ডা. হালিদা হানুম আখতার
আজ আমরা ডায়াবেটিস নিয়ে কথা বলবো। এই কথা বলতে গিয়ে আমি প্রথমে যেটি বলতে চাই, সেটি হলো, আমাদের রক্তের কী কাজ এবং এই রক্তের সঙ্গে ডায়াবেটিসের কী সম্পর্ক।
রক্তের কাজ কী? এর কাজ হলো, আমাদের দেহে নিয়মিত শক্তির জোগান দেওয়া। এ ছাড়া, বায়ু প্রবাহকে দেহের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া, অক্সিজেন নিয়ে আসা, তাপ নিয়ন্ত্রণ করা, দেহের মধ্যে যেসব অপ্রয়োজনীয় পদার্থ বা বর্জ্য রয়েছে, সেগুলো বের করে দিতে সাহায্য করা। এগুলো রক্তের মূল কাজ।
রক্তের সঙ্গে ডায়াবেটিসের কী সম্পর্ক? এটি জানতে হবে। কারণ, ডায়াবেটিস হলে রক্তের মধ্যে মাপতে হয়। তাহলে এই তরলটির মধ্যে কী রয়েছে, যার জন্য আমরা বলি ডায়াবেটিস?
আমরা যেই খাবার খাই, সেগুলো রক্তের মাধ্যমে বিভিন্ন কোষে গিয়ে পৌঁছায়। সেই অঙ্গগুলো তখন কাজ করতে থাকে।
আমরা বিভিন্ন ধরনের খাবার খাই। এর মধ্যে শর্করা ও কার্বোহাইড্রেট একটি প্রধান খাদ্য।
আমাদের দেশে অনেক ভাত বা রুটি খাওয়া হয়। এসব খাবার শর্করার মধ্যে পড়ে। একে রূপান্তর করলে চিনি বা সুগার জাতীয় খাবারে পরিণত হয়। কোষের ভেতর গিয়ে এটি শক্তির উৎস হয়ে যায়। কারণ, শর্করা একেবারে না খেলে আবার দেখা যাবে দেহের কোষ কাজ করতে পারছে না। সুতরাং শর্করা জাতীয় খাবার রক্তের মাধ্যমে বিভিন্ন কোষে যায় এবং কোষ দিয়ে যেসব অঙ্গ তৈরি তাদের কাজ করতে সহায়তা করে।
মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে এই জাতীয় খাবারের একটি বিরাট ভূমিকা রয়েছে। শর্করা যথেষ্ট না হলে, মস্তিষ্ক কাজ করে না। স্নায়ুগুলো সঠিকভাবে কাজ করা থেকে বিরত থাকে।
তবে, চিনির পরিমাণ রক্তে বেশি হলে, স্বাভাবিক রেঞ্জ থেকে বেড়ে গেলে, একে আমরা ডায়াবেটিস বলি। আরেকটি অঙ্গ রয়েছে, পেনক্রিয়াস। এই পেনক্রিয়াসের মাধ্যমে ইনসুলিন নামের যে তরল পদার্থ রয়েছে, সেটি বের হয়ে আসে। পেনক্রিয়াস এটি তৈরি করে এবং সে রক্তের মধ্যে একে দিয়ে দেয়। ইনসুলিনের কাজ হলো, রক্তের মধ্যে শর্করার একটি ভারসাম্য রাখা। একটি পরিমাণ রাখা যেটি ক্ষতিকর নয় এবং রক্তের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। কোষের মধ্যে শর্করা পরিচালনা করতে সাহায্য করে। সুতরাং পেনক্রিয়াস যে অঙ্গটি, এবং এর থেকে যে ইনসুলিন বের হয়ে আসে, এর সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এখন ডায়াবেটিস হলো কি না, আমরা কীভাবে বুঝবো? এর মধ্যে একটি বিজ্ঞানসম্মত পরিমাপ করার বিষয় রয়েছে। রক্তের মধ্যে চিনি কতখানি, সেটিকে আমরা মাপতে পারি। এখন প্রশ্ন হতে পারে, স্বাভাবিক চিনিটা কী? সেটা দেখা যায়, চার থেকে পাঁচ বা পাঁচ দশমিক পাঁচ মিলিমল পর্যন্ত। এটা স্বভাবিক। একে ডায়াবেটিস বলবো না। এই পরিমাপটা হলো, খাওয়ার আগে। খাওয়ার দুই ঘণ্টা পরে হবে সাত মিলিমল। এই স্বাভাবিক থেকে বেশি হয়ে গেলে, একে আমরা ডায়াবেটিস বলবো। অল্প বাড়লে একে প্রি ডায়াবেটিস বলা হয়। আর বেশি হলে তখন আমরা ডায়াবেটিস বলি।
