Thursday, February 12, 2026
spot_img
Homeঅন্যান্যআভিজাত্যে জামদানি

আভিজাত্যে জামদানি

সাতকাহন২৪.কম ডেস্ক
বাঙালির কাছে জামদানি শাড়ির কদর চিরন্তন। ছোট-খাট ঘরোয়া অনুষ্ঠান হোক বা বিয়ে বাড়ির জমকালো সাজ জামদানি শাড়ির আবেদন সবসময়ই। ভারী বা হালকা যেকোনো কাজের নকশাতেই নারী হয়ে উঠে অপরূপ। এ শাড়ি যেন বাঙালি নারীর আভিজাত্যের প্রতীক। তবে তাঁতিদের দীর্ঘ পরিশ্রমে বোনা এই শাড়ির দাম যেমন একটু বেশি, তেমনি এর যত্নও নিতে হয় আলাদাভাবেই।

বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ডা. সানজিদা হোসেন পাপিয়ার প্রথম পছন্দ জামদানি শাড়ি। টেলিভিশনের যেকোনো অনুষ্ঠান হোক বা ঘরোয়া কোনো আয়োজনে বেশিরভাগ সময় এই শাড়িই পরে থাকেন তিনি। নিজেকে ‘জামদানি প্রেমী’ বলে পরিচয় দিতেও বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। জানালেন, শাড়ি ভালোবাসি। তবে জামদানি শাড়ির প্রতি ভালোবাসাটা একটু বেশিই। এটি পরা মানে হলো বাংলাদেশের ঐতিহ্যকে ধারণ করা, বাংলাদেশকে ধারণ করা। আমার কাছে মনে হয়, যেকােনো শাড়ির তুলনায় এটি বেশি গর্জিয়াস। অনেকেই ভাবেন জামদানি শাড়ি পরলে ফুলে থাকে বা এটি বেশি স্বচ্ছ। তবে আমার মনে হয় ঠিকমতো পরা গেলে এর চেয়ে চমৎকার আর কিছুই হতে পারে না। এই শাড়ির বড় উপকারি দিক হচ্ছে, এটি পরলে আর কোনো অলংকার না পরলেও চলে। কেবল শাড়িটিই একজন নারীকে অনেক গর্জিয়াস ও গ্ল্যামারাস করে দেয়। জামদানির মতো এতো বৈচিত্র্যময়, রঙিন ও অভিজাত শাড়ি আর হয় না।

শাড়ি : আমিন কালেকশস । ছবি : সংগৃহীত
শাড়ি : আমেন কালেকশন। ছবি : সংগৃহীত

ফেসবুক পেইজ আমেন কালেকশন দীর্ঘদিন ধরে জামদানি নিয়ে কাজ করছে। নিজস্ব তাঁতিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে ক্রেতাদের পছন্দ অনুযায়ী পৌঁছে দিচ্ছে শাড়ি। আমেন কালেকশন-এর সহ প্রতিষ্ঠাতা ইফতেখার আমিন জানান, জামদানি দেশীয় শাড়ি। এর বৈশিষ্ট্য একেবারেই আলাদা। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো নান্দনিক নকশা। জামদানি হলো হাতের কাজের শাড়ি। হাতের কাজ ছাড়া এর নকশা বা মৌলিকত্ব তুলে ধরা সম্ভব নয়। মেশিনে আজকাল শাড়ি তৈরি হয়। তবে এটি সঠিক অর্থে জামদানি শাড়ি নয়। দুজন বা তিনজন তাঁতি তাঁতে বসে মাসের পর মাস ধরে, অনেক পরিশ্রম করে যেই শাড়িটা তৈরি করে সেটিই হয় প্রকৃত জামদানি। এটি মেশিনে তৈরি করা সম্ভব নয়। মেশিনে যেটি তৈরি হয়, তা জামদানির প্যাটার্ন। তাই আসল শাড়ির দাম কিছুটা বেশি হয়।’

জামদানি শাড়ির জন্য দেড়শরও বেশি নির্দিষ্ট নকশা রয়েছে। এসব নকশা কেবল জামদানিতেই করা হয়। অনেক ধরনের নামও রয়েছে এগুলোর। কলকা, ফুল-লতা-পাতা, পান্না হাজার, তেড়ছা, পানশি, ময়ুরপক্ষী, করলা, বট পাতা, বুটিদার, জাল, জলপাড়, তুবলি, ডুরিয়া, বলিহার, কটিহার ইত্যাদি। এগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বার বিভিন্ন শাড়িতে আসে। আগে একই ধরনের নকশার কাজ থাকলেও এখন ফিউশন করা হয়। একটি নকশার সঙ্গে আরেকটি নকশা, রঙ ও ধরন মিলিয়ে ফিউশন করে শাড়ি বানায় তাঁতিরা।

শাড়ি : আমিন কালেকশস । ছবি : সংগৃহীত
শাড়ি : আমেন কালেকশন । ছবি : সংগৃহীত

জামদানি শাড়ির দাম

আমেন কালেকশন-এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. দিলরুবা নাসরিন বলেন, ‘জামদানি শাড়ির দাম, নির্ভর করে বুনন ও নকশার ওপর। বুনন যত সূক্ষ্ম সুতার হবে, সুতার কাউন্ট যতো বেশি হবে, কাজ যত ঘন হবে, তত দাম বেশি হবে। একটি শাড়ির দাম সাড়ে তিন হাজার টাকা থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকা পর্যন্তও হয়।’

জামদানি শাড়ির সুতোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের কাউন্ট রয়েছে জানিয়ে ইফতেখার আমিন বলেন, ‘৬০, ৮০, ৮৪, ১০০ কাউন্ট হয়। কাউন্ট যতো বাড়বে দামও তত বাড়বে। পাশাপাশি কাজ যত ভারি হবে তত দাম বাড়বে। অনেক সময় ৮শ বা ১ হাজার টাকায় জামদানি পাওয়া যায়। তবে এগুলোর গুণগত মান খুব কম হয়। আমরা জামদানি শাড়ির গুণগত মান নিয়ে আপোস করি না। তাই আমাদের শাড়ির দাম ৪ হাজার টাকার ওপর থেকে শুরু হয়। এতে স্টাইল ও গ্রেস দুটোই থাকে।’

ভালো জামদানি বোঝার উপায়

কীভাবে বোঝা যাবে জামদানিটি আসল কি না? এ বিষয়ে আমেন কালেকশন-এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. দিলরুবা নাসরিন জানান, ভালো জামদানিতে শাড়ির পেছনের দিকে সুতো মতো বের হয়ে থাকে না। ভালো শাড়ির সোজা পাশ ও উল্টো পাশ বোঝা অনেক সময় কঠিন হয়। এর বুনন হয় ফাঁকা ফাঁকা। একে মসৃণ মনে হবে না। আবার সুতার কাউন্ট দিয়েও ভালো মন্দ বোঝা যায়। মোটা সুতা কম কাউন্টের। সুতা সরু বা পাতলা হলে বেশি কাউন্টের। কাউন্ট যত বেশি শাড়ি তত সুন্দর। তবে ৬০ কাউন্টের শাড়িও কিন্তু খুব সুন্দর হয়।

শাড়ি : আমিন কালেকশস । ছবি : সংগৃহীত
শাড়ি : আমেন কালেকশন। ছবি : সংগৃহীত

জামদানি শাড়ির যত্ন

জামদানি শাড়ি যত্ন না নিলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। তবে যত্ন মানে এই নয় যে শাড়ি ভাঁজ করে সবসময় আলমারিতে তুলে রাখতে হবে। বরং বার বার পরলেই এটি ভালো থাকে। উপস্থাপক ডা. সানজিদা হোসেন পাপিয়া জামদানির যত্ন কীভাবে নেন? জানালেন, যেকোনো শাড়ির তুলনায় এর একটু বাড়তি যত্ন নিতে হয়। এই যত্নটা পুরোপুরি নির্ভর করে আপনার জামদানি শাড়ির প্রতি কতটা ভালোবাসা রয়েছে তার উপরে। শাড়ি একবার পরে আরেকটি বড় অনুষ্ঠানের জন্য রেখে দিলে চলবে না। এটি ঘন ঘন পড়তে হবে। অনেকে অন্যান্য শাড়ির সঙ্গে এটি ভাজ করে রাখেন। এটা না করাই ভালো। অনেক সময় ভাজ করে রাখলে সেই অংশে শাড়িটি ফেসে যায়। সবচেয়ে ভালো হয় শাড়ি রোল করে রাখলে। তবে রোল করতে অসুবিধা হলে কম ভাজ করে হ্যাঙারে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। কয়েকদিন পর শাড়ি খুলে অন্যভাবে ভাজ করতে হবে। যেন একইভাবে শাড়িটা বেশিদিন না থাকে। জামদানি শাড়ি রোদে শুকাতে দিতে হবে। রোদে শুকানোর পর সঙ্গে সঙ্গে ভাজ করা যাবে না। শুকানোর পর শাড়ি ঠান্ডা হলে সেটিকে ভাজ করে রাখতে হবে। রোদে শুকাতে না পারলে বাতাসে শুকিয়ে রাখতে পারলে ভালো। বাইরে থেকে এসেও সরাসরি আলমারিতে রাখাবেন না। কিছুক্ষণ বাতাসে রেখে এরপর আলমারিতে রাখুন। পারের জায়গায় ফল্স লাগিয়ে নিন।

জামদানি শাড়ি সাধারণত আয়রন করা যায় না। বেশি ব্যবহারেই এই শাড়ি ভালো থাকে। এটি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কাঠের দণ্ড (জানালার পর্দা লাগানোর কাজে ব্যবহৃত হয়)-এর সঙ্গে জড়িয়ে গোল করে রাখা গেলে শাড়িটি সবচেয়ে ভালো থাকে। এটা না করতে পারলে ভাজ করতে হবে ঠিকই, তবে কিছুদিন পর পর শাড়ি বের করতে হবে।

জামদানি শাড়ির যত্বের বিষয়ে আমেন কালেকশন-এর প্রতিষ্ঠাতা দিলরুবা নাসরিন জানান, এই শাড়ি ঘরে ধোয়ার চেষ্টা করা যাবে না। এর পরিষ্কারের পদ্ধতিকে ‘কাটা করা’ বলা হয়। এটি করে নিতে হবে। তবে এটি বিশেষজ্ঞ তাঁতি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে করিয়ে নেওয়া ভালো। আনাড়ি হাতে করলে শাড়ি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সর্বপোরি এই শাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ভালো-মন্দ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি শাড়ির বিশেষ যত্ন নিতে হবে। তাহলেই এটি ভালো রাখা যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

সাতকাহন
Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.