ডা. তাওহীদা রহমান ইরিন
আজকের এই লেখায় আমি শেয়ার করতে চাই আমার একাডেমিক ও প্রফেশনাল জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা, যা কেন্দ্রীভূত একটি পরিচিত ত্বকের রোগ—স্ক্যাবিস—নিয়ে।
শুরুর দিকে, আমি যখন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে পোস্ট গ্রাজুয়েশন ট্রেনিং করছিলাম এবং ডার্মাটোলজি বহির্বিভাগে নিয়মিত রোগী দেখতাম, প্রতিদিন গড়ে ১৫০ জনের মতো রোগী দেখা হতো। সেখানে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন রোগীর মধ্যে একটি প্রচলিত ত্বকের সমস্যা দেখা যেত—স্ক্যাবিস। এটি আমাদের দেশে এতটাই সাধারণ একটি রোগ যে চিকিৎসক হিসেবে আমরা প্রায় সবাই একে খুব ভালোভাবেই চিনি।
পরে, আমি পোস্ট গ্রাজুয়েশনের জন্য থাইল্যান্ডে গেলে, এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা হয়। পুরো ট্রেনিং পিরিয়ডে মাত্র একবার একটি স্ক্যাবিস কেস এসেছিল। আমাদের ডিপার্টমেন্টের হেড তখন বললেন, ’এটি একটি খুবই বিরল স্কিন কেস।’ আমরা সবাই উৎসাহ নিয়ে সেই কেস দেখতে ছুটে যাই।
মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষার মাধ্যমে জীবাণুটি—Sarcoptes scabiei—চিহ্নিত করা হয়। এতদিন যে স্ক্যাবিস আমরা নিয়মিত রোগী হিসেবে দেখে এসেছি, এবার সেই একই জীবাণুকে চোখের সামনে মাইক্রোস্কোপে দেখতে পারা ছিল সত্যিই এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
এরপর আফ্রিকায় আমার অ্যাটাচমেন্ট ট্রেনিংয়ের সময়, আমি প্রথমবারের মতো দেখলাম নরওয়েজিয়ান স্ক্যাবিস। এটি মূলত, HIV পজিটিভ বা ইমিউনোকম্প্রোমাইজড রোগীদের মাঝে দেখা যায়। সাধারণ স্ক্যাবিসের তুলনায় এটি অনেক বেশি ভয়াবহ। এর উপসর্গগুলো হয় অত্যন্ত ক্রাস্টেড ও বিস্তৃত।
একই রোগ—স্ক্যাবিস—তবে ভিন্ন ভিন্ন দেশে, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে, ভিন্ন ভিন্ন উপস্থাপনায় দেখা পেয়েছি। আজকের এই লেখার মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতাগুলোই আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম। স্ক্যাবিস বা চুলকানি রোগটির সঙ্গে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। এটি এখন এত বেশি বেড়েছে যে, তা আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একে বাংলায় পাঁচড়া বলা হয়। খুব সহজেই স্কিনের এই রোগটি সারকোপটিস স্ক্যাবি নামক মাইট দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে।
ক্ষুদ্র পরজীবী জীবাণুটি ত্বকের অগভীরে ডিম পাড়ে এবং বারোজ তৈরি করে। জীবাণু দ্বারা আক্রমণের দুই থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন: চাকা, তীব্র চুলকানি, যা বিকেলের দিকে শুরু হয় এবং রাতে আরও তীব্র আকার ধারণ করে এবং অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায়।
এই ছোট চাকাগুলো শরীরের নির্দিষ্ট কিছু স্থান যেমন- কবজি, নাভি, যৌনাঙ্গ, আঙুলের ফাঁকে দেখা দিতে পারে। স্ক্যাবিস শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবারই হতে পারে। তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশে এর প্রকোপ বেশি। কারণ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে এই রোগগুলো বেশি হয়ে থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তির তোয়ালে, বালিশ ও বিছানার চাদর দ্বারা এই রোগটি সংক্রমিত হয় বলে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক মেছগুলোতে রোগটির প্রাদুর্ভাব বেশি।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্ক্যাবিস প্রতিরোধে পারমেথ্রিন ও বেনজাইল বেনজোয়েটের ভূমিকা অতুলনীয়। এগুলো লোশন ও ক্রিম হিসেবে পাওয়া যায়। এটি পা থেকে গলা পর্যন্ত মেখে আট থেকে ১০ ঘণ্টা রাখতে হয়। তাই চিকিৎসকরা রাতে শোবার আগে এ ওষুধগুলো ব্যবহার করতে বলে থাকেন। সালফার মলম, লিনডেন লোশন ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের টপিক্যাল ক্রিম/লোশন যখন অকার্যকর হয়ে পরে তখন ওরাল আইভারমেকটিন দেওয়া হয় এবং সেই সঙ্গে গোসলে পারমেথ্রিন সোপ ব্যবহার করতে বলা হয়।
আর বিরক্তিকর উপসর্গের হাত থেকে রক্ষার জন্য অ্যান্টি-হিস্টামিন জাতীয় ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। তবে ইনফ্যাকটেড স্ক্যাবিসের ক্ষেত্রে অ্যান্টি-বায়োটিক সেবন করার প্রয়োজন দেখা দেয়।
সম্পূর্ণরূপে স্ক্যাবিস নিরাময় করতে হলে পরিবেশগত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেমন:
১. ডিকন্টামিনেশন (পরিষ্করণ)
আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত পোশাক, বিছানার চাদর সবকিছু গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে এবং ভালোভাবে রোদে শুকাতে হবে। বিকল্পভাবে এগুলো ড্রাই ক্লিন করতে হবে অথবা কমপক্ষে ৭২ ঘণ্টা একটি সিল করা প্লাস্টিক ব্যাগে রাখতে হবে, যেন মাইট মারা যায়।
২. একযোগে চিকিৎসা
পরিবারের সকল সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের একই সময়ে চিকিৎসা নিতে হবে, তাদের মধ্যে উপসর্গ থাকুক বা না থাকুক। পুণরায় সংক্রমণ প্রতিরোধে এটি করতে হবে।
৩. সচেতনতা বৃদ্ধি
জনগণের মধ্যে স্ক্যাবিস কীভাবে ছড়ায়, এর লক্ষণসমূহ এবং চিকিৎসার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে।
প্রতি বছর বিশ্বের জনসংখ্যার এক থেকে ১০ ভাগ লোক স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়। এ রোগের উপসর্গ দেখা মাত্রই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সহজেই স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে মুক্ত থাকতে পারেন।


