ডা. তাওহীদা রহমান ইরিন
পর্ব- ১
ইদানিং মেয়েটি একেবারেই মুখচোরা হয়ে গেছে। মেহমান আসলে লুকিয়ে থাকে। খাবার টেবিলে সবার সঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করে না। বইয়ে মুখ গুঁজে বসে থাকে। মেয়েটি অবশ্য বরাবরই একটু মেধাবী এবং পড়ালেখা পছন্দ করে। কিন্তু হঠাৎ করে একদিন খাবার টেবিলে বাবা খেয়াল করলেন যে সে ওড়না দিয়ে মুখটা ঢেকে রয়েছে।
অনেক অনুরোধের পরেও সে মুখ থেকে ওড়না সরাচ্ছে না। মেয়েটির মা একটু ভয়ার্ত চোখে তাকালেন। তিনি বিষয়টি জানতেন। যখন একরকম বকা দিয়েই ওড়নাটা সরানো হলো তখন দেখা গেল, তার চিবুকে ও থুতনিতে দাঁড়ি-গোফের মতো আনওয়ান্টেড হেয়ার বা অবাঞ্ছিত লোম, যে জায়গায় মেয়েদের সাধারণত থাকে না। বাবা আঁতকে উঠে ভাবলেন, ব্যাপারটা কি!
মেয়েটি টেবিল থেকে দৌড়ে রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। মা তখন বললেন, সে কিছুদিন ধরেই এই সমস্যায় ভুগছিল। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য শেভ করে ফেলেছিল। এরপর থেকেই এরকম হয়ে গেছে।
বাবা চিন্তায় পরে গেলেন এবং মেয়েকে নিয়ে আমার কাছে আসলেন। মেয়েটির ইতিহাস নিয়ে পেছনের গল্পটা জানা গেলাে। তার বয়স ১৮ বছর, সে এইচ এস সি পরীক্ষার্থী। বছর দুয়েক হলো তার ওজন হঠাৎ করে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ঘাড়ে, গলায় কালো ছোপ ছোপ দাগ দেখা দিচ্ছে, মুখে দেখা দিয়েছে ব্রণ। যদিও তার এ সমস্যাটি আগে কখনো ছিল না। তার পিরিয়ড শুরু থেকেই ছিল অনিয়মিত। তাই তার মা এটাকেই গুরুত্ব না দিয়ে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। ইতিহাস শুনে আমি তাদের আশ্বস্ত করলাম ও সময় নিলাম এবং কিছু ইনভেস্টিগেশন (পরীক্ষা) করতে দিলাম। রিপোর্ট দেখে বুঝলাম আমার আশঙ্কাই সত্যি হলো। মেয়েটি পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রমে বা পিসিওএস (PCOS) ভুগছে।
এই গল্প কেবল একটি মেয়ের নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। সাধারণত ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সে এই সমস্যাটি বেশি হয়। সম্পূর্ণ বিশ্বে মেয়েদের রিপ্রোডাক্টিভ এজে দুই থেকে ২০ শতাংশ মেয়েরাই এ সমস্যায় ভোগে। পিসিওএস প্রথম আবিষ্কার হয় ১৯৩৫ সালে এর লক্ষণগুলোর উপর ভিত্তি করে।
পিসিওএস কেন হয়?
পিসিওএসের সঠিক কারণ পুরোপুরি বোঝা যায় না। সম্ভবত একাধিক কারণ রয়েছে। পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে প্রজনন হরমোনের অস্বাভাবিক মাত্রা, ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোন (এফএসএইচ), লুটিনাইজিং হরমোন (এলএইচ), ইনসুলিন এবং মেল সেক্স হরমোন (এন্ড্রোজেন) ওভারির স্বাভাবিক ফাংশন ব্যাহত করে।
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম একটি এন্ডোক্রাইনাল সমস্যা। যারা পিসিওএসে ভুগছেন তারা স্বাভাবিক মাত্রার থেকে বেশি এন্ড্রোজেন উৎপাদন করেন। এটি একটি পুরুষ হরমোন যা মাসিক ওভুলেশন সাইকেলকে প্রভাবিত করে।
পলিসিস্টিক ওভারি ডিসঅর্ডার (পিসিওডি) হলো রিপ্রোডাক্টিভ সিস্টেমের হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে সৃষ্ট একটি ব্যাধি। হরমোনের ভারসাম্যহীনতা মেল হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যা অনিয়মিত ঋতুস্রাব ও ডিলেইড এগ রিলিজ করে। এটি সিস্টেও পরিণত হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে পিসিওএস থাকলে যে জটিলতা দেখা দেয় তার মধ্যে ডিপ্রেশন, নিদ্রাহীনতা, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (যেমন: হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে), ওজন বৃদ্ধি, ইনফার্টিলিটি, প্রিম্যাচিউর লেবার, অনিয়মিত মাসিক, ইউটেরাইন ব্লিডিং এবং জরায়ুতে ক্যানসারের ঝুঁকিও থাকে। আর্টিকেলের শুরুতেই যে সমস্যা গুলো জানিয়েছিলাম যে আনওয়ান্টেড হেয়ার, ব্রণ, চুল পরে যাওয়া, শরীরের ফোল্ড এরিয়াগুলোতে পিগমেন্টেশন বা ডার্ক প্যাচ হওয়া এ সমস্যা গুলো তো রয়েছেই।
পিসিওএস কিভাবে আমাদের মনের স্বাস্থ্যে প্রভাব বিস্তার করে?
একটা তো হরমোনাল ব্যাপার রয়েছেই, হরমোনাল ইমব্যালেন্সের কারণেও আমাদের মুড স্যুয়িং হয়। এ ছাড়াও পিসিওএসের কারণে ওজন বাড়ে। এর কারণে সেটিও আমাদের মনের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে নেতিবাচক ভাবে। পিসিওএসের রোগীদের দেখা যায় যে ওজন নিয়ন্ত্রণে আসতে বেশ বেগ পেতে হয়। বেশ কিছুটা সময় লাগে। এই জন্য অনেক সময় পেশেন্টরা এ জার্নিতে হতাশ হয়ে যায় এবং ডিপ্রেশনে পরে যায়। পিসিওএসের রোগীদের ঘুমের সমস্যা হয়। দীর্ঘদিন যদি ঘুম কম হতে থাকে তাহলে তাদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, সেটিরও নেতিবাচক প্রভাব পরে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের উপর। সহজেই ক্লান্ত হয়ে যায়, কাজ করার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং ভাবে যে আমাকে দিয়ে আর কিছুই হবে না। সবথেকে যেটি প্রভাব বিস্তার করে মনের স্বাস্থ্যে সেটি হলো আনওয়ান্টেড হেয়ার। আনওয়ান্টেড ফেসিয়াল হেয়ার যা সৌন্দর্যহানিকর এবং এটি তাদের আত্মবিশ্বাস ও সেলফ এস্টিম কমিয়ে দেয়। ঠিকমতো চিকিৎসার অভাবে হয়তো তারা ভুল করে ফেলে, ওয়্যাক্স করে ফেলে বা শেভ করে ফেলে, এতে হেয়ার টেক্সচার আরো ঘন হতে থাকে। ইনফার্টিলিটির একটি কারণ পিসিওএস। কিন্তু পিসিওএস মানেই যে বন্ধ্যাত্ব, সন্তান হবে না, সন্তান নিতে পারবে না এ ধারণাটি ভুল। সাধারণত সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে পিসিওএস নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় সেই সঙ্গে ইনফার্টিলিটি রোধ করা সম্ভব। এ কারণে দেখা যায়, দাম্পত্য জীবনে কলহ হয়, অশান্তি হয়। এই ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং অনেকখানি কাজ করে।
ল্যাব পরীক্ষায় মেল সেক্স হরমোনযেমন টেস্টোস্টেরন এবং DHEA , প্রোল্যাকটিন লেভেল পরিমাণ বেশি থাকে।
ফার্টিলিটি কেয়ারের ডিরেক্টর মার্ক পি ট্রলিস এমডির মতে, পিসিওএসে আক্রান্ত ৪০শতাংশ পর্যন্ত মহিলারা প্রি -ডায়াবেটিক। প্রি -ডায়াবেটিসের অনেক রোগীর ওজন বেশি, তিনি বলেন। PCOS আক্রান্ত ১০ শতাংশ রোগীর ডায়াবেটিস হবে। আল্ট্রাসনোগ্রামে সিস্টগুলো মুক্তার মালার মত ক্লাসিক নেকলেস চিহ্ন দেখা যায়।
চিকিৎসা যেভাবে দেয়া হয়ে থাকে –
অধিকাংশ ক্ষেত্রে পিসিওএস কিন্তু ডায়াগনোসিস হয়ে আসে না। দেখা যায়, তার হয়তো পিরিয়ডে সমস্যা হচ্ছে সেজন্য সে একজন গাইনিকোলজিস্টের শরণাপন্ন হচ্ছে। তখন গাইনিকোলজিস্টের অন্যান্য ইনভেস্টিগেশনের মাধ্যমে শনাক্ত হয় পিসিওএস। হরমোনাল ইমব্যালেন্সের কারণে হয়তো এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট বা মেডিসিন স্পেশালিস্টের কাছে যায়। ত্বকে নানা সমস্যা হলে ডার্মাটোলজিস্টের কাছে যায়।
এখানে একজন ডার্মাটোলজিস্ট এবং ওয়েলনেস কনসালটেন্ট যেমন হলিস্টিক এপ্রোচের মাধ্যমে তার ত্বকের স্বাস্থ্য এবং তার লাইফস্টাইলটা কি হবে সেটি মনিটর করবেন, সাইকোলজিস্ট কাউন্সেলিং করেবেন, একজন এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট তার হরমোনাল ইমব্যালেন্সের ব্যাপারটি দেখবেন। একজন গাইনিকোলজিস্ট তার পিরিয়ড সম্পর্কিত বা ফিমেল হরমোন সম্পর্কিত সমস্যাগুলোর সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করবেন। সুতরাং এটি টিম ওয়ার্ক হলে এর রেসপন্স আরো ভালো হয়।
লেখক: প্রধান চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ; রিজুভা ওয়েলনেস।


