Monday, September 21, 2026
spot_img
Home Blog Page 146

রঙিন পাখা

ছবি : আব্দুর রহমান হৃদয়

বাদল গেছে টুটি

ছবি : আব্দুর রহমান হৃদয়

কবিতা : এইসব শোকবার্তা

– কুশল ভৌমিক


এইসব শোকবার্তায় তোমাকে খুঁজি না
এইসব শোকসভা, সেমিনার, উচ্চ স্বরে বাজানো
সংগীতমুখর গণভোজের উৎসবেও না।
পত্রিকার ক্রোড়পত্র, নান্দনিক এলিজি, গাম্ভীর্যময় সম্পাদকীয়, দলিলনির্ভর কলাম কিংবা
হৃদয় তোলপাড় করা করুণ সুরের গানেও না।
চৌকস নেতার বাগাড়ম্বর ভাষণে
লিটল ম্যাগ, পোস্টার ব্যানারে
এইসব পুষ্পার্ঘ্য, অর্ধনমিত পতাকা
মধ্যরাতের টক শো, কোথাও না।
তোমাকে খুঁজি ভিড়ে; অজস্র মানুষের ভিড়ে
মনে হয়, এই তো সামনে এসে দাঁড়াবেন
সফেদ পাঞ্জাবি পরা সৌম্যকান্তি এক দেবদূত
পরম মমতায় কাঁধে রাখবেন হাত
বলবেন-
ভয় নেই,অন্ধকারেই ঘটে স্বপ্নের অঙ্কুরোদ্গম।
মনে হয়, এই তো সাধারণ কোনো জমায়েত থেকে
উঠে আসবে অসাধারণ এক তর্জনী
বলবে-
কীসের এত দ্বিধা?
মনে নেই এক তর্জনীতেই এসেছিল স্বাধীনতা।
প্রিয়তম পিতা,
উৎসবে নয়, তোমাকে খুঁজি আকাঙ্ক্ষায়
আত্মসমর্পণের নতজানু রাষ্ট্রনীতিতে নয়
৭ মার্চের মহাকাব্যিক উচ্চারণে
মুষ্টিবদ্ধ হাতে, প্রদীপ্ত স্লোগানে।
মনে হয়, এই তো বন্ধ জানালা খুলে
কেউ একজন বাড়িয়ে দিচ্ছে হাত
মুখে তার খেটে খাওয়া মানুষের নির্ভেজাল হাসি
গায়ে সোঁদামাটির গন্ধ, চোখে অবাক সূর্যোদয়।
এইসব শোক উৎসবে তোমাকে দেখি না পিতা
বরং পলেস্তরা খসে গেলে প্রেতাত্মা দর্শনে চমকে উঠি
ফুলের বাগানে কী যত্নে বাড়ছে কালসাপ
ফুলের বাগানে কী যত্নে বাড়ছে কালসাপ!

দুষ্টু-মিষ্টি

মায়াভরা চোখের দুষ্টু-মিষ্টি চাহনী। ছবি : তুলেছেন আব্দুর রহমান হৃদয়।

শৈশব

কানামাছি, এক্কা-দোক্কা, হাডুডু, গোল্লাছুটে মেতে কেটে যায় বাঙালির শৈশব। শৈশবের দুরন্ত কিছু মুহূর্তকে ক্যামেরাবন্দী করেছেন আব্দুর রহমান হৃদয়।

গল্প : প্রেমিকার বিয়েতে নিমন্ত্রণ

ইমন চৌধুরী

কাল নাদিয়ার বিয়ে। আজ গায়ে হলুদ। নাদিয়া আমার প্রেমিকা। মানে প্রাক্তন প্রেমিকা। একসময় ছিল। এখন আর নেই। আমাদের সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে চুকে-বুকে গেছে। আমরা আমাদের এই পরিণতির জন্য কেউ কাউকে অভিযুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মজার ব্যাপার, নাদিয়া আমাকে তার বিয়েতে নিমন্ত্রণ করেছে। দিন সাতেক আগে দেখা করে নিজ হাতে কার্ড দিয়ে গেছে। আমি কার্ডটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম শব্দহীন। নাদিয়াও নিশ্চুপ ছিল সে সময়। তাকিয়ে ছিল রাস্তার দিকে। টিএসসির সামনের রাস্তায় বসেছিলাম আমরা। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। শহরের বাতিগুলো জ্বলে উঠছিল একের পর এক। অনেকক্ষণ পর মুখ খুলেছিল নাদিয়া, ‘যদি সম্ভব হয় এসো বিয়েতে। আমার ভালো লাগবে। তুমি তো খুব প্র্যাকটিক্যাল। আসতেই পারো।’
‘হুম, দেখি, সময় পেলে আসতেও পারি।’ আমি গম্ভীর মুখে জবাব দিয়েছিলাম।
‘সময় পেলে! তার মানে নাও আসতে পারো, এই তো?’
‘যদি হঠাৎ কাজ পড়ে যায়, কিছু তো করার নেই।’
‘হুম, তা অবশ্য ঠিক। আচ্ছা তোমার নীল পাঞ্জাবিটা আছে তো?’
‘আছে।’
‘অনেক দিন হলো পরো না। এলে পাঞ্জাবিটা পরে এসো। তোমাকে নীল পাঞ্জাবিতে ভালো দেখায়।’
নাদিয়ার কথা শুনে আমার হাসি পেয়েছিল। আজকাল হাসি খুব কম পায়।
‘হাসছো যে?’
‘এমনি।’
‘একটা কথা রাখবে?’
‘বলো।’
‘যদি আমার বিয়েতে আসো তবে প্লিজ কোনো গিফট আনবে না সঙ্গে।’
‘কেন?’
‘এমনি।’
আমার ধারণা, আমি নাদিয়াকে মোটামুটি বুঝতে পারি। দীর্ঘ চার বছর আমরা প্রেম করেছি। ঝরে পড়া একটি দেবদারুর পাতা হাতে তুলে নিতে নিতে বলেছিলাম, ‘চিন্তা করো না। একটা গিফট কিনতে আর কত টাকা লাগবে? বেশি দামি গিফট তো দিতে পারব না। আমার সাধ্যের মধ্যেই দেবো।’
শুনে নাদিয়া চুপ হয়ে গিয়েছিল। আমার কথাও যেন ফুরিয়ে এসেছিল। বুকের ভেতর শূন্য শূন্য লাগছিল সে সময়। ঝুপ করে চারদিকে নেমে এসেছিল পোড়া মবিলের মতো সন্ধ্যার নিবিড়, ঘন অন্ধকার। এমন নিবিড়, ঘন কত সন্ধ্যা আমরা কাটিয়েছি একসঙ্গে। কখনও আমার একটা হাত টেনে নিয়ে নিজের কোলের ওপর রেখেছে নাদিয়া। কখনও আমি টেনে এনেছি নাদিয়ার শুভ্র দুটি হাত। তারপর আমাদের আঙুলগুলো অস্থির হয়ে উঠত ভালোবাসার গভীর স্পর্শে। সেসব এখন কেবলই স্মৃতি। অতীতকাল।
আমি বুঝতে পারছিলাম, আমাদের একসঙ্গে কাটানো শেষ সন্ধ্যা হতে যাচ্ছে এটি। প্যান্টের পকেটে হঠাৎ মুঠোফোনটা চেঁচিয়ে উঠেছিল। একবার, দু’বার। রিসিভ করতে ইচ্ছে করছিল না আমার।
‘ফোনটা ধরো।’ ধমকের সুরে বলেছিল নাদিয়া। আমাকে ধমক দেওয়ার অধিকার কি এখনো আছে নাদিয়ার? থাকার কথা নয়। আমি নিরস কণ্ঠে জবাব দিয়েছিলাম, ইচ্ছে করছে না।’
‘আজব তো! ফোন ধরবে না কেন? জরুরি ফোনও তো হতে পারে। নাকি বিশেষ কারও ফোন! আমার সামনে রিসিভ করতে অসুবিধা হচ্ছে?’ বলতে বলতে সন্দেহের চোখে তাকিয়েছিল নাদিয়া।
মেয়েদের বোঝা খুব কঠিন। মেয়েরা সন্ধ্যার আলো-আঁধারির মতো রহস্যময়। খানিকটা আলো, খানিকটা অন্ধকার মিলেমিশে একাকার। বোঝা যায় না, পড়া যায় না। ছেলেরা দিনের আলোর মতো। সবটুকু দেখা যায়। পড়াও যায় দিব্যি। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে আবারও মুখ খুলেছিল নাদিয়া, ‘অসুবিধা নেই, বিশেষ কারও হলেও ধরতে পারো আমার সামনে। তোমার জীবনে এখন যে কেউ আসতে পারে। আমার বাধা দেওয়ার কোনো অধিকার নেই এখন আর।’
‘চা খাবে?’ প্রসঙ্গ বদলাতে চেয়ে বলেছিলাম আমি।
‘খাওয়া যায়। লেবু চা।’
‘আমি জানি।’ পাশেই টিএসসির ভাসমান চায়ের দোকানে দু’কাপ লাল চায়ের নির্দেশ দিয়ে আবারও আলোচনায় ডুব দিয়েছিলাম আমরা। নাদিয়া হঠাৎ আমার ডান হাতটা চেপে ধরেছিল আমাকে খানিকটা অবাক করে দিয়ে। আর্দ্র কণ্ঠে বলেছিল, ‘আমার ওপর কোনো অভিমান রেখো না, প্লিজ।’
‘কী বলছ! অভিমান রাখতে যাব কেন? আমরা দুজন অনেক ভেবেই ব্রেকআপের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের সামনে তো অন্য কোনো রাস্তা খোলা নেই। তুমিও অনেক সময় দিয়েছ আমাকে। কিন্তু কত দিন অপেক্ষা করবে। আমার জীবন একটা অনিশ্চয়তার জীবন। মাথার ওপর বাবার ছায়া নেই, চাকরি নেই, এই শহরে থাকার স্থায়ী কোনো ঠিকানা নেই- এই অনিশ্চয়তার মধ্যে তুমি কেন নিজেকে জড়াবে! এর মধ্যে তুমি অনেকগুলো বিয়ের প্রস্তাব ঠেকিয়ে দিয়েছ। কিন্তু আর কত? আমার কোনো অভিমান নেই। আমি বাস্তবতাটা বুঝতে পারছি। আমি ব্যর্থ হয়েছি। আমরা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বুঝেশুনেই নিয়েছি। আমাদের দুজনের ভালোর জন্যই নিয়েছি।’
‘তবুও!’
‘মনের মধ্যে কোনো দ্বিধা রেখো না। দেড় বছর সময় তো কম না। তোমার দেওয়া এই সময়টুকু আমি কাজে লাগাতে পারিনি। চেষ্টা অবশ্য কম করিনি। কিন্তু হয়নি। আমার বড় কোনো আত্মীয়স্বজনও নেই যে সুপারিশ করবে। রেজাল্টও ব্রিলিয়ান্ট কিছু হয়নি। কল সেন্টার, মার্কেটিং-এসব জায়গায়ও চাকরি করে দেখেছি। যে বেতন ওরা দিতে চায়, তাতে আমার একারই হয় না। তাই ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। অথচ তোমার জন্য একের পর এক ভালো ভালো প্রস্তাব আসছে। তোমার জায়গায় আমি হলেও একই কাজ করতাম। আমরা তো স্কুল-কলেজে পড়ি না। আমার মনে হয়, আমরা সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছি।’
সন্ধ্যার অন্ধকার তীব্র থেকে আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল ততক্ষণে। আমরা পাশাপাশি বসেছিলাম আরও বেশ কিছুক্ষণ সময়। একসময় বিদায় নিয়েছিল নাদিয়া। শেষবারের মতো। পাখির মতো রেখে গিয়েছিল স্মৃতির পালক। নাদিয়ার বিয়ের কার্ডটি হাতে নিয়ে আমি দাঁড়িয়েছিলাম প্রাণহীন জড় পদার্থের মতো। নির্বাক।

আমার কি নাদিয়ার বিয়েতে যাওয়া উচিত! গত সাত দিন ধরে অনেক ভেবেছি। তবুও ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আমি নাদিয়ার বিয়ের কার্ডটি নেড়েচেড়ে দেখি। বর ও কনের নাম পড়ি বারবার। গত সাত দিন ধরে কতবার যে পড়েছি ও দেখেছি, তার হিসাব নেই। বেশ সুন্দর কার্ড। বেশ দামিও।
আচ্ছা, বিয়েতে গেলেই বা এমন কী হবে! কেউ তো আমাকে চিনতে পারবে না। চুপচাপ খেয়ে চলে আসব। দূর থেকে নাদিয়াকে একবার দেখব। বউ সাজলে ওকে কেমন দেখায়, সেটাও দেখা হয়ে যাবে। প্রেমিকার বিয়েতে নিমন্ত্রণ! একটা নতুন অভিজ্ঞতাও হবে। একটু কি কষ্ট হবে! হতে পারে। হলে হবে। অনেক বড় বড় কষ্টও তো এই এক জীবনে হজম করে ফেলেছি। না হয় কষ্টের সংখ্যা আরেকটি বাড়বে।

পরদিন সন্ধ্যায় অনেক ভেবে নীল পাঞ্জাবিটা গায়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ি নাদিয়ার বিয়ে খেতে। রামপুরার একটি কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠান। আমার হাজির হতে খানিকটা দেরি হয়ে গেল। এর মধ্যে ভোজন পর্ব শুরু হয়ে গেছে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, জীবনের এই নতুন অভিজ্ঞতা আমি খুব স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করব। পেট ভরে খাবো। ঘুরে ঘুরে দেখব বিয়ের আয়োজন। নাদিয়ার বরকেও একবার দেখার ইচ্ছে আছে। সঙ্গে নাদিয়াকেও। একসময় বউয়ের সাজে ওকে দেখার খুব স্বপ্ন দেখতাম। এখন দেখি না। অর্থহীন স্বপ্ন দেখে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। তবুও যখন এসে পড়েছি, বউয়ের সাজে নাদিয়াকে একবার দেখেই যাই।
তার আগে খাবারটা সেরে নেওয়া যাক। মোটামুটি বড় আয়োজনই করেছেন নাদিয়ার সরকারি কর্মকর্তা বাবা মশিউর রহমান। প্রচুর অতিথি। চারদিকে গিজগিজ করছে জমকালো পোশাক আর ভারী মেকআপে ঢাকা নারীরা। তরুণ ও তরুণীরা। এখানে কেউ আমাকে চিনে না। আমিও কাউকে চিনি না। আমাকে যে চেনে সে আজ এই আয়োজনের মধ্যমণি। তার আজ অনেক ব্যস্ততা। অতিথিরা খাওয়ার জন্য বসে পড়েছেন। আমি ফাঁকা চেয়ার খুঁজতে থাকি। একপাশে মোটামুটি একটা ফাঁকা টেবিল পেয়ে টুপ করে বসে পড়ি। ততক্ষণে হইহই করে আমার পেছনে এসে দাঁড়ায় কয়েকজন তরুণ-তরুণী। ছয়জনের টেবিলটিতে আগে থেকেই দুজন বসা ছিল। আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরও চারজন। ওরা একসঙ্গে বসতে চায়। আমি বেরসিকের মতো ওদের মাঝখানে বসে পড়েছি। বিষয়টা বুঝতে পারছিলাম আমি। আমার কি এখন উঠে যাওয়া উচিত? আমার ভাবনায় ছেদ পড়ে পাশে বসা তরুণীর সুরেলা কণ্ঠে, ‘কিছু মনে করবেন না, প্লিজ। আমরা আসলে একসঙ্গে বসতে চাচ্ছিলাম। আপনি যদি পাশের টেবিলে বসতেন।’
এরপরও বসে থাকাটা শোভন দেখায় না। আমি সম্মতির হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে উঠে পড়ি। কিন্তু ততক্ষণে পাশের টেবিলসহ সব টেবিল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। কোনো ফাঁকা চেয়ার খুঁজে না পেয়ে দ্বিতীয় পর্বের জন্য একপাশে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। মিনিট পাঁচেক বাদেই অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করল নাদিয়া। বিয়ের সাজে ওকে আজ অন্য রকম লাগছে। উদ্ধত রাজহংসীর মতো। সদ্য ফোটা ফুলের মতো। এই নাদিয়া আমার অচেনা। আমি খানিকটা আড়ালে চলে যাই। কিছুতেই যেন আমাকে দেখতে না পায় নাদিয়া। আমার কি একটু কষ্ট হচ্ছে! বুকের ভেতর একটু চিনচিনে ব্যথা! একটা শূন্যতার ভেতর কি আমি তলিয়ে যাচ্ছি! আচ্ছা, নাদিয়ার কি আমার জন্য কষ্ট হচ্ছে! ওকে দেখে তো তা মনে হচ্ছে না। নাদিয়া হাসছে, কথা বলছে, ছবি তুলছে। সবকিছুই স্বাভাবিক। তবে আমি কেন কষ্ট পাব! কেন! আমি নাদিয়ার কাছ থেকে দূরে সরতে সরতে ওর দৃষ্টির সম্পূর্ণ আড়ালে চলে যাই।
এর মধ্যে প্রথম পর্বের খাবার শেষ। দ্বিতীয় পর্বে অংশ নিতে সবাই চেয়ার দখল করছে। আমি বরাবরই বাস্তববাদী মানুষ। তাই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে দ্বিতীয় পর্বের খাবারের প্রতি নিতে শুরু করি। এবার সবার শেষের দিকে একটি সম্পূর্ণ ফাঁকা টেবিলে গিয়ে বসে পড়ি। একসঙ্গে বারোজনের খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এই টেবিলে। হঠাৎ একটা শোরগোল। একজন লোককে জটলা করে ঘিরে ধরেছেন অনেকে। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দেখার চেষ্টা করি। দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এসেছেন। দেখে চিনতে অসুবিধা হলো না আমার। নাদিয়ার মুখে কয়েকবার শুনেছি। এই মন্ত্রী সম্পর্কে নাদিয়ার মামা হন। নাদিয়ার মায়ের খালাতো ভাই। বিয়ের অনুষ্ঠানে মন্ত্রীর আগমন। বিরাট ব্যাপার! আমি যেন আরও গুটিয়ে যাই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও চেয়ারে বসে পড়ি। খাবো কি খাবো না ভাবতে থাকি। এর মধ্যে বয় গোছের একজন দৌড়ে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এখানে মন্ত্রী স্যার বসবেন তার লোকজন নিয়ে। প্লিজ স্যার, কিছু মনে করবেন না, কষ্ট করে আপনি অন্য কোনো টেবিলে বসুন।’ বয়-এর মুখে মন্ত্রীমশাইও স্যার, আমিও স্যার। এত বিষাদ, এত অপমানের মধ্যেও খানিকটা সুখ অনুভব করলাম।
সত্যি বলতে কি, মন্ত্রী মশাইকে দেখে আমি এ রকমই আশঙ্কা করছিলাম। আশপাশে সব টেবিল ঘিরে লোকজন বসার পরও এই টেবিলটা কেন ফাঁকা রাখা হয়েছে বুঝতে অসুবিধা হলো না আর। আমি আবারও মাথা নেড়ে উঠে পড়ি। আশপাশের টেবিল ততক্ষণে পূর্ণ হয়ে গেছে। একজন আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে মন্ত্রীর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছে। আমার আজ অপমানিত হওয়ার দিন। আমার চিন্তাশক্তি এর মধ্যে লোপ পেয়ে গেছে। দ্বিতীয় পর্বের খাবারও হাতছাড়া হয়ে গেল। দ্বিতীয় পর্বই যদি খাবারের শেষ পর্ব হয়, তাহলে আজ আর আশা নেই।
এত অনিশ্চয়তা নিয়ে থাকা যায় না। আমি ধীরে ধীরে নাদিয়ার বিয়ের আসর থেকে বেরিয়ে আসি। ব্যস্ত সড়ক ধরে হাঁটতে থাকি ক্রমাগত। একবার মনে হলো, হাঁটতে হাঁটতে এই জনপদ পেরিয়ে চলে যাই দূরে কোথাও।
প্রায় মিনিট বিশেক হাঁটার পর পায়ের জোর খানিকটা কমে এলো। কিছুটা ক্লান্তি ভর করল শরীরে। এতক্ষণে পেটের ক্ষিধেটাও টের পেলাম। ভেবেছিলাম, নাদিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠানে এসে পেট ভরে রাতের খাবারটা সেরে নেব। সে আর হলো না। রাস্তার পাশে একটা সস্তা খাবার হোটেলে ঢুকে পড়ি। হোটেলে খদ্দের বেশি নেই। একজন অটোরিকশা চালক চেয়ারে এক পা তুলে আয়েশি কায়দায় বসে খাচ্ছেন। আমি তার পেছনের বেঞ্চিতে বসে পড়লাম টুপ করে। একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা এসে সামনে দাঁড়ালেন। চারদিকে তাকিয়ে পরিবেশটা বোঝার চেষ্টা করি আমি। স্যাঁতসেঁতে দেয়াল। নড়বড়ে টেবিল, সঙ্গে টানা বেঞ্চ। আমার ডান পাশেই আরেকটা ছোট বেঞ্চে বসে আছে ক্লান্ত এক কিশোরী। বয়স তেরো কি চৌদ্দ হবে। পনেরোও হতে পারে। মনে হচ্ছে হোটেলের কর্মচারী। মধ্যবয়স্ক মহিলাটির মেয়েও হতে পারে। আমি মহিলার দিকে দৃষ্টি স্থির করে বললাম, ‘ভাত।’
একটা আটপৌর প্লেটে আমার খাবার হাজির হলো। সঙ্গে ছোট একটা বাটিতে এক টুকরো রুই মাছ। আমি গোগ্রাসে গিলতে গিলতে নাদিয়ার কথা ভাবি। এতক্ষণে কি বিয়ে হয়ে গেছে নাদিয়ার? হয়ে যাওয়ারই কথা। হঠাৎ চোখ পড়ল, সামনে বসা ক্যাশিয়ারের ওপর। বয়স্ক একজন লোক। ক্ষয়ে যাওয়া শরীর। ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন রাস্তার দিকে। হঠাৎ খেয়াল হলো, লোকটার একটা হাত নেই। এক হাতেই দিব্যি চালিয়ে দিচ্ছেন জীবনটা। আরেকটা ছোট বাটিতে বুড়িগঙ্গার ঘোলা পানির মতো একটুখানি ডাল নিয়ে আবারও আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন মহিলা। আমি কৌতূহল দমাতে না পেরে জানতে চাইলাম, ‘উনি কে হন আপনার?’
‘আমার স্বামী।’
‘কী হয়েছিল উনার? হাতটা কীভাবে গেল?’
‘চামড়ার কারখানায় কাম করত। মেশিনে কাটা পড়ছে।’ কেমন নির্বিকার শোনায় মহিলার কণ্ঠ। যেন মেশিনে হাত কাটা পড়াটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার!
‘হুম, আপনাদের বিয়েটা কীভাবে হলো?’ আমাকে যেন হঠাৎ গল্পের নেশায় পেয়ে বসল।
‘আমি উনাগো মেসে ভাত রানতাম। একসঙ্গে অনেকজন থাকতেন। হঠাৎ মানুষটার হাত কাটা পড়ল কারখানায় কাম করতে গিয়া। কেমন অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকত। দেখে খুব খারাপ লাগত!’ মহিলা চুপ হয়ে গেলেন। আমি চমকে উঠে বললাম, ‘তার মানে উনার হাত কাটা যাওয়ার পর আপনাদের বিয়ে হয়েছে!’
‘হ রে বাপ!’
‘কী আশ্চর্য! একটা হাত নাই দেখেও বিয়ে করে ফেললেন!’ আমার বিস্ময় কিছুতেই কাটতে চায় না।
‘মানুষটার মনটা খুব ভালা। দেখে মায়া পইড়া গেছিল।’
আমি চুপ হয়ে যাই হঠাৎ। আমার আর কিছু জানতে ইচ্ছে করে না। আমার তো দুইটা হাতই ছিল। কই, নাদিয়ার তো তবু মায়া হয়নি আমার জন্য! না হয় বেকারই ছিলাম। না হয় চলার মতো একটা চাকরি জুটিয়ে নিতে আরও দু-এক বছর লাগত! একজন মানুষ তো চিরকাল বেকার থাকে না। আর কয়েকটা দিন কি লড়াইটা চালিয়ে যেত পারত না নাদিয়া! আর কয়েকটা দিন। কিংবা বলতে পারত না, চলো আমরা বিয়ে করে ফেলি! নাদিয়ার পিছুটান দেখেই তো আমাকে ভালোবাসার দাবি ছেড়ে দিতে হলো।
নাহ, আমার এই অভিমান এখন অর্থহীন। খাবার সেরে আমি উঠে পড়ি। বিল দিতে গিয়ে পাঞ্জাবির পকেটে হাত চালাতেই টাকার সঙ্গে বেরিয়ে এলো একজোড়া রুপার নূপুর। পায়ে নূপুর পরতে খুব পছন্দ করে নাদিয়া। ওর বিয়েতে উপহার দেবো বলে কিনেছিলাম। দিতে ভুলে গেছি। খাবারের বিল মেটাতে মেটাতে মধ্যবয়স্ক মহিলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ক্লান্ত কিশোরীকে কাছে ডাকলাম। গুটি গুটি পায়ে মেয়েটা কাছে আসতেই নূপুর জোড়া তুলে দিলাম ওর হাতে। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে হাতের তালুতে নিয়ে নূপুরজোড়া দেখতে থাকে মেয়েটি। ধীরে ধীরে লাজুক হাসি ফুটে ওঠে ওর ঠোঁটের কোণে। আমি আর দাঁড়াই না। রাত হয়েছে অনেক। আমাকে মেসে ফিরতে হবে।


সহজ উপায়ে জর্দা তৈরির রেসিপি

ফিচার ডেস্ক
বিয়েবাড়ি কিংবা বিশেষ দাওয়াতে গেলে খাওয়ার শেষ পাতে যে খাবারটি দেওয়া হয়, সেটি হলো জর্দা। আবার অনেকে একে ‘জর্দা পোলাও’ও বলে থাকেন। ‘জর্দা পোলাও’ ফারসি ভাষায় ‘জারদ’ শব্দ থেকে উদ্ভূত বলে জানা যায়। যার আক্ষরিক অর্থ হলুদ এবং এই খাবারটির রংও কমলা-হলুদ বর্ণের। কথিত রয়েছে, মোগলরা এই বিশেষ খাবারকে ভারতীয় উপমহাদেশে নিয়ে এসেছিল। প্রকৃতপক্ষে আইন-ই-আকবরি, অর্থাৎ সম্্রাট আকবরের জীবনীতেও ‘জারদ বিরঞ্জ’ সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে, যা আসলে জর্দা পোলাওয়ের প্রথম দিকের সংস্করণ। আজকে আপনাদের জন্য রইল সবচেয়ে সহজ উপায়ে জর্দা তৈরির রেসিপি।

উপকরণ :
# ১ কাপ পোলাওয়ের চাল
# ২ কাপ পানি
# ১ দশমিক ৫ টেবিল চামচ ঘি
# ১টি বড় তেজপাতা
# ৪টি এলাচ
# ২টি দারুচিনি
# ৪টি লবঙ্গ
# ১ টেবিল চামচ কিশমিশ
# ১ টেবিল চামচ কাজুবাদাম কুচি
# ১ টেবিল চামচ পেস্তাবাদাম কুচি
# ৩ টেবিল চামচ চিনি (মিষ্টি বেশি খেলে বেশি দিতে পারেন)
# ১/২ চা চামচ জর্দার রং
# ২ টেবিল চামচ গুঁড়া দুধ
# ১/৪ চা চামচ কেওড়াজল/ গোলাপজল

প্রস্তুত প্রণালি :
প্রথমে একটি পাত্রে এক টেবিল চামচ ঘি দিয়ে গরম করুন। এর মধ্যে তেজপাতা, লবঙ্গ, এলাচি, দারুচিনি দিয়ে হালকা ভেজে নিন। এরপর ধুয়ে রাখা পোলাওয়ের চাল এর মধ্যে দিয়ে ভালোমতো ভেজে নিন। এবার দুই কাপ পানিতে জর্দার রং মিশিয়ে ভাজা চালের মধ্য দিয়ে ঢাকনাসহ মিডিয়াম আঁচে বসিয়ে দিন।
চাল প্রায় সেদ্ধ হয়ে এলে এ পর্যায়ে চিনি মিশিয়ে ঢেকে দিয়ে তাওয়ার ওপর দমে বসিয়ে দিন। চাল পুরো সেদ্ধ হয়ে গেলে এতে গুঁড়া দুধ মিশিয়ে দিন এবং সেইসঙ্গে কেওড়াজল। অন্য একটি ফ্রাইপেনে বা কড়াইয়ে আধা টেবিল চামচ ঘি দিয়ে তার মধ্যে কিশমিশ, কাজুবাদাম ও পেস্তাবাদাম ভেজে নিয়ে জর্দার ওপর ছড়িয়ে দিন। এরপর আপনার পছন্দসই বাটিতে পরিবেশন করুন। আকর্ষণীয় করতে এর মধ্যে আপনি দোকান থেকে কিনে আনা ছোট ছোট মিষ্টি দিয়েও পরিবেশন করতে পারেন।
আজই বাসায় রান্না করে সবাইকে দুপুর কিংবা রাতের খাবারের পর পরিবেশন করুন সবচেয়ে সহজ উপায়ে তৈরি সুস্বাদু এই জর্দার রেসিপি।
সৌজন্যে : ফামি’স কিচেন

গর্ভাবস্থায় রসুন কতটা নিরাপদ?

-অনন্যা চৈতী
সৃষ্টির শুরু থেকে রান্নার অন্যতম মসলা হিসেবে রসুনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রাচীন মিসরে রান্না ও চিকিৎসার অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতো এই রসুন।
এটি সাধারণত সর্দি-জ্বর প্রতিরোধে করতে এবং অবরুদ্ধ ধমনিগুলো পরিষ্কার করে হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে বলেই আমরা জানি। শুধু ঠাণ্ডাজনিত সমস্যায় নয়, বর্তমানে গর্ভাবস্থায়ও রসুন অনেক উপকারী ভূমিকা পালন করে বলে জানা গেছে। ভারতীয় ওয়েবসাইট টাইমস অব ইন্ডিয়া প্রকাশ করেছে এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন।

গর্ভাবস্থায় রসুন খাওয়ার উপকারিতা
গর্ভাবস্থা একজন নারীর জীবনের বিশেষ একটি মুহূর্ত। নারীর ভেতরে বড় হচ্ছে একটি নতুন জীবন। তাই এ সময় বাড়তি সাবধানতা জরুরি।
# রসুন একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান। এটি শরীরে পুষ্টি, ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করে। এটি শরীরে রক্তপ্রবাহকে স্বাভাবিক করে তোলে এবং হরমোনের কার্যকারিতায় ভারসাম্য রক্ষা করে। রসুন রোগ প্রতিরোধক হিসেবেও বিভিন্ন জীবাণু ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে থাকে।
# গর্ভাবস্থায় অনেকেরই উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে রসুন খুব উপকারী ভূমিকা পালন করে থাকে।
# গর্ভাবস্থায় রসুন খাওয়ার কারণে হজমশক্তি বাড়ে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর হয়। পাশাপাশি পরিপাকতন্ত্রের নানা জটিলতাও দূর হয়।
# সাধারণ সময় তো বটেই, গর্ভাবস্থায়ও অনেকের মুখে ব্রণ দেখা যায়। মুখের ব্রণের দাগ দূর করতে রসুন ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
# গর্ভাকালীন অনেকেরই ক্ষুধামান্দ্য ভাব দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রসুন খেলে পরিত্রাণ মিলবে এই সমস্যা থেকে।
# চুল ঝরে পড়ছে, এমন অভিযোগ পাওয়া যাবে প্রায় সব নারীর কাছ থেকেই। আর গর্ভকালীন এটি তো অন্যতম একটি সমস্যা। আমরা সবাই চুলের জন্য পেঁয়াজের বিস্ময়কর উপকারী গুণ সম্পর্কে জানি। তবে এর ভাই রসুনও তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। চুল পড়া রোধ করতে রসুনের রস মাথার স্ক্যাল্পে ব্যবহার করা যায়। আবার রসুনের রস মিশ্রিত নারিকেল তেল গরম করে চুলে দিলেও চুল পড়া কমবে।

গর্ভাবস্থায় রসুন খেলে কী ঘটে?
রসুন একটি প্রাকৃতিক প্রতিষেধক। সে ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস রসুন খাওয়া নিরাপদ। তবে শেষের তিন মাস খাবারের তালিকায় রসুন অন্তর্ভুক্ত করার সময় অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, এই সময়ে অতিরিক্ত রসুন খাওয়া রক্তচাপের স্তরকে কমিয়ে দিতে পারে এবং রক্তকে পাতলা করতে পারে। এ ছাড়া রসুন খাওয়ার কারণে বমির সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। যাদের অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে, তাদের রসুন খাওয়া থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। সুতরাং, শেষের এই তিন মাস রসুন গ্রহণ সম্পর্কে একজন গর্ভবতী নারী তার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে পারেন।

লকডাউনে শিশু অস্থির? গঠনমূলকভাবে সময় কাটানোর উপায়

-অনন্যা চৈতী

দেশজুড়ে চলছে করোনা আতঙ্ক। বন্ধ রয়েছে স্কুল-কলেজ, এমনকি স্থগিত হয়ে রয়েছে এইচএসসি পরীক্ষাও। লকডাউন চলছে প্রায় অনেক এলাকাতেই। এ পরিস্থিতিতে ঘরের বাইরে যেতে পারছে না শিশুরা। এতে তাদের ঘরের ভেতরে সুস্থ রাখাটা এখন মা-বাবার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ ।

লকডাউনে শিশু কীভাবে গঠনমূলক পদ্ধতিতে সময় কাটাবে এবং এ ক্ষেত্রে মা-বাবার ভূমিকা কী হতে পারে, সে বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সংগঠনের আজীবন সদস্য ও সাইকোলজিস্ট ফারজানা ফাতেমা রুমির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘লকডাউনের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে শিশুরা। যেসব শিশু প্রতিদিন স্কুলে যেত, বাইরে খেলতে যেত, তারা এখন ঘরবন্দি। যেতে পারছে না পাশের বাড়ির বন্ধুর সঙ্গে খেলতেও। এ সবকিছুই তার ছোট্ট মনে প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া ঘরে বসেই চলছে অনলাইন ক্লাস এবং মা-বাবার হোম অফিস। সব মিলিয়ে মা-বাবার জীবনেও শুরু হয়েছে নতুন এক অধ্যায়।’

লকডাউনে শিশুর অস্থিরতা কমাতে এবং গঠনমূলকভাবে সময় কাটাতে মা-বাবার ভূমিকা সম্পর্কে সাইকোলজিস্ট রুমির পরামর্শগুলো হলো :


# মা-বাবা হিসেবে সবার আগে অবশ্যই করোনাভাইরাস সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে হবে সন্তানকে। এর ভয়াবহতা এবং কেন আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরে আছি, সে সম্পর্কে জানাতে হবে। যারা অসুস্থ এবং যারা আমাদের যতœ নিচ্ছে, এমন ব্যক্তি ও পেশার মানুষের গল্পগুলো বলুন। শিশুকে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখাতে হবে।

#সব বন্ধ হওয়ার কারণে প্রতিদিনের নিয়মিত রুটিন এলোমেলো হলে শিশুর বায়োলজিক্যাল ক্লকে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তাই সারা দিনের কাজের তালিকা লিখে দেয়ালে লাগিয়ে দিলে শিশু নিজেই বিষয়টি বুঝতে পারবে এবং মেনে চলতে পারবে।
# করোনার সময়ে শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হলো, তারা বাড়িতে মা-বাবা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের দীর্ঘ সময় কাছে পাচ্ছে। বড়দের কাছ থেকে পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পর্কে জানার সুযোগ হচ্ছে। এটি শিশুর ভাষা, আবেগীয় ও সামাজিক মনোবিকাশ লাভে সহায়ক। তবে আপনার সন্তানের বয়স এবং বোঝার ক্ষমতা সম্পর্কে ভেবে তার সঙ্গে সে অনুযায়ী কথা বলতে হবে।
# শিশুকে নির্দ্বিধায় কথা বলা এবং প্রশ্ন করার অনুমতি দিন। সব সময় তাদের প্রশ্নের সত্যি ও সঠিক উত্তর দিন।
# করোনা সম্পর্কে আপনার শিশু ভীত বা বিভ্রান্ত হতে পারে। সে কেমন অনুভব করছে, তা বোঝার জন্য তাকে সময় দিন এবং আপনি তার সঙ্গেই আছেন, এটা তাকে নিশ্চিত করুন।

# ছোট শিশুটির সঙ্গে মজা করে বাটি ও চামচ দিয়ে টুং-টাং শব্দ করে গানের তালে নাচ করা, ছড়া বলা, গল্পের বই পড়া, ছবির বই দেখানো ইত্যাদি করতে পারেন। সে নিজে পড়তে পারলে বলুন, ‘আজকে আমরা কোন গল্পটা শুনব?’ তাকে নিয়ে বাচ্চাদের জন্য তৈরি মুভিও দেখতে পারেন।
# নতুন কিছু শেখার সুযোগ করে দিতে পারেন। ক্রেয়ন বা পেনসিল দিয়ে ছবি আঁকা, রঙিন কাগজ দিয়ে ক্রাফটিং, অরিগামি, কাঠের ব্লক দিয়ে বাড়ি বানানো, পাজেল মেলানো, লুডু, শব্দ জব্দ খেলা, দাবা খেলা এভাবেও তার সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন।
# শিশুকে এ সময় ঘরের টুকটাক কাজে সহযোগিতা করতে বলতে পারেন। এতে তার ভেতর দায়িত্ববোধ বাড়বে। যেমন-ঘর পরিষ্কার করা, গাছে পানি দেওয়া, তার বই-খাতা গুছিয়ে রাখা ইত্যাদি।
# কিশোর-কিশোরীদের পছন্দের বিষয় যেমন, খেলাধুলা, গান, সেলিব্রেটি, বন্ধু ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতে পারেন। একসঙ্গে পছন্দসই খাবার রান্না, তাদের প্রিয় গান, নাচ একসঙ্গে অনুশীলন করতে পারেন।
# শিশুটি কথা সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে শুনুন। এবং করোনাকালীন এ সংকটেও সব ভুলে তাদের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠার চেষ্টা করুন।