এখন প্রশ্ন আসে, কীভাবে বুঝবে ডায়াবেটিস হয়েছে? লক্ষণগুলো কী হবে? লক্ষণ হলো, রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া। সাধারণভাবে হয়তো আপনি রাতে প্রস্রাব করেন না। তবে ডায়াবেটিস যখন হবে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাবে। আপনাকে বাথরুমে যেতে হবে। আরেকটি হলো, পিপাসা বেশি লাগে। স্বাভাবিকভাবে যা অভ্যাস ছিলো, এর চেয়ে বেশি পিপাসা লাগে। একটু বেশি হলে দেহের ওজন কমে আসে। ক্ষুধাও অনেক সময় বেশি লাগে। খালি খেতে ইচ্ছে করে।
আর এটি যেহেতু বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আক্রান্ত করে, চোখে ঝাপসা দেখতে পারেন। আরেকটি হলো, হাত-পা ক্লান্ত হয়ে যায়। হাত-পা দুর্বল লাগে। অনেক সময় দেখা যায়, চামড়া শুকিয়ে গেছে। এগুলো খুব সাধারণ উপসর্গ। তবে আমাদের বিষয়গুলো জানা থাকা দরকার।
বেশি সতর্ক করা হয় যেসব বিষয়গুলোতে সেগুলো হলো, ক্ষুধা বেশি লাগা, পিপাসা বেশি লাগা এবং রাতে বাথরুমে যাওয়া। এসব একটু সাবধান হওয়ার মতো লক্ষণ। এখন আপনি হয়তো বলবেন, এসব তো হতেই পারে। হওয়া স্বাভাবিক। তবে সমস্যা হলো, বেশিদিন ধরে এই ডায়াবেটিসের অবস্থান আপনার দেহে থাকলে, বড় বড় জটিলতা হয়। সেগুলো কী হতে পারে? একটি হলো, কিডনি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিডনি প্রস্রাবকে ফিল্টার করে দেহের বর্জ্যগুলো বের করে দেয়। এই অঙ্গটির অনেক জরুরি কাজ রয়েছে আমাদের দেহে। তবে ডায়াবেটিস হলে কিডনির ক্ষতি হয়। এর কার্যক্ষমতাকে কমিয়ে নিয়ে আসে। আমরা ইংরেজিতে বলি, কিডনি ডেমেজ হয়ে যায়।
আরেকটি হলো, আমাদের যে স্নায়ুতন্ত্র রয়েছে, একে ডায়াবেটিস আক্রান্ত করে। এটি হলে নিউরোপ্যাথি হবে। হাত-পা জ্বালাপোড়া করবে বা চিন্তাশক্তি কমে আসবে। ডায়াবেটিস ডিমেনসিয়ারও বড় কারণ। তখন আমরা সুস্থভাবে চিন্তা করতে পারি না। মস্তিষ্ক বা স্নায়ুর কার্যক্রম কমে যায়। আরেকটি দেখেছি যে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসে। এর জন্য অনেক সময় দেখবেন, যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে এদের একটি ক্ষত হলে সেটি সহজে সারতে চায় না। অনেক সময় দেখা যায়, পায়ে ক্ষত হয়েছে, কিছুতেই সারছে না।
সেই ক্ষতটা বাড়তে বাড়তে অনেক সময় উপরে উঠে যায়। পা
কেটে ফেলতে হয়। এরকমও আমরা ডায়াবেটিসে অনেক দেখেছি। তখন এই জটিলতাগুলো বাড়ে। বেশিদিন ধরে ডায়াবেটিস অপ্রতিরোধ্য অবস্থায় থাকলে বিভিন্ন বড় অঙ্গ, যেগুলো দেহের মূল কাজগুলো করে, সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়।
এগুলো নষ্ট হলে একজন মানুষ খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে।
