লিনা আকতার
থাইরয়েড হল এমন একটি এন্ডোক্রাইন গ্রন্থি, যা আমাদের বিপাকসহ বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই হরমোন তৈরির জন্য গ্রন্থিটির প্রয়োজনীয় পরিমাণে আয়োডিন দরকার হয়।
সারা বিশ্বে ২০ কোটি মানুষ থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি আটজনে একজন থাইরয়েড সমস্যায় ভোগে। এই জন্য নারীদের বন্ধ্যত্ব বা সন্তান ধারণে বেশ জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়।
কিছু খাবার রয়েছে, যেগুলো থাইরয়েড নিয়ন্ত্রেণ উপকারী। আসুন জানি সেগুলো-
প্রোটিন
প্রোটিন ব্লাড সুগার স্থির করতে সাহায্য করে এবং মেটাবলিজম বুস্ট করতেও উপকারী। এ ছাড়া এটি অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত রাখে। এতে ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য হয়।কুসুমসহ ডিম, মাছ বা মাংস, বাদাম, ডাল, ছোলা, শিম প্রভৃতি ভালো প্রোটিনের উৎস।
হেলদি ফ্যাট বা স্বাস্থ্যকর চর্বি
হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে ও বন্ধ্যত্ব নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যকর চর্বি খুব জরুরি। স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস হল নারিকেল তেল, এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল, তিসি, অ্যাভোক্যাডো। এই ক্ষেত্রে ঘরে বানানো নারিকেল তেল দিয়ে রান্না করে খেতে হবে। যারা নারিকেল তেল খেতে পারেন না তারা নারিকেল কোরানো খেতে পারেন। এটি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি থাইরয়েড ফাংশনে বেশ ভালো কাজ করে।
এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলে যথেষ্ট পরিমাণে মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট, পলিফেনল ও ফাইট্রোনিউট্রেয়েন্ট থাকে। এগুলো থাইরয়েড উৎপাদনে ভালো সহায়ক। এই তেল সালাদে ব্যবহার করে খাওয়া যেতে পারে।
তিসি
এটি ওমেগা থ্রি- এর একটি ভালো উৎস। এটি সালাদে ছড়িয়ে বা আটায় মিশিয়ে রুটি বানিয়ে খেলে বেশ ভালো ওমেগা থ্রি পাওয়া যায়। এগুলোতে স্বাস্থ্যকর চর্বি থাকার পাশাপাশি ভিটামিন ‘ই’-ও থাকে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ‘ই’ স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে ভালো কাজ করে। এটি থাইরয়েডের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
এ ছাড়া থাইরয়েড হরমোনে কিছু ভিটামিন ও মিনারেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন-আয়োডিন।
আয়োডিন
থাইরয়েড হরমোন তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ মিনারেল হচ্ছে আয়োডিন। আর এটি পেতে রান্নায় আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করতে হবে। তবে এই লবণের গুণাগুণ পেতে হলে তাপমাত্রার মধ্যে বা চুলার পাশে রাখা যাবে না। এ ছাড়া দুধ, চিজ, পেয়াজ, রসুন, ভুট্টা, আনারস, টমেটো, স্ট্রবেরি, সামুদ্রিক মাছ ( যেমন: স্যামন ,সারডিন , হেরিং প্রভৃতি) ইত্যাদিতে আয়োডিন পাওয়া যায়।
সামুদ্রিক শৈবালে বেশ ভালো আয়োডিন রয়েছে। আমাদের দেশে এই খাবারটি নেই বলেই চলে। তাই সবার জন্য পাওয়া কঠিন ।
টাইরোসিনযুক্ত খাবার
এমাইনো এসিড আয়েডিনের সঙ্গে যৌথভাবে থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনে কাজ করে থাকে। টাইরোসিন কমে গেলে থাইরয়েডের পরিমাণ কমে যায়। এই জন্য উচ্চ টাইরোসিনযুক্ত খাবার খাওয়া প্রয়োজন। যেমন: লাল মাংস, টার্কি মুরগির বুকের মাংস, স্যামন মাছ, কলা, মিষ্টি কুমড়ার বিচি ইত্যাদি।
জিংক
জিংক ছোট ছেলে-মেয়েদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, ক্ষুধা বৃদ্ধি এবং পেশি বৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি থাইরয়েডে হরমোন সংশ্লেষণেও উপকারী। জিংক পেতে খেতে হবে ডিম, দুধ, পনির, লাল মাংস, তরমুজের বীচি, রসুন, বাদাম, তিল প্রভৃতি। ১০০ গ্রাম তিল থেকে আট গ্রাম জিংক পাওয়া যায়।
সেলেনিয়াম
এটি থাইরয়েড ফাংশনে লিভারের সহায়ক হিসেবে কাজ করে। সেলেনিয়ামের ভালো উৎস হল ব্রাজিল নাটস। এ ছাড়া লাল চালে, চিংড়ি, টুনাফিস, সরিষা ইলিশ মাছ, শসা ইত্যাদি।
ভিটামিন ‘এ’
থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন ও নিঃসরণে সাহায্য করে। পাশাপাশি টি-থ্রিকে টি-ফোরে রূপান্তরে কার্যকরী। এর উৎস হল গাজর, মিষ্টিকুমড়া, পাকাপেঁপে, ডিম, হলুদ ও সবুজ শাকসবজি।
ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’
ক্যালসিয়াম ও ভিটমিন ‘ডি’-এর অভাবে রক্ত শরীর থেকে চামড়ায় যেতে বিঘ্ন ঘটে। এতে হাতে-পায়ে প্রচুর ব্যথা হয়। তাই থাইরয়েড হরমোনে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’-এর ভূমিকা অপরিহার্য।
ভিটামিন ‘ডি’ পেতে হলে নিয়মিত সকাল ১০ টা থেকে দুপুর দুইটার মধ্যে কমপক্ষে আধা-ঘণ্টা রোদে থাকতে হবে। যাদের রোদে যাওয়ার সুযোগ নেই তারা তৈলাক্ত মাছ, গরুর কলিজা, ডিম, পনির, তিল, সবুজ শাকসবজি, কমলালেবু থেকে পেতে পারেন। এ ছাড়া ভিটামিন ‘ডি’ ফলিকলের পরিমাণ বাড়ায়। এটি মেয়েদের পিরিয়ড নিয়মিত করে।
ভিটামিন ‘বি১২’
থাইরয়েড রোগীদের রক্তস্বল্পতা, অন্ত্রনালীর সমস্যা, বিভিন্ন স্নায়ুবিক সমস্যায় ভিটামিন ‘বি১২’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভিটামিন ‘বি১২’- এর উৎস হল ডিম, ডাল, মাংস ও মাছ।
ডোপামিন সমৃদ্ধ খাবার
থাইরয়েডে মন ভালো রাখা খুব জরুরি। হতাশ হওয়া যাবে না। এ জন্য ডোপামিন (মন ভালো করার হরমোন) সম্বৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। যেমন: বাদাম, আখরোট, কালো চকোলেট, শসা, টমেটো, কমলা, ব্লুবেরি, টকদই, রসুন, বাদামি প্রভৃতি।
লেখক: পুষ্টিবিদ; রায়হান হেলথ কেয়ার হসপিটাল এন্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।