করোনাকালে সুস্থ থাকুন ৭ উপায়ে

– শাশ্বতী মাথিন

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। করোনাভাইরাস যে এক অজানা, অদৃশ্য শত্রু, এটি তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে বাঁচতে হলে চাই স্বাস্থ্যজ্ঞান। বাড়ানো চাই শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা; প্রতিদিনের জীবনযাপন হওয়া চাই বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে। করোনাকালে সুস্থ থাকতে কিছু পরামর্শ জানিয়েছেন গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ, সাভার-এর সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. শাকিল মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘করোনাকালে সুস্থ থাকতে সচেতনতা জরুরি। আসলে আতঙ্কিত হওয়া কখনো কখনো উপকারী। আতঙ্কিত হয়ে হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব, স্বাস্থ্য সচেতনতা বেড়ে গেলে কিন্তু ভালো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, কোভিড-১৯-এর এখন পর্যন্ত কোনো চিকিৎসা নেই। তাই একমাত্র পথ হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। ’
ডা. মো. শাকিল মাহমুদের পরামর্শগুলো হলো :

১. প্রতিদিনের জীবনযাপনে সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। রোজ কয়েকবার অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুতে হবে। সব সময় ব্যাগে বা পকেটে সাবান বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখবেন। প্রয়োজনমতো এটি ব্যবহার করতে হবে। আপনি যেখানেই যান না কেন, এই বস্তুটিকে জীবনের একটি অংশ বানিয়ে নিতে হবে।

২. এ মুহূর্তে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাস্ক। যেহেতু এই ভাইরাসটি হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়, তাই মাস্ক আপনাকে এ থেকে রক্ষা করবে। ইতালির একদল গবেষক জানিয়েছেন, বাতাসে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। তাই মাস্ককে অবশ্যই আপনার সঙ্গী করা জরুরি।

৩. হ্যান্ড গ্লাভসকেও বানাতে হবে জীবনের অংশ। কেন? ব্যক্তিগত বা পেশাগত কাজে ঘরের বাইরে বের হয় প্রায় সবাই। নিজের অজান্তে বিভিন্ন জীবাণুযুক্ত জিনিস স্পর্শ করা হয়ে যায়। বিশেষ করে পাবলিক পরিবহনের হ্যান্ডেল, বাসের সিট, রিকশার হুড ও সিট, অফিসের চেয়ার-টেবিল, ল্যাপটপ, মোবাইল, কম্পিউটার, বাজারের ব্যাগ যত্রতত্র স্পর্শ করতে হয়। তাই নিরাপদ থাকতে প্রতিদিনের জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার করুন। বাইরের যে জিনিসই স্পর্শ করা হোক না কেন, হ্যান্ড গ্লাভস পরে স্পর্শ করবেন।

৪. এ সময় কেনাকাটা, বাইরে খাওয়া, বেড়াতে যাওয়া ইত্যাদি অভ্যাসের পরিবর্তন আনতে হবে। কেনাকাটা করতে গেলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে, গ্লাভস ও মাস্ক পরে, ব্যক্তিগতভাবে সুরক্ষিত হয়ে বাজার যান। কম সময়ের ভেতর বাজার সেরে ফেলতে পারলে ভালো। এ ক্ষেত্রে কী কিনবেন, তার লিস্ট আগে থেকে তৈরি করে রাখতে পারেন।

৫. শরীরচর্চার বিষয়টিতেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন। যেহেতু করোনার সময় জিমে যাওয়া যাচ্ছে না, অথবা বাইরে বের হয়ে ব্যায়াম করা যাচ্ছে না, তাই অনেকেই ওজন বেড়ে যাওয়ার সমস্যায় পড়ছেন। আর ওজন বেড়ে যাওয়াই মানে হলো বিভিন্ন রোগব্যাধি আমন্ত্রণ জানানো। তাই শরীরচর্চার বিষয়টি অবহেলা না করাই ভালো।

৬. দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন আনতে হবে এই ক্রান্তিকালে। যে খাবারই খান না কেন, পুষ্টির বিষয়টিতে খেয়াল করুন। এমন খাবার বেছে নিন, যেগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে। ভিটামি-সি সমৃদ্ধ খাবার, যেমন লেবু, কমলা, আমলকী, পেয়ারা ইত্যাদি খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। খাদ্যের গুণগত মান ও পুষ্টিগুণ যেন ঠিক থাকে, এভাবে রান্না ও পরিবেশন করতে হবে। এই সময় বাইরের খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো।

৭. শরীরের পাশাপাশি মনেরও যতœ নেওয়া জরুরি। যেহেতু বেশির ভাগই লকডাউনে সময় কাটাচ্ছেন, এতে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে। সময়টাকে গঠনমূলকভাবে কাজে লাগানোর জন্য মেডিটেশন, যোগব্যায়াম, যার যার ধর্ম অনুসারে প্রার্থনা, বই পড়া ইত্যাদি করতে পারেন। শিখতে পারেন নতুন কিছুও; হোক সেটা ইংলিশ স্পোকেন কোর্স, রান্না বা বাগান করা।

- Advertisement -
সাতকাহন
Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.