আরেকটি হলো, চোখে কম দেখে। চোখের যে শক্তি সেটি কমে আসে। কর্নিয়াকে খুব আক্রান্ত করে ডায়াবেটিস হলে। অনেক সময় রেটিনোপ্যথি হয়। চোখের টিস্যু থেকে পানি কমে যাওয়াতে দৃষ্টিটা কমে আসে। কোনো জিনিসের দিকে তাকালে ফোকাস করতে পারে না।
চোখে দেখতে না পারলে কী হয়? ব্যক্তির কার্যক্ষমতা কমে আসে। আরেকটি বিষয় আমরা জানি, নারীর ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে, তার অনেক জটিলতা হয়। এই জন্য একজন মা গর্ভাবস্থায় থাকলে আমরা ডায়াবেটিস টেস্ট করি। তার ডায়াবেটিস রয়েছে কি না, ব্লাড সুগার স্বাভাবিক কি না, দেখতে হয়। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ডায়াবেটিস হলে তার প্রি একলামসিয়া হতে পারে। শিশু বড় হয়ে যেতে পারে। শিশুর আকার মায়ের পেলভিস থেকে বড় হলে প্রসব করার সময় জটিলতা তৈরি হয়। তখন সিজারের দরকার হতে পারে।
আরেকটি বিষয় দেখেছি, ডায়াবেটিস থাকলে সন্তান পেটে বড় হয়ে যায়, পরিপূর্ণ সময়ের আগে প্রসব হয়। ৪০ সপ্তাহে হয়তো ডেলিভারি হওয়ার কথা, সেটি দেখা গেলো ৩৫ সপ্তাহে হচ্ছে। শিশু অপরিপক্ব থাকে, মায়ের জন্য কষ্ট হয়।
আরেকটি বিষয় দেখেছি, মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে, মরা বাচ্চা জন্ম নেয়। আগে হয়তো অল্প ডায়াবেটিস রয়েছে, তবে গর্ভ হওয়ার কারণে বেড়ে গেলো, তাতে যেসব মা ও গর্ভস্থ সন্তান দুজনের জন্যই বিরাট জটিলতা হয়। তো এই জন্য ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সের পরে আমাদের ডায়াবেটিসের পরীক্ষা করা দরকার। আমি সুস্থ রয়েছি কি না জানা প্রয়োজন।
আমি একটি বিষয় সবাইকে আবারও বলতে চাই, বাংলাদেশে এই রোগের প্রকোপ কতখানি। ২০০৯ সালে যে সমীক্ষা হয়েছে ওখানে দেখা গেছে, ১৩ লাখের কাছাকাছি ডায়াবেটিসে মৃত্যু হয়েছে। ডায়াবেটিস টাইপ-টু এর কারণে। আরেকটি হলো, সারাদেশে ৭১ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছে। তারা জানে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তবে ডায়াবেটিস দেহে রয়েছে কি না বা নির্ণয় করা হয়নি, এমন সংখ্যা প্রায় ৩৭ লাখের মতো। আর আরেকটি হলো, প্রতি বছর ১৩ লাখের মতো মানুষের ডায়াবেটিসে মৃত্যু হয়। সুতরাং এটি বিরাট ধ্বংসকারী একটি রোগ। এটি মানুষের জীবনকে ক্ষয় করে দেয়। তার পরিবারের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। ডায়াবেটিস হওয়ার পর দেহের অন্যান্য অঙ্গগুলো আক্রান্ত হলে খরচের পরিমাণ বাড়ে। সুতরাং আমি বলবো, এটি একটি শরীর ধ্বংসকারী রোগ, যার বিষয়ে আমাদের খুবই সচেতন থাকতে হবে। একে আমাদের এড়িয়ে গেলে হবে না। রুটিন ডায়াবেটিস চেকআপ করতে হবে। ৩৫ বছরের পরে এটি খুব জরুরি। ৩৫ বছরের আগে যে ডায়াবেটিস হয় না, তা নয়। তবে এরপরে এর প্রকোপটা বাড়ে। তাই ডায়াবেটিসের নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
লেখক : রোকেয়া পদকে ভূষিত বিশিষ্ট নারী ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ


