লিনা আকতার
ভারী খাবার গ্রহণের পর আমাদের পেটে স্বাভাবিকভাবেই হজমশক্তি ধীর হয়ে যায়। এতে পেট ফাঁপা, বদহজম, পেটে ব্যথা ও বমির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এগুলো আমাদের সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলে।
হজম প্রক্রিয়া এমন একটি পদ্ধতি যার জন্য যথেষ্ট শক্তি ব্যয় হয়। কেননা খাবার গ্রহণ করার পর শরীরকে প্রচুর পরিমাণে রক্ত পাকস্থলী ও অন্ত্রে প্রবাহিত করতে হয় এবং অ্যাসিড, এনজাইম ও পুষ্টি ভেঙ্গে ফেলার মতো প্রয়োজনীয় গতিশীলতা নির্গত করতে হয়। আর কোনো কারণে এনজাইমের উৎপাদন হ্রাস (বয়স, পুষ্টির ঘাটতি কিংবা ওভারলোড খাবারের কারণে) পেলে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় ধরে খাবার পেটে থাকে।
আর তখনই পেট ভারীবোধ অনুভূত হয়। অধিক তেল মসলাযুক্ত, স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো অতিরিক্ত গ্রহণে পেটে গ্যাস, অ্যাসিডিটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিটি খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে অনন্ত দুই থেকে তিন ঘণ্টার বিরতি থাকা প্রয়োজন। ভারী খাবার শুধু শারীরিক সমস্যা তৈরি করে না, এটি মানসিক
স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করে।
আসুন জেনে নেয়া যাক, ভারী খাবার গ্রহণের পর কী ধরনের খাবার খাবেন-
হালকা গরম পানি
খাবার খাওয়ার ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পর হালকা ঈষ্দুষ্ণ গরম পানি পান করতে পারেন। এর সঙ্গে একটু লেবুর রস আর সামান্য লবন মিশিয়ে খেলে শরীর বিপাক হার বৃদ্ধি পাবে এবং টক্সিন বেরিয়ে আসবে। তবে খাওয়ার মাঝখানে পানি পান করবেন না। এ ছাড়া খাওয়ার পর পরই কখনই চা, কফি খাবেন না। এই ধরনের পানীয়তে ফেনোলিক নামক যৌগ ও ক্যাফেইন থাকে। এগুলো খাবার থেকে পুষ্টি শোষণ করতে বাধা দেয়।
দই
যেকোনাে ভারী খাবার খেয়ে তার ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর প্রোবায়োটিক খাবার খান। সবচেয়ে ভালো উপকার পাবেন টকদই খেলে। এটি দ্রুত হজমশক্তি বাড়াবার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
দইয়ের সঙ্গে ভাজা জিরা মিশিয়ে নিতে পারেন। আরো ভালো কাজে দেবে।
বোরহানি
খাবারের শেষে বোরহানি বা লাচ্ছি মাঠা গ্রহণ করতে পারেন। এতে হজমে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
আদা ও জিরা ভেজানো পানি
আদায় রয়েছে জিঞ্জেরল নামক উপাদান। এটি শরীরকে দ্রুত খাবার ভাঙতে সাহায্য করে এবং এটি বমি বমি ভাব কমাতে উপকারী। এ ছাড়া পেট খারাপের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। জিরাতে থাকা কারমিনেটেভ পেটের গ্যাস কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। জিরা পানি তৈরির জন্য
প্যাকেটের জিরা দিয়ে পানীয় বানাবেন না।
মৌরি বীজ
মৌরি পরিপাকতন্ত্রের পেশিগুলিকে শিথিল করতে সাহায্য করে। এটি পেটের বদহজম, পেট ফাঁপা ও গ্যাসের অস্বস্তি ভাব কমাতে কার্যকর। ভারী খাবারের পরে এক চা চামচ মৌরি বীজ চিরিয়ে খান।
আপেল সিডার ভিনেগার
আপেল সিডার ভিনেগার হজমের জন্য চমৎকার। পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেলে এটি পাকস্থলীতে আরো অ্যাসিড তৈরি করতে সাহায্য করে। এটি খাবার ভাঙ্গার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারী খাবারের আগে বা পরে এক গ্লাস পানিতে এক চা চামচ আপেল সিডার ভিনেগার মিশিয়ে পান করলে পেট ভালো রাখতে সাহায্য
হয়।
ফল
আমরা অনেকেই জানি ফল খেলে হজম শক্তি বৃদ্ধি পাবে। সে ক্ষেত্রে এনজাইমসমৃদ্ধ ফল বেছে নেওয়াই ভালো। যেমন: পেঁপে বা আনারস। পেঁপেতে থাকা পাপাইন এনজাইম এবং আনারস থাকা ব্রোমেলেন এনজাইম
প্রোটিনকে নরম করে। এটি ভারী খাবার হজম উপকারী। তবে যাদের পেটের সমস্যা আগে থেকেই (যেমন: আইবিএস জনিত) তাদের ভালো নাও হতে পারে। তারা এসব খাবার পরে গ্রহণ করতে পারেন বিকালে বা
সন্ধায়।
ডিটক্স পানীয়
ভারী খাবারের পরে পানিতে সামান্য লেবু মিশিয়ে শসা, পুদিনা কিংবা তেঁতুল পানিও খেতে পারেন ডিটক্স করে। এতেও হজমশক্তি উন্নত হবে।
হাঁটুন
খুব বেশি খাওয়ার পরে হঠাৎ শরীরর্চচা করবেন না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। এর পরিবর্তে হালকা হাঁটাহাঁটি করতে পারেন। কিন্তু ভারী ব্যায়াম করবেন না। গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের পরে ১৫ থেকে ২০ মিনিট
হাঁটলে হজমশক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও থাকে।
লেখক: পুষ্টিবিদ
রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল এন্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর


