রফিক- উল- আলম
কয়েকদিনের বার বার ভূমিকম্পের কারণে দেশবাসী, বিশেষ করে ঢাকা ও আশেপাশের এলাকার অনেকেই রীতিমতাে ট্রমাটাইজড বা আতঙ্কিত। বিশেষ করে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় এই আতঙ্ক বেশি।
এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্র একটা প্যানিক সৃষ্টি হয়েছে। ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই আতঙ্কিত হওয়াটা বড়ই স্বাভাবিক। তবে এমন অস্থিরতার মাঝেও যে সবার মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভাবতে হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নিজের ও পরিবারের আতঙ্ক কাটিয়ে কীভাবে মনে শক্তি ও শান্তি বজায় রাখবেন, সেটি নিয়েই আমাদের আলোচনা।
সঠিক তথ্য গ্রহণ
ভূমিকম্পের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস (যেমন সরকারি সংস্থা) থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানুন। গুজব বা ভিত্তিহীন সংবাদ থেকে দূরে থাকুন। অতিরিক্ত বা উদ্বেগ বাড়ায় অপ্রয়োজনীয় এমন সংবাদ দেখা বা শোনা থেকে বিরত থাকুন।
ঠিক তেমনি ভূমিকম্প সংক্রান্ত খবর, ছবি বা ভিডিও বারবার দেখা থেকে বিরত হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ধরনের বিষয়, বিশেষ করে ধ্বংসাত্মক দৃশ্য দেখা কমিয়ে দিন। কারণ, এগুলো আপনার ট্রমা আরও বাড়িয়ে দেওয়ার উপাদান হিসেবে কাজ করবে।
করণীয় সম্পর্কে জানুন
ভূমিকম্প চলাকালীন ও পরবর্তী আপদকালীন সময়ে আপনার করণীয় কী, সে বিষয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসুন। পরিবারসহ সবাই মিলে বারবার আলোচনা ও অনুশীলন করুন। এই দুর্যোগকালীন সময়ে ঠিক কী করতে হবে, জানলে আতঙ্ক অনেকাংশেই কমে যাবে।
শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম অনুশীলন করুন
হঠাৎ ভয় বা দুশ্চিন্তা বেড়ে গেলে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন। শ্বাস নিন এবং ধীরে ধীরে ছাড়ুন। এ ছাড়াও ইয়োগা ও মেডিটেশন চর্চা করুন। এগুলো আপনার মন ও নার্ভাস সিস্টেমকে শান্ত করতে এবং মনোযোগ বাস্তবতায় ফেরাতে সহায়ক হবে।
দৈনন্দিন রুটিন ঠিক রাখুন
যতোটা সম্ভব প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজকর্ম, যেমন- ঘুমের নিয়ম ও খাদ্যাভ্যাস ঠিকঠাক রাখুন। পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাভাবিক দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড আপনার মানসিক স্থিরতা ঠিক রাখতে দারুণভাবে সাহায্য করবে।
ঘরের আসবাবের নিরাপত্তা বিধান
ঘরের ভারী আসবাবপত্র দেয়ালের সঙ্গে ভালোভাবে আটকে রাখুন, যাতে কম্পনের সময় তা পড়ে না যায়। সেই সঙ্গে ভূমিকম্পকালীন ঘর থেকে বের হওয়ার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা সরিয়ে চলাচলের পথ নির্বিঘ্ন করুন। এমন ছোট প্রস্তুতিগুলো আপনার মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি বাড়িয়ে দিবে।
অনুভূতি শেয়ার করুন
আপনার ভয়, উদ্বেগ, উৎকন্ঠা ইত্যাদি অনুভূতিগুলো পরিবার, কাছের মানুষ ও বিশ্বস্ত বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করুন। তাদের সঙ্গে কথা বলুন। এতে আপনার মনের চাপ অনেকাংশে কমে যাবে।
সামাজিকতা বাড়ান
কাছাকাছি থাকা বন্ধু, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সময় কাটান। এই ধরনের সামাজিকতা আপনার মনের চাপ অনেকাংশে কমাবে।
শিশু ও প্রবীণের প্রতি মনোযোগ দিন
পরিবারের ছোট শিশু ও প্রবীণের দিকে মনোযোগ দিন। তাদের সঙ্গে সংবেদনশীল আচরণ করুন। পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের প্রাথমিক ধারণা দিয়ে রাখুন, যা আপদকালীন সময়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় একদিকে যেমন সহায়ক হবে, ঠিক তেমন এই দায়িত্ববোধ আপনাকে আরো আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।
সংশ্লিষ্ট পেশাদারদের সহায়তা নিন
ভূমিকম্প বিষয়ে উদ্বেগ, উৎকন্ঠা, ঘুমের সমস্যা বা আতঙ্ক আপনার দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করলে এবং মনের ওপর খুব বেশি চাপ সৃষ্টি করলে, দেরি না করে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সহায়তা নিন।
পরিশেষে আবারো বলবো, শরীরের মতো করেই নিজের মনের যত্ন নিন। জানবেন, এমন ক্রান্তিকালে ভয় পাওয়া খুবই স্বাভাবিক, তবে সেটি যেন আতঙ্ক হয়ে আপনার স্বাভাবিক জীবন থামিয়ে না দেয়। তাইতো এই বিষয়ে মানসিক প্রস্তুতি রাখুন। মনের এই প্রস্তুতি আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুভূতি বাড়িয়ে আপনাকে ট্রমা মুক্ত করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে, ভূমিকম্প বিষয়ে সচেতন হোন, আতঙ্কিত নয়।
লেখক: সাইকো সোশ্যাল কাউন্সেলর ও হেলথকেয়ার অ্যাক্টিভিস্ট
ইমপালস হাসপাতাল, ঢাকা;
সহায়তায় : ০১৬৮৪৩৪২৪৪৯


