সচেতন থাকতে হবে; আমার আর্থ-সামাজিক অবস্থান থাকতে হবে; আমার শিক্ষা থাকতে হবে; এসব মিলিয়ে সচেতনতা থাকলে ডায়াবেটিসকে নিয়ে ভুগতে হবে কম। ডায়াবেটিসকে আমার আওতার মধ্যে রাখতে পারবো। এটি নিয়েই মানুষকে অনেকদিন বাঁচতে হয়। তবে শরীরচর্চা ও সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মধ্য দিয়ে যেতে পারলে ডায়াবেটিস নিয়েও অনেকদিন টিকে থাকা যায়।

এই বিষয়ে আমাদের সবার কর্তব্য হলো, পরিবারের সবাইকে সচেতন করা, যেন ডায়াবেটিস হলে, তারা সঙ্গে সঙ্গে ধরতে পারে।

লেখক : রোকেয়া পদকে ভূষিত বিশিষ্ট নারী ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

সাতকাহন
Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.