লিনা আকতার
খাদ্যের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা যা খাই, তা মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, বয়সজনিত সমস্যা, দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন রোগ ইত্যাদি কারণে মানসিক চাপ হতে পারে।
আর তাই শরীরে কর্টিসল, অ্যাড্রোনালিন ও নরডেনালাইন নামে কয়েকটি হরমোনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। এই হরমোনগুল ঘুম, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও সাইক্রোসিসহ বেশ কয়েকটি বিপাকীয় সমস্যা তৈরি করে এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে আরো খারাপ করে তোলে। এ ছাড়া মানসিক চাপ অন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্রকেও বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে।
শরীরে দুটি প্রধান নিউরোট্রাসমিটার- সেরোটোটিন ও ডোপামিন উভয়ই মেজাজ বর্ধক। এগুলো অন্ত্রে উৎপাদিত হয়। এ ছাড়াও স্ট্রেসের কারণে শরীরে স্বাভাবিক ভারসাম্য (হোমিওস্টাসিস) হারিয়ে যেকোনো ধরনের মানসিক অবস্থা সৃষ্টি করে।
মানসিক চাপ ও ক্ষুধার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। র্দীঘস্থায়ী মানসিক চাপের কারণে নির্দিষ্ট ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার বেশি উৎপাদন করে, যা ক্ষুধা বাড়াতে পারে। এতে আপনি অতৃপ্তি বোধ করতে পারেন। এতে পরে কর্টিসল হরমোন বেড়ে যাবে। তাতে অ্যানোরেক্টিক প্রভাব সৃষ্টি হয়, যা ক্ষুধার অনুভূতি কমিয়ে দেয় এবং কম খাবার গ্রহণে উদ্ধুদ্ধ করে।
শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট
আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিদিনের শক্তি ও অন্যান্য পুষ্টি শতাংশ গ্রহণ করে শর্করা থেকে। তবে খাওয়ার জন্য জটিল শর্করা বা কার্বোহাইডট বেছে নিতে হবে। কারণ এটি শরীরে ট্রিপটোফ্যানের শোষণ বাড়িয়ে দেয়। এতে সেরোটোনিন উৎপাদন বেড়ে যায় এবং মন-মেজাজ ঠিক রাখতে সহায়তা করে। শর্করা সঙ্গে পর্যাপ্ত আঁশ খেলে পুষ্টি শোষণ নিশ্চিত হবে, তেমনি অন্ত্রের স্বাস্থ্য ঠিক থাকবে।
জটিল শর্করাজাতীয় খাবার: গোটা শস্য- লাল আটা, ওটস, বালি, মসুর ডাল, ছোলা, সয়াবিন ইত্যাদি। ফল ও সবজি: গাজর, মটর, পেয়াজ, ব্রকলি ইত্যাদি।
প্রোটিন
প্রোটিন শরীরকে টাইরোসিন নামক একটি নির্দিষ্ট ধরনের অ্যামাইনো অ্যাসিড সরবরাহ করে। পরে টাইরোসিন আরো ভেঙে ডোপামিন নামক আরো একটি নিউরোট্রাসমিটার তৈরি করে। ডোপামিন আমাদের মস্তিষ্কের অনুপ্রেরণা ও আনন্দের অনুভূতি তৈরিতে গুরুত্বর্পূণ ভূমিকা পালন করে। টাইরোসিন সমৃদ্ধ খাবার খেলে মস্তিষ্ক ডোপামিন সংশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়।
টাইরোসিন সমৃদ্ধ খাবার স্যামন, সার্ডিন, ম্যাকরেল, ঘাস খাওয়নো গবাদি পশুর মাংস, ডিম, কম চর্বিযুক্ত দুধ ও দুধ দিয়ে তৈরি খাবার।
অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার
স্মৃতিশক্তি ও রোগ প্রতিরোধে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের খাবারের মধ্যে ভিটামিন এ, ই, সি, সেলেনিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ই আলঝেইমার ও ডিমেনসিয়ার রোগ বিলম্বিত করে। এ ছাড়াও ভিটামিন সি কর্টিসল ও স্ট্রেস হরমোন কমায়। এ জন্য খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন রঙ্গিন শাকসবজি যেমন- গাজর, মিষ্টিকুমড়া, পালংশাক, বেরিজাতীয় খাবার, লেবু, আমড়া ইত্যাদি রাখতে হবে।
ওমেগা ৩
সুস্থ স্নায়ুকোষ তৈরির জন্য মস্তিষ্কের ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড প্রয়োজন। এটি বিষণ্ণতা ও মানসিক অসুস্থতা কমায়। এটি সেরোটোনিন উৎপন্নকারী জিনকে চালু করার ক্ষেত্রে গুরুত্বর্পূণ ভূমিকা পালন করে। সেরোটোনিন হরমোন মন মেজাজ ভালো রাখতে ভূমিকা পালন করে। এ জন্য ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিডকে অ্যান্টিডিপ্রেশনও বলা হয়।
ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড উৎস হিসাবে খেতে হবে তৈলাক্ত মাছ, আখরোট, বিভিন্ন রকমের বীজজাতীয় খাবার যেমন- চিয়াবীজ, তিসিবীজ ইত্যাদি।
ভিটামিন বি কমপ্লেক্স
ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের মধ্যে ফলিক অ্যাসিড থাকে। এটি মানসিক চাপ, উদ্বেগ, আতঙ্ক ও বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি দেয়। এ ছাড়া ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের মধ্যে ভিটামিন বি৫- কে অ্যান্টিস্ট্রেস ভিটামিন বলা হয়। এ জন্য খেতে হবে গাঢ় রঙ্গের সবুজ শাক-সবজি, গোটা শস্য, মাছ, মাংস, চিনাবাদাম ইত্যাদি।
এল-থেনাইন
এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন। এটি মস্তিষ্ককে আলফা তরঙ্গ বাড়ায়। এতে মানসিক চাপ কমে। এ জন্য খেতে হবে চা। বিশেষ করে কালো ও সবুজ চা।
গাট হেলথ
হজম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শোষণকৃত হজম পুষ্টি মস্তিকে পৌঁছায়। তাই গাট হেলথ ঠিক না থাকলে এটি মানসিক স্বাস্থের ওপর প্রভাব পড়ে। এই জন্য খাদ্যতালিকায় প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। এসব খাবারের মধ্যে দই অন্যতম।
লেখক: পুষ্টিবিদ; রায়হান হেলথ কেয়ার হসপিটাল এন্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।


