লিনা আকতার
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হল রোগের বিরুদ্ধে শরীরের সর্বোত্তম প্রতিরক্ষা। কারণ, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আমাদের দেহকে অসুস্থ করে তোলে। বিশেষ করে শীতকালে সর্দি, কাশি, ফ্লু , হজমের সমস্যা, ক্লান্তি, ঘনঘন সংক্রমণের ঝুঁকি ইত্যাদি বাড়তে পারে।
এই জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে সঠিক পুষ্টির প্রয়োজন। যদিও এমন কোনো নির্দিষ্ট খাবার নেই যে দেহের প্রয়োজনীয় সমস্ত পুষ্টি সরবরাহ করবে। তবে সমস্ত খাদ্যগোষ্ঠী থেকে বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়া নিশ্চিন্ত করতে হবে। এগুলো দেহকে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
আসুন জেনে নেওয়া যাক, শীতকালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কী ধরনের খাবার খাবেন-
ভিটামিন ‘সি’
ভিটামিন ‘সি’ আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যেহেতু আমাদের দেহ ভিটামিন ‘সি’ তৈরি করে না, তাই খাদ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই জন্য সাইট্রাসযুক্ত বা ভিটামিন ‘সি’যুক্ত খাবার বেশি গ্রহণ করুন। যেমন: আমলকী, লেবু, পেয়ারা, জাম্বুরা ইত্যাদি।
ফাইটোক্যামিকেল
যে ফল ও শাকসবজি উজ্জ্বল রঙের সেগুলো ফাইটোক্যামিকেল। যেমন: লাল, কমলা বা হলুদ, সবুজ ইত্যাদি রঙের।
টমেটো, ক্যাপসিকাম, স্ট্রবেরি ইত্যাদি লাল জাতীয় খাবারগুলোতে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এগুলো শরীরে ক্ষতিকর কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। আবার আম, গাজর, মিষ্টি আলুতে প্রচুর পরিমাণে বিটা-ক্যারোটিন রয়েছে। এগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
সবুজ শাক-সবজিতে ক্লোরোফিল নামক ফাইটোক্যামিকেল রয়েছে। সবুজের উৎস হিসেবে শীতকালে পাওয়া যায় এমন সবজিগুলো হলো, পালংশাক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি ইত্যাদি।
প্রোবায়োটিক
শীতকালে নড়াচড়া করা হয় না তেমন। এই কারণে অনেকেরই হজম ভালো হয় না। এই সময় প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার খেতে পারেন। প্রোবায়োটিকের চমৎকার উৎস দই। এটি নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে খেতে পারলে হজমশক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে।
এ ছাড়া হজম ভালো করতে ফাইবারসমৃদ্ধ শাকসবজি ও ফল খেতে পারেন। এগুলোও প্রোবায়োটিক হিসেবে কাজ করে।
বাদাম
বিভিন্ন ধরনের বাদাম খেতে পারেন। এতে ভিটামিন ‘ই’, প্রোটিন, ফাইবার ও স্বাস্থ্যকর চর্বি রয়েছে। এগুলো ঘন ঘন ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
ভিটামিন ‘ডি’
শীতকালে মানুষ বাইরে কম সময় কাটায়। শীতে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো না-ও পাওয়া যেতে পারে। সূর্যের আলো থেকে ভিটামিন ‘ডি’ পাওয়া যায়। তবে এই জাতীয় খাবার খুব কমই রয়েছে। ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধ খাবার হলো, ডিমের কুসুম, মাশরুম, সামুদ্রিক মাছ, ফরটিফাইড সিরিয়াল প্রভৃতি।
ভিটামিন ‘ডি’ দেহে হরমোন হিসেবেও কাজ করে। এটি শরীরে রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যাদের ক্রনিক (দীর্ঘমেয়াদে) রোগ রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ‘ডি’ সাপ্লিমেন্ট খেতে পারেন।
জিঙ্ক
শীতে অনেকেই সর্দি, কাশি, ফ্লু, ডায়রিয়ার মতো সমস্যায় ভোগে। এই জন্য জিঙ্ক সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরি। জিঙ্কের উৎস হিসেবে খেতে পারেন বাদাম, তিসিবীজ, চিয়াবীজ, গোটা শস্য ইত্যাদি।
মসলা
শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, সর্দি, কাশির প্রকোপ কমাতে তেজপাতা, কালো মরিচ খেতে পারেন। এ ছাড়া খেতে পারেন রসুন। রসুনে অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল রয়েছে। আরও খেতে পারেন, হলুদ-দুধ কিংবা হলুদ-পানি। কারণ, হলুদে কারকিউমিন নামক উপাদান শরীরে প্রদাহ ও শীতকালীন সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
পানি বা তরল খাবার
শীতকালে ঋতু পরিবর্তনের কারণে বাতাস শুষ্ক হয়ে যায়। এতে দেহে পানিশূন্যতা তৈরি হয়। তাই দিনে কমপক্ষে আট গ্লাস পানি পান করুন। এ ছাড়া পানি জাতীয় সবজি ও ফল খেতে পারেন। যেমন: শসা, কলা, টমেটো, লেবুর শরবত ইত্যাদি।
বাড়তি পরামর্শ
- নিয়মিত ব্যায়াম করুন। ব্যায়াম করলে ঠান্ডা লাগার আশঙ্কা প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যায়।
- নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- পর্যাপ্ত ঘুমান।
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন।
- গরম পোশাক পরুন।
- যাদের আগে থেকে ফ্লু জাতীয় সমস্যা রয়েছে, তারা নিয়মিত গরম পানির ভাপ নিন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ভ্যাকসিন নিতে পারেন।
- পরিষ্কার-পরিছন্ন থাকুন।
লেখক: পুষ্টিবিদ; রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ
সেন্টার; দিনাজপুর


